২০০১ সালের ১১ই সেপ্টেম্বর যুক্তরাষ্ট্রে যে ভয়াবহ হামলা চালানো হয়, তার অভিঘাত ছিল বৈশ্বিক। নিউইয়র্কের ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টার, পেন্টাগন এবং পেনসিলভানিয়ায় বিধ্বস্ত হয় চারটি যাত্রীবাহী বিমান। বদলে যায় যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তানীতি। পাল্টে যায় আন্তর্জাতিক রাজনীতি ও সন্ত্রাসবিরোধী ব্যবস্থার গতিপথও।
এই বিশাল হামলা চালাতে কত টাকা লেগেছিল—প্রশ্নটি তাই গুরুত্বপূর্ণ। ৯/১১ হামলা নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল কমিশনের তদন্ত বলছে, পুরো ষড়যন্ত্র পরিকল্পনা ও বাস্তবায়নে আল-কায়েদার খরচ হয়েছিল আনুমানিক ৪ লাখ থেকে ৫ লাখ মার্কিন ডলার। অঙ্কটি আজকের হিসাবে খুব বড় নয়। কিন্তু ওই অর্থ দিয়ে ১৯ জন হাইজ্যাকারকে যুক্তরাষ্ট্রে পাঠানো, বিমান চালনার প্রশিক্ষণ, বাসস্থান, গাড়ি, খাবার, ভ্রমণ ও অন্যান্য ব্যয় মেটানো হয়েছিল। হামলার পরিকল্পনা চলেছিল প্রায় দুই বছর।
৯/১১ কমিশনের সন্ত্রাসী অর্থায়নবিষয়ক তদন্তে দেখা যায়, আনুমানিক ৩ লাখ ডলার ১৯ হাইজ্যাকারদের যুক্তরাষ্ট্রের ব্যাংক অ্যাকাউন্টে জমা হয়েছিল। অর্থ এসেছে বিভিন্ন পথে। এর মধ্যে ছিল বিদেশ থেকে ব্যাংক ট্রান্সফার, নগদ অর্থ ও ট্রাভেলার্স চেক। কয়েকজন হাইজ্যাকার বিদেশি ব্যাংক অ্যাকাউন্টে থাকা অর্থ যুক্তরাষ্ট্রে ডেবিট ও ক্রেডিট কার্ডের মাধ্যমে ব্যবহার করেন। কমিশনের তদন্তে যুক্তরাষ্ট্রে হাইজ্যাকারদের জন্য প্রায় ১ লাখ ৩০ হাজার ডলারের ব্যাংক ট্রান্সফারের তথ্য পাওয়া যায়। এর মধ্যে প্রায় ১ লাখ ২০ হাজার ডলার দুবাই থেকে এবং ১০ হাজার ডলারের কিছু বেশি জার্মানি থেকে এসেছিল।
বিমান ছিনতাইয়ের পরিকল্পনার গুরুত্বপূর্ণ পর্যায়ে অর্থ পাঠানোর একটি উল্লেখযোগ্য ঘটনা ঘটে ২০০০ সালের সেপ্টেম্বরে। ৯/১১ কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, ১৭ই সেপ্টেম্বর ২০০০ সালে আল-কায়েদার সহযোগী আলি আবদুল আজিজ আলি দুবাই থেকে মারওয়ান আল-শেহহির কাছে ৭০ হাজার ডলার পাঠান। তখন আল-শেহহি, মোহাম্মদ আত্তা ও জিয়াদ জাররাহ বিমান চালনার প্রশিক্ষণ নিচ্ছিলেন।
এখানে একটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ। ৭০ হাজার ডলারের এই ট্রান্সফারটি ২০০১ সালের জুনে নয়; কমিশনের নথি অনুযায়ী এটি ২০০০ সালের ১৭ই সেপ্টেম্বরের লেনদেন।
৯/১১ কমিশন তদন্ত করেও হামলায় ব্যবহৃত অর্থের মূল উৎস পুরোপুরি শনাক্ত করতে পারেনি। তদন্তে বলা হয়, হাইজ্যাকারদের অর্থায়ন আল-কায়েদার পক্ষ থেকেই হয়েছিল। তবে যুক্তরাষ্ট্রে কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে তারা বড় ধরনের আর্থিক সহায়তা পেয়েছিল—এমন বিশ্বাসযোগ্য প্রমাণ পাওয়া যায়নি। একইভাবে কোনো বিদেশি সরকার বা সরকারি কর্মকর্তা হামলায় অর্থ দিয়েছিলেন—এমন প্রমাণও কমিশন পায়নি। অর্থাৎ অর্থের গতিপথের অনেক অংশ শনাক্ত করা গেলেও এর চূড়ান্ত উৎস নির্ধারণ করা সম্ভব হয়নি।
৯/১১ হামলার অর্থায়নের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা এখানেই। হাইজ্যাকাররা আন্তর্জাতিক আর্থিক ব্যবস্থার কোনো অত্যাধুনিক দুর্বলতা কাজে লাগায়নি। বরং তারা এমন সব সাধারণ লেনদেন করেছে, যেগুলো প্রতিদিন বিশ্বের ব্যাংকগুলোতে হাজার হাজারবার হয়। তারা নিজেদের নামে ব্যাংক অ্যাকাউন্ট খুলেছিল। বৈধ পাসপোর্ট ও পরিচয়পত্র ব্যবহার করেছিল। বড় অঙ্কের সন্দেহজনক লেনদেনের পরিবর্তে তুলনামূলক ছোট ও সাধারণ লেনদেনের মাধ্যমে অর্থ ব্যবহার করেছে।
৯/১১ কমিশনের ভাষ্য অনুযায়ী, সে সময়ের আর্থিক নজরদারি ব্যবস্থা মূলত মাদক পাচার ও বড় ধরনের অর্থনৈতিক জালিয়াতির মতো অপরাধ শনাক্ত করার দিকে বেশি কেন্দ্রীভূত ছিল। হাইজ্যাকারদের ব্যবহৃত সাধারণ ধরনের লেনদেন শনাক্ত বা বন্ধ করার জন্য সেই ব্যবস্থা তৈরি হয়নি। পরিকল্পনার শেষ পর্যায়ে হাইজ্যাকারদের কাছে থাকা অতিরিক্ত অর্থের একটি অংশ আল-কায়েদার সহযোগীদের কাছে ফেরত পাঠানো হয়।
৯/১১ কমিশনের তদন্তে দেখা যায়, হামলার আগের সেপ্টেম্বরের প্রথম সপ্তাহে হাইজ্যাকাররা সংযুক্ত আরব আমিরাতের মুস্তাফা আল হাওসাবির কাছে মোট প্রায় ২৬ হাজার ডলার পাঠিয়েছিল। নাওয়াফ আল-হাজমি মিহধারের ব্যাংক অ্যাকাউন্টের ডেবিট কার্ডও হাওসাবির কাছে পাঠানোর চেষ্টা করেছিলেন।
এ ঘটনাগুলো দেখায়, পুরো অর্থায়ন ছিল একটি কেন্দ্রীয় তহবিল থেকে একবারে বিপুল অর্থ পাঠানোর মতো সরল প্রক্রিয়া নয়। বিভিন্ন ব্যক্তি, ব্যাংক অ্যাকাউন্ট ও লেনদেনের মাধ্যমে প্রয়োজন অনুযায়ী অর্থ সরানো হয়েছিল।
যুক্তরাষ্ট্রে হাইজ্যাকারদের প্রধান ব্যয়ের মধ্যে ছিল বিমান চালনার প্রশিক্ষণ, বাসা ভাড়া, খাবার, গাড়ি, গাড়ির বিমা, ভ্রমণ এবং হামলার আগে বিভিন্ন জায়গায় যাতায়াত।
তবে কমিশনের ৪ থেকে ৫ লাখ ডলারের হিসাবের একটি গুরুত্বপূর্ণ সীমাবদ্ধতা আছে। এই অঙ্কের মধ্যে আফগানিস্তানে আল-কায়েদার প্রশিক্ষণ শিবির পরিচালনার সামগ্রিক খরচ কিংবা হাইজ্যাকারদের সেখানে দেওয়া প্রশিক্ষণের খরচ অন্তর্ভুক্ত নয়। অর্থাৎ ৪ থেকে ৫ লাখ ডলার বলতে মূলত ৯/১১ হামলার পরিকল্পনা ও বাস্তবায়নের জন্য সরাসরি ব্যয় বোঝানো হয়েছে।
৯/১১ হামলার মানবিক ও অর্থনৈতিক ক্ষতির সঙ্গে এর সরাসরি পরিচালন ব্যয়ের তুলনা করলে বিষয়টি আরও বিস্ময়কর হয়ে ওঠে। মাত্র ৪ থেকে ৫ লাখ ডলারের একটি অপারেশন যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তা কাঠামোকে আমূল পরিবর্তন করে দেয়। শুরু হয় দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধ। বিমানবন্দর ও সীমান্ত নিরাপত্তায় আসে ব্যাপক পরিবর্তন। সন্ত্রাসী অর্থায়ন ঠেকাতে আন্তর্জাতিক আর্থিক ব্যবস্থায় চালু হয় নতুন ও কঠোর নজরদারি।
৯/১১ কমিশনের তদন্তের বড় শিক্ষা তাই শুধু হামলায় কত টাকা খরচ হয়েছিল, তা নয়। বরং অল্প অর্থের ধারাবাহিক ও সাধারণ লেনদেনও বড় ধরনের সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের অর্থায়নে ব্যবহৃত হতে পারে—এই বাস্তবতা। ২০০১ সালের আগে আর্থিক নজরদারির কাঠামো এই ধরনের ঝুঁকি মোকাবিলার জন্য যথেষ্ট প্রস্তুত ছিল না। ৯/১১-এর পর সেই ব্যবস্থার আমূল পরিবর্তন শুরু হয়।
একটি ভয়াবহ বৈশ্বিক ঘটনার পেছনের আর্থিক হিসাব তাই শেষ পর্যন্ত একটি বড় প্রশ্ন সামনে আনে—সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের জন্য বিপুল অর্থ সবসময় প্রয়োজন হয় না। কখনও কখনও সাধারণ ব্যাংকিং ব্যবস্থার ভেতর দিয়ে চলাচল করা অপেক্ষাকৃত ছোট অঙ্কের অর্থই হয়ে উঠতে পারে বড় বিপর্যয়ের জ্বালানি।