দিনাজপুরের গ্রামীণ অর্থনীতি ও কৃষিভিত্তিক উন্নয়নে জাপান আন্তর্জাতিক সহযোগিতা সংস্থার (জাইকা) সহায়তায় বাস্তবায়িত তিনটি উদ্যোগ পরিদর্শন করেছেন জাইকা বাংলাদেশের প্রধান প্রতিনিধি তাকাহাশি জুনকো।
২৩শে আগস্ট তিনি দিনাজপুরে এসব উন্নয়ন উদ্যোগ পরিদর্শন করেন। এসব প্রকল্পের মধ্যে রয়েছে পানি সম্পদ উন্নয়ন, কৃষিপণ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ এবং নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করার উদ্যোগ।
পরিদর্শনের শুরুতে তাকাহাশি জুনকো খানসামা উপজেলার কাচিনিয়া বাজার-বেলান নদী পানি সংরক্ষণ ও নিষ্কাশন উপ-প্রকল্প পরিদর্শন করেন। এটি ক্ষুদ্রাকার পানি সম্পদ উন্নয়ন প্রকল্পের দ্বিতীয় পর্যায়ের আওতাভুক্ত।
প্রকল্পটির মাধ্যমে পানি সংরক্ষণ, নিষ্কাশন ও সেচ অবকাঠামো উন্নয়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এর ফলে কৃষিজমিতে প্রয়োজন অনুযায়ী পানি সরবরাহের সুযোগ তৈরি হচ্ছে। একই সঙ্গে অতিরিক্ত পানি দ্রুত নিষ্কাশনের ব্যবস্থাও কৃষির জন্য সহায়ক হচ্ছে।
জাইকার পানি সম্পদ উন্নয়ন সহযোগিতার অন্যতম লক্ষ্য হলো বন্যা ও জলাবদ্ধতার ক্ষতি কমানো এবং কৃষিজমির উৎপাদনশীলতা বাড়ানো। সংস্থাটির আগের ছোট আকারের পানি সম্পদ উন্নয়ন কর্মসূচিতেও জলাবদ্ধতা নিয়ন্ত্রণ, নিষ্কাশন, পানি সংরক্ষণ ও সেচ অবকাঠামো উন্নয়নের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছিল।
এরপর তাকাহাশি জুনকো পরিদর্শন করেন পার্বতীপুরের স্পেন বাংলাদেশ অ্যাগ্রো ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেড। প্রতিষ্ঠানটি চুক্তিভিত্তিক কৃষি, কৃষিপণ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ এবং রপ্তানিমুখী উৎপাদনের সঙ্গে যুক্ত।
প্রতিষ্ঠানটির কারখানা পার্বতীপুরে অবস্থিত। এটি ভুট্টা, আনারস, আম, ট্যানজারিন, কাঁঠাল ও আলুসহ বিভিন্ন কৃষিপণ্য প্রক্রিয়াজাত করে। এসব পণ্যের একটি বড় অংশ রপ্তানি বাজারের জন্য প্রস্তুত করা হচ্ছে। ২০২৬ সালের মে মাসে প্রতিষ্ঠানটি বাণিজ্যিক উৎপাদন শুরু করে এবং এরপর রপ্তানিও শুরু হয়েছে।
প্রতিষ্ঠানটির তথ্য অনুযায়ী, তাদের উৎপাদনব্যবস্থায় কৃষক সম্পৃক্ততা থেকে শুরু করে ফসল সংগ্রহ, প্রক্রিয়াজাতকরণ, মান নিয়ন্ত্রণ ও প্যাকেজিং পর্যন্ত একটি সমন্বিত মূল্যশৃঙ্খল রয়েছে।
জাইকার সহায়তাপুষ্ট ফুড ভ্যালু চেইন ইমপ্রুভমেন্ট প্রকল্পের সঙ্গে এই উদ্যোগের সংযোগ কৃষিপণ্যের উৎপাদন থেকে বাজারজাতকরণ পর্যন্ত মূল্য সংযোজনের গুরুত্ব তুলে ধরে। গ্রামীণ কৃষকদের বাজারের সঙ্গে যুক্ত করা গেলে উৎপাদনের পাশাপাশি প্রক্রিয়াজাতকরণ ও রপ্তানির সুযোগও বাড়ে।
প্রতিষ্ঠানটির কার্যক্রমকে কেন্দ্র করে পার্বতীপুরের গ্রামীণ এলাকায় প্রায় ১ হাজার ৫০০ সরাসরি কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হয়েছে বলে পরিদর্শনসংশ্লিষ্ট তথ্যে উল্লেখ করা হয়েছে। চুক্তিবদ্ধ কৃষকের সংখ্যাও কয়েক হাজারে পৌঁছেছে। একই সঙ্গে প্রতিষ্ঠানটি ভবিষ্যতে আরও বড় পরিসরে চুক্তিভিত্তিক কৃষি সম্প্রসারণের পরিকল্পনা করছে।
পরিদর্শনের তৃতীয় পর্যায়ে তাকাহাশি জুনকো বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের (বিএফএসএ) দিনাজপুর কার্যালয় পরিদর্শন করেন।
জাইকার কারিগরি সহযোগিতাপুষ্ট এসটিআইআরসি প্রকল্পের আওতায় নিরাপদ খাদ্য পরিদর্শন, নিয়ন্ত্রণ ও সমন্বয় কার্যক্রম জোরদারে বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। জেলা পর্যায়ে নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের কার্যালয়গুলো খাদ্য ব্যবসা প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন, সচেতনতা এবং খাদ্য নিরাপত্তাসংক্রান্ত নিয়ন্ত্রক কার্যক্রমে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। জাইকার একটি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, STIRC প্রকল্পের সহায়তায় BFSA পরিদর্শন, দ্রুত পরীক্ষণ এবং ভোক্তা সচেতনতা কার্যক্রম পরিচালনা করছে।
দিনাজপুর জেলা নিরাপদ খাদ্য কার্যালয়ের কার্যক্রমের মধ্যে খাদ্য নিরাপত্তা বিষয়ে সচেতনতা, মোড়কজাত খাদ্যের লেবেলিং এবং খাদ্য সংরক্ষণসংক্রান্ত তথ্য প্রচারও রয়েছে।
দিনাজপুরে জাইকার সহায়তাপুষ্ট এই তিন উদ্যোগের মধ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ যোগসূত্র রয়েছে। পানি ব্যবস্থাপনা কৃষি উৎপাদনের ভিত্তি তৈরি করছে। কৃষিপণ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ সেই উৎপাদনকে বাজার ও রপ্তানির সঙ্গে যুক্ত করছে। আর নিরাপদ খাদ্যসংক্রান্ত নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা পুরো খাদ্যশৃঙ্খলের মান ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে ভূমিকা রাখছে।
ফলে এসব উদ্যোগকে শুধু পৃথক প্রকল্প হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। এগুলো গ্রামীণ অর্থনীতির একটি বিস্তৃত মূল্যশৃঙ্খলের অংশ। কৃষকের উৎপাদন থেকে শুরু করে প্রক্রিয়াজাতকরণ, কর্মসংস্থান এবং আন্তর্জাতিক বাজারে পণ্য পৌঁছানো পর্যন্ত এর প্রভাব বিস্তৃত।
দিনাজপুরের অভিজ্ঞতা একই সঙ্গে দেখাচ্ছে, গ্রামীণ উন্নয়নে অবকাঠামো, বেসরকারি বিনিয়োগ ও প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা একসঙ্গে কাজ করলে দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক সুফল তৈরি করা সম্ভব। কৃষি উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি, খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং গ্রামীণ কর্মসংস্থান বাড়ানোর ক্ষেত্রে এ ধরনের সমন্বিত অংশীদারত্ব ভবিষ্যতে আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।