ড.মো: আব্দুল ওয়াহাব
বাংলাদেশের গ্রামবাংলার পরিচিত দৃশ্য—খোলা মাঠের মধ্যে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে তালগাছ। বজ্রপাতের সঙ্গে তালগাছের সম্পর্ক নিয়েও দীর্ঘদিনের একটি প্রচলিত ধারণা আছে। অনেকেই মনে করেন, তালগাছ বজ্রপাত নিজের দিকে টেনে নিয়ে আশপাশের মানুষ ও ঘরবাড়িকে রক্ষা করে।
এই ধারণার পেছনে কিছু বাস্তব পর্যবেক্ষণ থাকলেও বৈজ্ঞানিকভাবে বিষয়টি একটু ভিন্ন। তালগাছ কোনো স্বয়ংক্রিয় ‘বজ্ররোধক’ নয়। বরং উঁচু ও বিচ্ছিন্ন গাছ হিসেবে এটি নিজেই বজ্রপাতের ঝুঁকিতে থাকে। তাই বজ্রপাতের সময় তালগাছের নিচে দাঁড়ানো নিরাপদ নয়।
বজ্রপাত হলো বজ্রমেঘের ভেতর বা মেঘ ও মাটির মধ্যে সৃষ্ট শক্তিশালী বৈদ্যুতিক ডিসচার্জ । বজ্রমেঘের মধ্যে বরফকণা, পানির ফোঁটা ও অন্যান্য কণার সংঘর্ষের ফলে বৈদ্যুতিক চার্জ আলাদা হয়ে যায়। সাধারণভাবে মেঘের বিভিন্ন অংশে ধনাত্মক ও ঋণাত্মক চার্জের ঘনত্ব তৈরি হয়।
মেঘের ঋণাত্মক চার্জ যখন মাটির দিকে প্রভাব বিস্তার করে, তখন মাটি থেকেও বিপরীত চার্জের বৈদ্যুতিক পথ তৈরি হতে পারে। এই পথগুলোর সংযোগ ঘটলে অত্যন্ত শক্তিশালী বৈদ্যুতিক প্রবাহ সৃষ্টি হয়—এটাই বজ্রপাতের মূল ঘটনা।
বজ্রপাতের চ্যানেলের তাপমাত্রা কয়েক দশ হাজার কেলভিন পর্যন্ত উঠতে পারে। এই প্রচণ্ড তাপে আশপাশের বাতাস দ্রুত প্রসারিত হয়। সেই আকস্মিক চাপের পরিবর্তন থেকেই আমরা বজ্রের বিকট শব্দ শুনি।
তালগাছ সাধারণত উঁচু ও তুলনামূলকভাবে বিচ্ছিন্ন অবস্থানে বেড়ে ওঠে। ফলে খোলা মাঠে এটি আশপাশের অন্যান্য বস্তুর তুলনায় বজ্রপাতের সংস্পর্শে আসার সম্ভাবনাময় একটি উঁচু বস্তু হতে পারে।
কিন্তু এখানেই একটি গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য আছে।
তালগাছ বজ্রপাত প্রতিরোধ করে—এমন বৈজ্ঞানিক প্রমাণ নেই।
আধুনিক লাইটেনিং প্রটেকশন সিস্টেম-এ বজ্রপাতের বৈদ্যুতিক শক্তিকে একটি পরিকল্পিত পরিবাহী পথ দিয়ে মাটিতে নিরাপদে সরিয়ে নেওয়ার ব্যবস্থা থাকে। একটি গাছ সেই ধরনের প্রকৌশলগত লাইটেনিং প্রটেকশন সিস্টেম নয়।
আরও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, উঁচু গাছের কাছে দাঁড়ানো মানুষের জন্য ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। বজ্রপাত গাছে আঘাত করার পর বৈদ্যুতিক প্রবাহের একটি অংশ পাশের মানুষের শরীরে লাফিয়ে যেতে পারে। একে বলা হয় সাইড ফ্লাশ।
তাই ‘তালগাছ বজ্রপাত নিজের দিকে নিয়ে মানুষকে বাঁচায়’—এমন সরল ব্যাখ্যা ব্যবহার করা নিরাপদ নয়।
তাহলে তালগাছ লাগানোর উদ্যোগ কেন নেওয়া হয়?
তালগাছকে ঘিরে বাংলাদেশের বজ্রপাত মোকাবিলার সরকারি উদ্যোগ অবশ্যই রয়েছে। ২০১৬ সালের ভয়াবহ বজ্রপাতের পর বাংলাদেশে তালগাছ লাগানোর উদ্যোগ নেওয়া হয় এবং ২০১৭ সালে দেশজুড়ে এক মিলিয়ন তালগাছ লাগানোর কর্মসূচির কথা জানানো হয়েছিল। পরে কর্মসূচির পরিধি আরও বাড়ানোর পরিকল্পনার কথাও বিভিন্ন প্রতিবেদনে এসেছে।
বর্তমানেও তালগাছ রোপণের উদ্যোগ চলছে। ২০২৬ সালের আগস্টে রাজশাহীতে এক হাজার তালচারা রোপণের কর্মসূচি শুরু হয়েছে। নেচার এন্ড বায়োডাইভার্সিটি কনজারভেশন ফোরাম (এনবিসিএফ) ও সেন্টার ফর গ্লোবাল এনভায়রনমেন্ট এন্ড ডেভেলপমেন্ট (সিজিইডি) যৌথভাবে এই কর্মসূচি বাস্তবায়ন করছে।
তবে তালগাছ লাগানোর বিষয়টি নিয়ে সংবাদ প্রকাশের সময় এটিকে সরাসরি ‘বজ্রপাত প্রতিরোধক’ হিসেবে উপস্থাপন না করে বজ্রপাতের ঝুঁকি কমানোর একটি উদ্যোগ হিসেবে বর্ণনা করাই বৈজ্ঞানিকভাবে বেশি সঠিক।
বজ্রপাতের সময় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ নিয়ম হলো—উঁচু ও বিচ্ছিন্ন কোনো বস্তুর কাছাকাছি অবস্থান না করা।
যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল ওয়েদার সার্ভিস বজ্রপাতের সময় উঁচু বিচ্ছিন্ন গাছ থেকে দূরে থাকতে এবং সম্ভব হলে সম্পূর্ণ আবদ্ধ ভবন বা শক্ত ছাদযুক্ত গাড়িতে আশ্রয় নিতে পরামর্শ দেয়।
কারণ বজ্রপাত কেবল সরাসরি শরীরে আঘাত করেই ক্ষতি করে না। গাছ বা অন্য কোনো বস্তুকে আঘাত করার পর বৈদ্যুতিক প্রবাহ আশপাশে ছড়িয়ে পড়তে পারে।
তাই বজ্রপাতের সময়—
- তালগাছ বা অন্য কোনো গাছের নিচে দাঁড়ানো যাবে না;
- খোলা মাঠে থাকা যাবে না;
- পুকুর, নদী, হাওর বা অন্য কোনো জলাশয়ের কাছে থাকা যাবে না;
- পাহাড়ের চূড়া বা উঁচু জায়গায় থাকা উচিত নয়;
- যত দ্রুত সম্ভব পাকা, সম্পূর্ণ আবদ্ধ ভবনে আশ্রয় নিতে হবে;
- ভবন না থাকলে জানালা বন্ধ করে শক্ত ছাদযুক্ত গাড়ির ভেতরে আশ্রয় নেওয়া যেতে পারে।
বজ্রপাত মানুষের জন্য ভয়ংকর হলেও প্রকৃতির বৈদ্যুতিক ও রাসায়নিক প্রক্রিয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
বজ্রপাতের প্রচণ্ড তাপ বায়ুমণ্ডলের নাইট্রোজেন ও অক্সিজেনের মধ্যে রাসায়নিক বিক্রিয়া ঘটাতে পারে। এর ফলে নাইট্রোজেন অক্সাইড তৈরি হয়, যা পরবর্তী রাসায়নিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে প্রাকৃতিক নাইট্রোজেন চক্রে ভূমিকা রাখে। বৃষ্টির সঙ্গে বিভিন্ন নাইট্রোজেন যৌগ মাটিতে পৌঁছাতে পারে।
তবে এটিকে ‘প্রকৃতির সার কারখানা’ বললেও মনে রাখতে হবে—প্রাকৃতিক নাইট্রোজেন স্থিতিকরণে বজ্রপাতের পাশাপাশি মাটি ও পানিতে থাকা বিভিন্ন জীবাণুরও বড় ভূমিকা রয়েছে।
বজ্রপাতের সময় ওজোনসহ বিভিন্ন সক্রিয় রাসায়নিক পদার্থ তৈরি হতে পারে। বজ্রপাতের ফলে উৎপন্ন নাইট্রোজেন অক্সাইড বায়ুমণ্ডলের রাসায়নিক বিক্রিয়ায় অংশ নেয় এবং ওজোন তৈরির প্রক্রিয়াতেও ভূমিকা রাখতে পারে। গবেষণায় বজ্রপাতকে বায়ুমণ্ডলে নাইট্রোজেন অক্সাইডের একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রাকৃতিক উৎস হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
তবে ‘বজ্রপাত বাতাস জীবাণুমুক্ত করে’ বা ‘বৃষ্টির পরের সোঁদা গন্ধ মূলত বজ্রপাতের কারণে’—এ ধরনের সরল দাবি করা ঠিক হবে না। বৃষ্টির পর বাতাসের গন্ধ ও বায়ুমণ্ডলের পরিবর্তনের পেছনে একাধিক রাসায়নিক ও পরিবেশগত প্রক্রিয়া কাজ করে।
তালগাছ বাংলাদেশের পরিবেশ, জীববৈচিত্র্য ও গ্রামীণ সংস্কৃতির গুরুত্বপূর্ণ অংশ। তালগাছ লাগানোর কর্মসূচি পরিবেশগতভাবেও ইতিবাচক হতে পারে। একই সঙ্গে বজ্রপাতপ্রবণ এলাকায় গাছ লাগানোর উদ্যোগকে জনসচেতনতা ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনার সঙ্গে যুক্ত করা যেতে পারে।
তবে তালগাছকে এমনভাবে উপস্থাপন করা উচিত নয় যেন এটি একটি প্রাকৃতিক লাইটিনিং রড এবং তার নির্দিষ্ট পরিসরের মধ্যে থাকা মানুষ বা ঘরবাড়িকে নিশ্চিতভাবে রক্ষা করবে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বার্তাটি হলো—বজ্রপাতের সময় কোনো গাছের নিচে আশ্রয় নেওয়া নিরাপদ নয়।
প্রকৃত নিরাপত্তা আসে দ্রুত নিরাপদ আশ্রয়ে যাওয়ার মাধ্যমে। বজ্রধ্বনি শোনা গেলে ঝড়কে কাছাকাছি ধরে নিয়ে পাকা ভবন বা নিরাপদ গাড়ির ভেতরে আশ্রয় নেওয়াই সবচেয়ে ভালো ব্যবস্থা।
ড.মো: আব্দুল ওয়াহাব
পরিবেশ ও জীববৈচিত্র সংরক্ষণ বিশেষজ্ঞ