প্লাস্টিকমুক্ত ক্যাম্পাস গড়তে এসডোর নতুন ম্যানুয়াল

বিদ্যালয়ে প্লাস্টিক ব্যবহার কমানোর ম্যানুয়াল হাতে অতিথি ও আয়োজকরা।

বাংলাদেশের বিদ্যালয়গুলোতে একবার ব্যবহারযোগ্য প্লাস্টিকের ব্যবহার কমিয়ে পরিচ্ছন্ন, নিরাপদ ও টেকসই পরিবেশ গড়ে তুলতে ‘প্লাস্টিকমুক্ত ক্যাম্পাস ম্যানুয়াল’ প্রকাশ করেছে এনভায়রনমেন্ট অ্যান্ড সোশ্যাল ডেভেলপমেন্ট অর্গানাইজেশন (এসডো)। মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংক পিএলসি-এর সহযোগিতায় তৈরি ম্যানুয়ালটি শিক্ষার্থী ও শিক্ষকদের জন্য পরিবেশবিষয়ক একটি ব্যবহারিক নির্দেশিকা হিসেবে তৈরি করা হয়েছে।

পরিবেশ অধিদপ্তরের অডিটোরিয়ামে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী শেখ ফরিদুল ইসলাম, এমপির উপস্থিতিতে ম্যানুয়ালটির উদ্বোধন করা হয়। অনুষ্ঠানে বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও সরকারি দপ্তরের কর্মকর্তা, উন্নয়নকর্মী, শিক্ষাবিদ, গণমাধ্যমকর্মী এবং তরুণ প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন।

এসডো জানায়, ২০২২ সাল থেকে দেশের আটটি বিভাগে ‘প্লাস্টিকমুক্ত ক্যাম্পাস’ উদ্যোগ বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। প্রথম ধাপে ১৬টি বিদ্যালয়কে নিয়ে কার্যক্রম শুরু হয়। পরবর্তী ধাপে আরও সাতটি বিদ্যালয় এই উদ্যোগের আওতায় যুক্ত হয়েছে।

উদ্যোগটির লক্ষ্য শুধু বিদ্যালয় প্রাঙ্গণ থেকে প্লাস্টিক সরিয়ে ফেলা নয়। শিক্ষার্থীদের পরিবেশ সম্পর্কে জ্ঞানকে বাস্তব জীবনের সঙ্গে যুক্ত করে তাদের দৈনন্দিন আচরণে পরিবর্তন আনার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। একবার ব্যবহারযোগ্য প্লাস্টিকের পরিবর্তে পরিবেশবান্ধব বিকল্প ব্যবহার, বর্জ্য আলাদা করা এবং বিদ্যালয় ও কমিউনিটিতে পরিবেশবান্ধব অভ্যাস গড়ে তোলাকে এর গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে দেখা হচ্ছে।

এসডোর মতে, পরিবেশ শিক্ষা শুধু পাঠ্যবই বা শ্রেণিকক্ষের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকলে কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন আনা কঠিন। তাই শিক্ষার্থী, শিক্ষক, বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ ও স্থানীয় কমিউনিটিকে সম্পৃক্ত করে পরিবেশবান্ধব জীবনযাপনের অভ্যাস তৈরি করতে চায় সংগঠনটি।

প্রকল্পের পরবর্তী ধাপে শিক্ষার্থী ও শিক্ষকদের বর্জ্য আলাদা করা, একবার ব্যবহারযোগ্য প্লাস্টিকের বিকল্প খুঁজে নেওয়া এবং পরিবেশ রক্ষায় নেতৃত্ব দেওয়ার মতো ব্যবহারিক দক্ষতা শেখানো হবে। বিদ্যালয় থেকে শুরু করে শিক্ষার্থীদের বাড়ি ও দৈনন্দিন জীবনেও ‘জিরো ওয়েস্ট’ বা যতটা সম্ভব বর্জ্য কমানোর চর্চা ছড়িয়ে দেওয়ার লক্ষ্য রয়েছে।

ম্যানুয়ালটি তৈরিতে পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়, জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড (এনসিটিবি) এবং শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের মতামত নেওয়া হয়েছে। আন্তর্জাতিক সংগঠন ব্রেক ফ্রি ফ্রম প্লাস্টিক (বিএফএফপি) ও প্লাস্টিক সলিউশনস ফান্ডের (পিএসএফ) গবেষণাভিত্তিক পরামর্শও এতে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।

ফলে স্থানীয় বাস্তবতার পাশাপাশি প্লাস্টিক দূষণ মোকাবিলায় আন্তর্জাতিকভাবে ব্যবহৃত কিছু কার্যকর পদ্ধতিও ম্যানুয়ালটিতে যুক্ত করা হয়েছে বলে জানিয়েছে এসডো।

বাংলাদেশের পরিবেশগত অবস্থান নিয়ে উদ্বেগের মধ্যেই ম্যানুয়ালটি প্রকাশ করা হলো। এসডোর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, এনভায়রনমেন্টাল পারফরম্যান্স ইনডেক্সে (ইপিআই) ১৭৭টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ১৭৫তম। পরিবেশগত পরিস্থিতির উন্নয়নে স্বল্প ও দীর্ঘমেয়াদি কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার প্রয়োজনীয়তাকে এই অবস্থানটি সামনে আনে।

দেশে প্লাস্টিকের ব্যবহার, বিশেষ করে একবার ব্যবহারযোগ্য প্লাস্টিকের বিস্তার, এই পরিবেশগত চাপের অন্যতম দৃশ্যমান দিক। বাজার, খাবারের প্যাকেট, পানির বোতল এবং বিভিন্ন দৈনন্দিন পণ্যের সঙ্গে প্লাস্টিকের ব্যবহার যুক্ত হয়ে আছে। ফলে শুধু আইন প্রয়োগের পাশাপাশি মানুষের আচরণে পরিবর্তন আনার বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

অনুষ্ঠানে পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী শেখ ফরিদুল ইসলাম বলেন, পরিবেশ রক্ষায় আইন প্রয়োগের পাশাপাশি প্রত্যেককে দায়িত্ব নিতে হবে।

তিনি বলেন, “এনফোর্সমেন্ট ছাড়া পরিবেশগত কাজ সফল করা সম্ভব নয়। সবাইকে দায়িত্ব নিতে হবে।”

প্রতিমন্ত্রী আরও বলেন, সম্প্রতি এক্সটেন্ডেড প্রডিউসার রেসপনসিবিলিটি বা ইপিআর পাস হয়েছে। ফলে প্লাস্টিক উৎপাদনকারীদেরও তাদের পণ্যের পরিবেশগত প্রভাবের দায়িত্ব নিতে হবে। তাঁর মতে, শিক্ষার্থীরা বিদ্যালয় ও বাগান পরিষ্কার রাখার দায়িত্ব নিলে পরিবেশের ওপর ইতিবাচক প্রভাব পড়বে।

পরিবেশের চেয়ে ব্যবসায়িক লাভকে বেশি গুরুত্ব দেওয়ার প্রবণতাকেও তিনি সমস্যা হিসেবে উল্লেখ করেন।

অনুষ্ঠানে পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের সচিব ইনচার্জ ড. ফাহমিদা খানম বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের নেতৃত্ব দেওয়ার সুযোগ তৈরির ওপর গুরুত্ব দেন।

তিনি বলেন, বিদ্যালয়ে ভালো করা শিক্ষার্থীদের পরিবেশ অ্যাম্বাসেডর হিসেবে তৈরি করে পাশের বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের প্রশিক্ষণে যুক্ত করা যেতে পারে। তাঁর মতে, শিক্ষার্থীরা অনেক সময় শিক্ষকের চেয়ে সহপাঠী বা বন্ধুর কাছ থেকে পাওয়া বার্তায় বেশি প্রভাবিত হয়।

দৈনন্দিন কেনাকাটার ক্ষেত্রেও ছোট ছোট পরিবর্তনের ওপর গুরুত্ব দেন তিনি। খাবার অর্ডারের সময় একবার ব্যবহারযোগ্য প্লাস্টিক না দেওয়ার অনুরোধ করা এবং কাগজের প্যাকেট ব্যবহারের কথা জানানোর পরামর্শ দেন তিনি। একই সঙ্গে কাগজের ব্যাগের ব্যবহার আবার বাড়ানোর প্রয়োজনীয়তার কথাও বলেন।

পরিবেশ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক ড. মো. লুৎফর রহমান বলেন, প্রত্যেক শিক্ষার্থী দায়িত্বশীল হলে পরিবেশের অনেক সমস্যা কমানো সম্ভব। বিদ্যালয়ে অর্জিত জ্ঞান অন্যদের মধ্যে ছড়িয়ে দেওয়ার আহ্বানও জানান তিনি।

তিনি জানান, সরকারি পর্যায়েও প্লাস্টিকের ব্যবহার কমানোর উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। তাঁর ভাষায়, সচিবালয়ে এখন প্লাস্টিকের বোতলের পরিবর্তে কাচের গ্লাস ব্যবহার করা হচ্ছে।

এসডোর চেয়ারপারসন সৈয়দ মার্গুব মুর্শেদ বলেন, পরিবেশগত চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় কোনো একটি প্রতিষ্ঠানের একক উদ্যোগ যথেষ্ট নয়। সরকার, বেসরকারি খাত, সুশীল সমাজ, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এবং তরুণদের সম্মিলিতভাবে কাজ করার প্রয়োজন রয়েছে।

এসডোর নির্বাহী পরিচালক সিদ্দীকা সুলতানা বলেন, তরুণ শিক্ষার্থীদের কাছে পরিবেশ শিক্ষাকে আরও বাস্তব ও কার্যকর করাই তাদের লক্ষ্য। শিক্ষার্থী ও শিক্ষকদের প্রয়োজনীয় জ্ঞান ও দক্ষতা দেওয়ার মাধ্যমে বিদ্যালয়ে টেকসই অভ্যাস ও পরিবেশগত নেতৃত্ব তৈরি করতে চান তারা।

ম্যানুয়াল তৈরিতে সহযোগিতা করা মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংক পিএলসির ডিএমডি ও জিসিআরও উসমান রাশেদ মুইন বলেন, পরিবেশ সচেতনতা ও টেকসই চর্চা তৈরির উদ্যোগে ব্যাংকটি সহযোগিতা করতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। শিক্ষার মাধ্যমে তরুণদের পরিবেশ রক্ষার কাজে যুক্ত করাকে তিনি দায়িত্বশীল সমাজ গঠনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে উল্লেখ করেন।

এসডোর ‘প্লাস্টিকমুক্ত ক্যাম্পাস’ উদ্যোগের মূল ধারণা হলো—পরিবেশবান্ধব আচরণ ছোট বয়স থেকেই অভ্যাসে পরিণত করা। বিদ্যালয়ে বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, প্লাস্টিকের বিকল্প ব্যবহার এবং শিক্ষার্থীদের নেতৃত্বের সুযোগ তৈরি করা গেলে সেই অভ্যাস বিদ্যালয়ের বাইরেও ছড়িয়ে পড়তে পারে।

এসডো মনে করছে, বিদ্যালয়কে শুধু শিক্ষার জায়গা হিসেবে নয়, বরং পরিবেশবান্ধব আচরণ শেখা ও চর্চার একটি কার্যকর প্ল্যাটফর্ম হিসেবে গড়ে তোলা সম্ভব। এ জন্য শিক্ষক, শিক্ষার্থী, অভিভাবক, স্থানীয় কর্তৃপক্ষ, উন্নয়ন সহযোগী এবং সুশীল সমাজের সংগঠনগুলোকে উদ্যোগটির সঙ্গে যুক্ত হওয়ার আহ্বান জানিয়েছে সংগঠনটি।

শেষ পর্যন্ত এই উদ্যোগের সাফল্য নির্ভর করবে একটি ম্যানুয়াল প্রকাশের চেয়ে বেশি কিছুতে—বিদ্যালয়ের প্রতিদিনের অভ্যাসে কতটা পরিবর্তন আসে, একবার ব্যবহারযোগ্য প্লাস্টিকের ব্যবহার কতটা কমে এবং সেই পরিবর্তন শিক্ষার্থীদের পরিবার ও বৃহত্তর সমাজে কতটা ছড়িয়ে পড়ে, তার ওপর।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *