দূর্বল পাসওয়ার্ডের কারণে ডেনমার্কের ৮৮ লাখ রেকর্ড ফাঁসের দাবি

ডেনমার্কের জাতীয় নাগরিক নিবন্ধনের তথ্য ফাঁসের দাবিকে কেন্দ্র করে সাইবার নিরাপত্তা ও দুর্বল পাসওয়ার্ডের প্রতীকী চিত্র।

ডেনমার্কের জাতীয় নাগরিক নিবন্ধনের সঙ্গে যুক্ত একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের অ্যাকাউন্টের দুর্বল পাসওয়ার্ড ব্যবহার করে প্রায় ৮৮ লাখ রেকর্ড সংগ্রহের দাবি করেছেন এক হ্যাকার। পাসওয়ার্ডটি ছিল ‘123456’। দেশটির নাগরিক নিবন্ধন কর্তৃপক্ষ অননুমোদিতভাবে তথ্য সংগ্রহের ঘটনা নিশ্চিত করেছে। তবে হামলাকারীর দেওয়া তথ্যের সব বিবরণ স্বাধীনভাবে যাচাই করা যায়নি।

প্রযুক্তিবিষয়ক সংবাদমাধ্যম টমস হার্ডওয়্যারের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ডেনমার্কের কেন্দ্রীয় নাগরিক নিবন্ধন ব্যবস্থায় প্রবেশের অনুমোদন ছিল ওডেন্সভিত্তিক তথ্যপ্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান পেইস এপিএসের। হ্যাকারের দাবি, প্রতিষ্ঠানটির একটি অ্যাকাউন্টের দুর্বল পাসওয়ার্ড ব্যবহার করে তিনি এই প্রবেশাধিকার কাজে লাগান। ডেনমার্কের সংবাদমাধ্যম পলিটিকেনের অনুসন্ধানে প্রতিষ্ঠানটির অন্তত তিনটি অ্যাকাউন্টে একই পাসওয়ার্ড ব্যবহারের তথ্য উঠে এসেছে। এর মধ্যে একটি ছিল প্রশাসক অ্যাকাউন্ট।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, হ্যাকার দাবি করেছেন, তিনি সরাসরি ডেনমার্কের সরকারি তথ্যভান্ডারের নিরাপত্তাব্যবস্থা ভাঙেননি। বরং সরকারি নাগরিক নিবন্ধনে তথ্য অনুসন্ধানের বৈধ অনুমতি থাকা একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের অ্যাকাউন্ট ব্যবহার করে তথ্য সংগ্রহ করেন।

পলিটিকেনের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রতিষ্ঠানটির অন্তত তিনটি অ্যাকাউন্টে ‘123456’ পাসওয়ার্ড ব্যবহৃত হয়েছিল। হ্যাকারের দাবি, একজন সাবেক কর্মীর ফাঁস হওয়া প্রবেশসংক্রান্ত তথ্য ব্যবহার করে তিনি ব্যবস্থাটিতে প্রবেশের সুযোগ পান।

পেইস এপিএসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও মালিক সোফি লরসেন টিভি টু সংবাদমাধ্যমকে জানিয়েছেন, তাঁদের প্রতিষ্ঠানের নাগরিক নিবন্ধনে তথ্য অনুসন্ধানের বৈধ প্রবেশাধিকার অপব্যবহার করা হয়েছে।

হ্যাকারের দাবি অনুযায়ী, প্রায় ৮৭ লাখ ৪৯ হাজার ৯৭৫টি রেকর্ড সংগ্রহ করা হয়েছে। এতে ডেনমার্কের কেন্দ্রীয় নাগরিক নিবন্ধন নম্বর, নাম ও ঠিকানাসহ ব্যক্তিগত তথ্য রয়েছে বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। রেকর্ডের সংখ্যা দেশটির বর্তমান জীবিত জনসংখ্যার চেয়েও বেশি, কারণ নাগরিক নিবন্ধনে মৃত ব্যক্তি ও অন্যান্য শ্রেণির মানুষের তথ্যও থাকতে পারে।

হ্যাকারের বক্তব্য অনুযায়ী, তিনি ১০ সেপ্টেম্বর থেকে মোট ২১ দিন ১৭ ঘণ্টা ধরে তথ্য সংগ্রহের কাজ চালিয়েছেন। এ কাজে দুটি কম্পিউটার প্রোগ্রাম ব্যবহারের কথাও তিনি জানিয়েছেন। তবে তথ্য সংগ্রহের পুরো সময়কাল, রেকর্ডের সঠিক সংখ্যা এবং সব তথ্যের প্রকৃতি সম্পর্কে কর্তৃপক্ষের পূর্ণাঙ্গ তদন্তের ফলাফলই চূড়ান্ত ভিত্তি হওয়া উচিত।

হ্যাকার আরও দাবি করেছেন, সংগৃহীত তথ্য বিক্রি বা প্রকাশ করার পরিকল্পনা তাঁর নেই। কিন্তু এমন দাবি ব্যক্তিগত তথ্যের নিরাপত্তা নিশ্চিত করে না। অননুমোদিতভাবে কপি করা তথ্য অন্য কারও হাতে চলে গেলে পরিচয় জালিয়াতি, প্রতারণা কিংবা লক্ষ্যভিত্তিক ফিশিংয়ের মতো অপরাধের ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।

এই ঘটনার বড় শিক্ষা হলো, সরকারি তথ্যভান্ডার নিজস্ব নিরাপত্তাব্যবস্থা দিয়ে সুরক্ষিত থাকলেও সেখানে প্রবেশের অনুমতি পাওয়া কোনো প্রতিষ্ঠানের দুর্বলতা পুরো ব্যবস্থাকে ঝুঁকিতে ফেলতে পারে।

সরকারি প্রতিষ্ঠান ও বেসরকারি সেবাদাতাদের মধ্যে তথ্য বিনিময় আধুনিক প্রশাসনের একটি সাধারণ অংশ। কিন্তু এ ধরনের প্রবেশাধিকার দেওয়ার আগে প্রতিষ্ঠানের নিরাপত্তাব্যবস্থা যাচাই, কর্মীদের অ্যাকাউন্ট ব্যবস্থাপনা, প্রবেশাধিকারের সীমা নির্ধারণ এবং নিয়মিত নিরীক্ষা নিশ্চিত করা জরুরি।

একই পাসওয়ার্ড একাধিক অ্যাকাউন্টে ব্যবহার করা এবং প্রশাসক অ্যাকাউন্টে সহজে অনুমানযোগ্য পাসওয়ার্ড রাখা ঝুঁকি বাড়ায়। কোনো কর্মী প্রতিষ্ঠান ছাড়ার পর তাঁর পুরোনো প্রবেশাধিকার বাতিল করা এবং ফাঁস হওয়া পাসওয়ার্ড দ্রুত পরিবর্তনের ব্যবস্থাও থাকা প্রয়োজন।

এ ঘটনায় কয়েকটি মৌলিক নিরাপত্তাব্যবস্থার গুরুত্ব সামনে এসেছে। প্রতিটি অ্যাকাউন্টে আলাদা, সহজে অনুমান করা যায় না—এমন পাসওয়ার্ড ব্যবহার করা প্রয়োজন। ‘123456’-এর মতো পাসওয়ার্ড সংবেদনশীল তথ্যভান্ডারের সঙ্গে যুক্ত অ্যাকাউন্টে কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। শুধু পাসওয়ার্ড দিয়ে প্রবেশের পরিবর্তে অতিরিক্ত পরিচয় যাচাই চালু থাকলে চুরি হওয়া পাসওয়ার্ডের অপব্যবহারের ঝুঁকি কমানো যায়। কোনো প্রতিষ্ঠান বা কর্মীকে কাজের জন্য যতটুকু তথ্য প্রয়োজন, ততটুকুতেই প্রবেশাধিকার সীমাবদ্ধ রাখা উচিত।

অল্প সময়ে বিপুলসংখ্যক তথ্য অনুসন্ধান বা ডাউনলোডের মতো আচরণ শনাক্ত করার ব্যবস্থা থাকতে হবে। প্রয়োজন হলে স্বয়ংক্রিয় সতর্কবার্তা, সাময়িক প্রবেশ-নিষেধাজ্ঞা এবং তাৎক্ষণিক তদন্ত চালু করা জরুরি।

ডেনমার্কের এই ঘটনা দেখায়, সাইবার নিরাপত্তা শুধু উন্নত প্রযুক্তি স্থাপনের বিষয় নয়; এটি নিয়মিত তদারকি, দায়িত্বশীল অ্যাকাউন্ট ব্যবস্থাপনা এবং কার্যকর নজরদারিরও বিষয়। একটি দুর্বল পাসওয়ার্ড কীভাবে বিপুলসংখ্যক মানুষের ব্যক্তিগত তথ্যকে ঝুঁকিতে ফেলতে পারে, ঘটনাটি তারই সতর্কবার্তা।

সূত্র: টমস হার্ডওয়্যার; পলিটিকেন ও টিভি টুর প্রতিবেদনভিত্তিক তথ্য।

 

 

আরো পড়ুন : ইউরোপে সার্চ ফল বদলাচ্ছে গুগল, মান কমার আশঙ্কা প্রতিষ্ঠানটির

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *