বাংলাদেশে জাপানি মস্তিষ্কপ্রদাহ: তিন জেলায় মিলল পূর্বসংক্রমণের প্রমাণ

রাজশাহী, নওগাঁ ও চাঁপাইনবাবগঞ্জে গবেষণায় মিলেছে ভাইরাসের পূর্বসংক্রমণের প্রাথমিক প্রমাণ; মুরগি, হাঁস ও বিকল্প মশার ভূমিকা নিয়ে চলছে অনুসন্ধান
রাজশাহী, নওগাঁ ও চাঁপাইনবাবগঞ্জে জাপানি মস্তিষ্কপ্রদাহ নিয়ে বৈজ্ঞানিক মতবিনিময় সভায় গবেষক ও জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের অংশগ্রহণ

বাংলাদেশে জাপানি মস্তিষ্কপ্রদাহের জীবাণু কীভাবে ছড়াচ্ছে, তা নিয়ে নতুন প্রশ্ন উঠেছে গবেষকদের মধ্যে। সাধারণত এ রোগের জীবাণু ছড়ানোর চক্রে শূকর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। কিন্তু বাংলাদেশের এমন অনেক এলাকায়ও এ জীবাণুর সংক্রমণের প্রমাণ পাওয়া যাচ্ছে, যেখানে শূকরের সংখ্যা কম কিংবা শূকর নেই। তাহলে এসব এলাকায় জীবাণুটি টিকে থাকছে কীভাবে? মুরগি, হাঁস কিংবা অন্য কোনো প্রজাতির মশা কি এ ক্ষেত্রে ভূমিকা রাখছে?

এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে বাংলাদেশের তিন জেলায় গবেষণা চালিয়েছেন আন্তর্জাতিক উদরাময় গবেষণা কেন্দ্র, বাংলাদেশের (আইসিডিডিআর,বি) গবেষকেরা। প্রাথমিক অনুসন্ধানে মানুষের শরীরে এ ভাইরাসের পূর্বসংক্রমণের প্রমাণ পাওয়া গেছে। গবাদিপশু ও মশার নমুনা বিশ্লেষণেও উঠে এসেছে গুরুত্বপূর্ণ কিছু তথ্য। তবে জীবাণু ছড়ানোর বিকল্প পথগুলো এখনো নিশ্চিত করা যায়নি।

গত ১২ই  অক্টোবর রাজশাহীতে আয়োজিত এক বৈজ্ঞানিক মতবিনিময় সভায় গবেষণার প্রাথমিক ফলাফল তুলে ধরা হয়। এতে জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ, চিকিৎসক, পশুচিকিৎসক, গবেষক ও সরকারি কর্মকর্তারা অংশ নেন।

২০২৪ থেকে ২০২৬ সাল পর্যন্ত রাজশাহী, নওগাঁ ও চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলায় গবেষণাটি পরিচালিত হয়। এর নাম ‘বিকল্প পোষক থেকে বিকল্প প্রতিরোধব্যবস্থা: বাংলাদেশে জাপানি মস্তিষ্কপ্রদাহের প্রাদুর্ভাবের গতিপ্রকৃতি নির্ধারণ’।

আইসিডিডিআর,বি যুক্তরাজ্যের লিভারপুল স্কুল অব ট্রপিক্যাল মেডিসিনের সহযোগিতায় গবেষণাটি পরিচালনা করে। যুক্তরাজ্যের চিকিৎসা গবেষণা পরিষদ এতে সহায়তা দিয়েছে।

গবেষণার অংশ হিসেবে ৩৬টি ইউনিয়নের ১ হাজার ৫৪ জন মানুষের রক্তের নমুনা সংগ্রহ করা হয়। এ ছাড়া দুই দফায় ১ হাজার ৭৫৬টি গবাদিপশুর নমুনা নেওয়া হয়। পাখির উপস্থিতি কাজে লাগিয়ে মশা সংগ্রহের বিশেষ ফাঁদের মাধ্যমে পাওয়া যায় ১ হাজার ৩৮৫টি মশা। পাশাপাশি রোগটি সম্পর্কে মানুষের ধারণা এবং প্রতিরোধের চর্চা জানতে ১২২ জনের সাক্ষাৎকার নেওয়া হয়।

এসব নমুনা ও তথ্যের পাশাপাশি গাণিতিক মডেল ব্যবহার করে জীবাণুর বিস্তার বিশ্লেষণ করছেন গবেষকেরা। তাঁদের লক্ষ্য, মশা, প্রাণী ও মানুষের মধ্যে সংক্রমণের যোগসূত্র শনাক্ত করা।

২০২৬ সালের এপ্রিল ও মে মাসে সংগৃহীত ১ হাজার ৫৪ জনের নমুনা বিশ্লেষণ করে গবেষক আইরিন সুলতানা শান্তা জানান, তাঁদের মধ্যে ৭ দশমিক ৫ শতাংশের শরীরে জাপানি মস্তিষ্কপ্রদাহের জীবাণুর সংস্পর্শে আসার প্রাথমিক প্রমাণ পাওয়া গেছে।

অর্থাৎ, তাঁদের শরীরে এমন প্রতিরোধী উপাদান পাওয়া গেছে, যা অতীতে এ ভাইরাসে সংক্রমিত হওয়ার ইঙ্গিত দিতে পারে। তবে এর অর্থ এই নয় যে, তাঁরা সবাই রোগটিতে আক্রান্ত হয়ে উপসর্গ অনুভব করেছিলেন। অধিকাংশ সংক্রমণেই দৃশ্যমান উপসর্গ দেখা যায় না।

গবেষকেরা বলছেন, প্রকৃত সংক্রমণের চিত্র এখনো স্পষ্ট নয়। কারণ, জাপানি মস্তিষ্কপ্রদাহের ভাইরাসের বিরুদ্ধে তৈরি প্রতিরোধী উপাদান শনাক্ত করার ক্ষেত্রে অন্য সম্পর্কিত ভাইরাসের কারণে পরীক্ষায় বিভ্রান্তি তৈরি হতে পারে। বিশেষ করে ডেঙ্গু ভাইরাসের বিরুদ্ধে তৈরি প্রতিরোধী উপাদানের সঙ্গে পার্থক্য নির্ণয় করা কঠিন হতে পারে। ফলে প্রাথমিক ফলাফল থেকে প্রকৃত সংক্রমণের হার নিশ্চিতভাবে নির্ধারণ করা যাচ্ছে না।

২০২৪ ও ২০২৫ সালে গবাদিপশুর ওপর পরিচালিত জরিপেও গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া গেছে। শূকর রয়েছে এবং শূকর নেই—এমন উভয় ধরনের গ্রামের গবাদিপশুর নমুনায় অতীত সংক্রমণের প্রমাণ মিলেছে।

গবেষকেরা মশার রক্ত বিশ্লেষণ করে দেখেছেন, শনাক্ত করা রক্তের উৎসগুলোর প্রায় ৬৬ শতাংশ ছিল গবাদিপশু। বিপরীতে, শূকরের রক্ত খাওয়ার প্রমাণ পাওয়া গেছে খুব কম।

এ ফলাফল বাংলাদেশের সংক্রমণচক্র সম্পর্কে নতুন প্রশ্ন তৈরি করেছে। শূকর এ ভাইরাসের গুরুত্বপূর্ণ পোষক। এ প্রাণীর শরীরে ভাইরাসের বংশবৃদ্ধি ঘটতে পারে। কিছু জলচর পাখিও প্রকৃতিতে ভাইরাসটির বিস্তার বজায় রাখতে ভূমিকা রাখে।

কিন্তু গবাদিপশু ও মানুষের শরীরে ভাইরাসের সংক্রমণ ঘটলেও তারা সাধারণত মশার মাধ্যমে অন্য প্রাণী বা মানুষের মধ্যে ভাইরাস ছড়িয়ে দেওয়ার উপযোগী পর্যায়ে ভাইরাস বহন করে না। তাই শুধু গবাদিপশুতে সংক্রমণের প্রমাণ দিয়ে রোগের বিস্তারের পূর্ণ ব্যাখ্যা পাওয়া সম্ভব নয়।

গবেষণায় কিউলেক্স কুইনকুয়েফ্যাসিয়াটাস প্রজাতির মশাসহ কয়েক ধরনের মশাকে মুরগি ও মানুষের রক্ত খেতে দেখা গেছে। এ পর্যবেক্ষণ থেকে প্রশ্ন উঠেছে, এসব মশা সংক্রমণ ছড়ানোর ক্ষেত্রে ভূমিকা রাখতে পারে কি না।

লিভারপুল স্কুল অব ট্রপিক্যাল মেডিসিনের গবেষকেরা গাণিতিক মডেলের মাধ্যমে প্রাথমিকভাবে দেখিয়েছেন, মুরগি ও হাঁসের মতো পাখি এবং বিকল্প প্রজাতির মশা ভাইরাসটির বিস্তার বজায় রাখতে ভূমিকা রাখতে পারে।

তবে এটি এখনো একটি গবেষণালব্ধ সম্ভাবনা। মুরগি বা হাঁসের শরীরে ভাইরাসের বংশবৃদ্ধি ঘটে কি না, সেখান থেকে মশা সংক্রমিত হয় কি না এবং সেই মশা মানুষকে আক্রান্ত করতে পারে কি না—এসব বিষয় আরও পরীক্ষা করে দেখতে হবে।

অর্থাৎ, মশার রক্তে কোনো প্রাণীর উপস্থিতি শনাক্ত হওয়া আর সেই প্রাণী ভাইরাসের কার্যকর পোষক হিসেবে কাজ করা এক বিষয় নয়। সংক্রমণচক্র প্রতিষ্ঠা করতে হলে প্রতিটি ধাপের বৈজ্ঞানিক প্রমাণ প্রয়োজন।

গবেষণার আরেকটি উদ্বেগজনক দিক হলো, জাপানি মস্তিষ্কপ্রদাহ সম্পর্কে মানুষের সচেতনতার ঘাটতি।

১২২ জনের ওপর পরিচালিত জরিপে মাত্র ১ দশমিক ৬ শতাংশ উত্তরদাতা রোগটির নাম শুনেছেন বলে জানিয়েছেন। অথচ প্রায় সবাই মশা প্রতিরোধে কোনো না কোনো ব্যবস্থা গ্রহণ করেন। অর্ধেকেরও বেশি উত্তরদাতা তাঁদের পরিবারের সদস্যদের টিকা দেওয়ার আগ্রহ প্রকাশ করেছেন।

এ তথ্য থেকে বোঝা যায়, মানুষ মশাবাহিত রোগ প্রতিরোধের কিছু সাধারণ পদ্ধতি অনুসরণ করলেও জাপানি মস্তিষ্কপ্রদাহ সম্পর্কে তাদের জ্ঞান সীমিত। ফলে রোগের লক্ষণ, ঝুঁকি ও প্রতিরোধ সম্পর্কে সচেতনতা বাড়ানো জরুরি।

জাপানি মস্তিষ্কপ্রদাহ মশাবাহিত ভাইরাসজনিত রোগ। এটি মস্তিষ্কে তীব্র প্রদাহ সৃষ্টি করতে পারে। গুরুতর অবস্থায় আক্রান্ত ব্যক্তির মৃত্যু হতে পারে। আবার বেঁচে যাওয়া অনেকের দীর্ঘস্থায়ী স্নায়বিক জটিলতা দেখা দিতে পারে। গুরুতর মস্তিষ্কপ্রদাহে আক্রান্ত রোগীদের মৃত্যুহার ৩০ শতাংশ পর্যন্ত হতে পারে।

গবেষণার ফলাফল নিয়ে বৈজ্ঞানিক আলোচনায় সভাপতিত্ব করেন রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানের সাবেক পরিচালক অধ্যাপক মাহমুদুর রহমান।

তিনি গবেষণাটিকে গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ হিসেবে উল্লেখ করেন। তাঁর মতে, জাপানি মস্তিষ্কপ্রদাহের প্রকৃত সংক্রমণ শনাক্ত করার ক্ষেত্রে ঘাটতি থাকতে পারে। রোগ নির্ণয়ের পরীক্ষায় অন্য ভাইরাসের সঙ্গে প্রতিক্রিয়ার কারণে সৃষ্ট বিভ্রান্তিও একটি বড় চ্যালেঞ্জ।

তিনি টিকাদানকে রোগ প্রতিরোধের সবচেয়ে সহজ ও কার্যকর উপায় হিসেবে গুরুত্ব দেন। অতীতে সরকারের জাপানি মস্তিষ্কপ্রদাহের টিকাদান পরিকল্পনার কথাও স্মরণ করেন তিনি। গবেষণায় পাওয়া নতুন তথ্য জাতীয় পর্যায়ে রোগ প্রতিরোধের নীতি ও কৌশল নির্ধারণের আলোচনায় অন্তর্ভুক্ত করার আহ্বান জানান।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সমন্বিত স্বাস্থ্য কর্মসূচির কর্মকর্তা মুজাফফর গনি ওসমানী জীবাণুর বিস্তারে যাযাবর শূকরের পাল সম্ভাব্য ভূমিকা রাখছে কি না, তা অনুসন্ধানের পরামর্শ দেন।

গবেষণায় অংশ নেওয়া জেলাগুলোর সিভিল সার্জন ও জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তারাও উদ্যোগটির প্রশংসা করেন। তাঁদের মতে, এ আলোচনা স্থানীয় পর্যায়ে রোগটি সম্পর্কে সচেতনতা বাড়াতে সহায়তা করেছে।

গবেষণার সূচনা ও পরিচিতি তুলে ধরেন আইসিডিডিআর,বির জ্যেষ্ঠ বিজ্ঞানী মোহাম্মদ শফিউল আলম। প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন রাজশাহী মেডিকেল কলেজের অধ্যক্ষ অধ্যাপক ডা: মো. ফয়সাল আলম। গবেষণার ফলাফল উপস্থাপন করেন আইসিডিডিআর,বির গবেষক আইরিন সুলতানা শান্তা, আদনান আহমেদ, দেবাশীষ ঘোষ ও সুমিত চাকমা এবং লিভারপুল স্কুল অব ট্রপিক্যাল মেডিসিনের জেনিফার লর্ড।

গবেষকেরা স্পষ্ট করেছেন, এ অনুসন্ধানের উদ্দেশ্য ভাইরাসের বিস্তার সম্পর্কে বৈজ্ঞানিক ধারণা তৈরি করা। শূকর পালনকারী কোনো জনগোষ্ঠীকে সংক্রমণের জন্য দায়ী করা নয়। বিশেষ করে যেসব প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জীবিকা শূকর পালনের ওপর নির্ভরশীল, তাদের প্রতি দায় চাপানোর কোনো বৈজ্ঞানিক ভিত্তি এ গবেষণা দেয় না।

বরং মানুষের স্বাস্থ্য, প্রাণীর স্বাস্থ্য এবং পরিবেশের পারস্পরিক সম্পর্ক বিবেচনায় নিয়ে সংক্রমণচক্র বোঝার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন তাঁরা। এ জন্য জনস্বাস্থ্য, প্রাণিসম্পদ ও পরিবেশবিষয়ক সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের মধ্যে সমন্বয় প্রয়োজন।

গবেষণার প্রাথমিক ফলাফল এখনো অনেক প্রশ্নের উত্তর দিতে পারেনি। তবে শূকরবিহীন এলাকায় সংক্রমণের সম্ভাব্য উৎস, মশার খাদ্যাভ্যাস এবং মানুষের মধ্যে পূর্বসংক্রমণের চিহ্ন—এসব তথ্য ভবিষ্যৎ অনুসন্ধানের নতুন দিক তৈরি করেছে।

এখন প্রয়োজন বিকল্প পোষকের ভূমিকা নিশ্চিত করতে আরও গবেষণা, রোগ শনাক্তকরণের সক্ষমতা বাড়ানো, নিয়মিত নজরদারি এবং টিকাদানের সম্ভাবনা নিয়ে জাতীয় পর্যায়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণ। এসব উদ্যোগের সমন্বয়ই বাংলাদেশে জাপানি মস্তিষ্কপ্রদাহ প্রতিরোধের কার্যকর কৌশল নির্ধারণে সহায়ক হতে পারে।

 

 

আরো পড়ুন : ইনফ্লুয়েঞ্জার ওষুধ পরীক্ষায় নতুন সক্ষমতা বাংলাদেশের

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *