বয়স তখন ১৪। বন্ধুরা ফল আর জুস খাওয়ার কথা বলে মুস্তাফাকে একটি বাগানে ডেকেছিল। সেখানে অপেক্ষা করছিল সাতজন পুরুষ। ছিল একটি ছুরিও।
মুস্তাফা প্রতিরোধ করেছিলেন। তার কব্জির নিচে এখনো সেই ছুরির দাগ আছে। তিনি জানান, তাকে বেঁধে যৌন নিপীড়ন করা হয়।
সেই ঘটনার পর ছয় বছর কেটে গেছে। এখন তার বয়স ২০। কিন্তু নির্যাতন থামেনি। নিজের হিসাব অনুযায়ী, এ পর্যন্ত প্রায় ৭০ থেকে ৮০ বার যৌন নিপীড়নের শিকার হয়েছেন তিনি।
মুস্তাফার গল্প আফগানিস্তানে বহু বছর ধরে চলে আসা ‘বাচা বাজি’ বা ‘বয় প্লে’ নামে পরিচিত এক ভয়াবহ যৌন শোষণব্যবস্থার বর্তমান চিত্র সামনে এনেছে। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার ও মানব পাচারবিষয়ক প্রতিবেদনে এটিকে শিশুদের যৌন শোষণ ও যৌন দাসত্বের একটি রূপ হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে।
বাচ্চা বাজিতে সাধারণত দরিদ্র পরিবারের কিশোর ছেলেদের টার্গেট করা হয়। তাদের নাচ শেখানো হয়। অনেক ক্ষেত্রে নারীদের পোশাক পরানো হয়। মেকআপ করিয়ে পুরুষদের পার্টি, বিয়ে বা ব্যক্তিগত অনুষ্ঠানে নাচানো হয়।
নাচ শেষ হওয়ার পর শুরু হয় আরেক দফা শোষণ। ছেলেদের ওপর যৌন নির্যাতন চালানো হয়। অনেক ক্ষেত্রে তাদের জোর করে এক পুরুষের কাছ থেকে আরেক পুরুষের কাছে নিয়ে যাওয়া হয়। দারিদ্র্য, সামাজিক কলঙ্ক এবং ক্ষমতাবানদের ভয় তাদের বেরিয়ে আসার পথ আরও সংকুচিত করে।
মুস্তাফা জানান, ছোটবেলা থেকেই তিনি ভালো নাচতেন। দরিদ্র পরিবারের জন্য আয় করাও জরুরি ছিল। একটি অনুষ্ঠানে নাচের বিনিময়ে তাকে প্রায় ৩ হাজার আফগানি দেওয়ার কথা বলা হতো।
কিন্তু অনুষ্ঠান শেষে পরিস্থিতি বদলে যেত।
তার ভাষ্য অনুযায়ী, কখনো ড্রেসিংরুমে দুই-তিনজন পুরুষ অপেক্ষা করত। তারা তাকে জোর করে নিয়ে যেত। কখনো পরিবারে অর্থের প্রয়োজন থাকায় তিনি নির্যাতনের ঝুঁকি জেনেও পারিশ্রমিক নিতে বাধ্য হতেন।
একবার দুই ব্যক্তি তাকে নিজেদের মধ্যে ভাগ করে নেয়। পরে দীর্ঘ সময় ঠিকমতো দাঁড়াতেও পারেননি তিনি।
মুস্তাফার কাছে সবচেয়ে ভয়াবহ বিষয় শুধু নির্যাতন নয়। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে পালানোর অসম্ভবতা।
তিনি জানিয়েছেন, কখনো নাচ শেষ করে বাইরে এসে দেখেছেন একটি গাড়ি অপেক্ষা করছে। তাকে জোর করে গাড়িতে তোলা হয়েছে। চোখ বেঁধে নিয়ে যাওয়া হয়েছে অজানা কোনো বাড়ি বা বাগানে। সেখানে কয়েক ঘণ্টা আটকে রাখা হয়েছে।
কখনো অপরাধীরা ছিল ধনী ব্যক্তি। কখনো ছিল অপরাধী চক্রের সদস্য। কখনো তারা পারিশ্রমিকও দেয়নি।
মুস্তাফার ভাষায়, নির্যাতনের সময় তার কাছে পৃথিবী অন্ধকার হয়ে যায়। হাত-পা অবশ হয়ে আসে। মনে হয় তিনি মারা যাচ্ছেন।
কেন তিনি বিচার চান না—এই প্রশ্নের উত্তরও ভয়াবহ।
তার আশঙ্কা, তালেবানের কাছে অভিযোগ করলে উল্টো তাকেই অপরাধী বানানো হতে পারে। তিনি বলেন, বাচ্চা বাজির শিকার ছেলেরা অভিযোগ করলে তাদের হত্যা করা হতে পারে।
বাচ্চা বাজি নিষিদ্ধ করার ইতিহাস তালেবানের জন্য নতুন নয়।
১৯৯৬ থেকে ২০০১ সাল পর্যন্ত প্রথম দফা শাসনে তালেবান এই প্রথার বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নেয়। তালেবান প্রতিষ্ঠাতা মোল্লা মোহাম্মদ ওমরের উত্থানের সঙ্গে বাচ্চা বাজির বিরুদ্ধে অভিযান পরিচালনার ঘটনাও জড়িয়ে আছে। তালেবান সে সময় এটিকে গুরুতর অপরাধ হিসেবে বিবেচনা করত।
কিন্তু ২০০১ সালে তালেবান ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর পরিস্থিতি বদলে যায়।
যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের সমর্থনে গঠিত আফগান সরকারের বিভিন্ন স্তরে ক্ষমতাবান ব্যক্তি, সামরিক কমান্ডার ও স্থানীয় নেতাদের বিরুদ্ধে বাচ্চা বাজিতে জড়িত থাকার অভিযোগ ওঠে। ফলে তালেবানের পতনের পর এই প্রথা অনেক এলাকায় আবার দৃশ্যমান হয়ে ওঠে।
আফগানিস্তানের তৎকালীন সরকার শেষ পর্যন্ত আইন করে বাচ্চা বাজিকে অপরাধ হিসেবে ঘোষণা করে। ২০১৭ সালের মানব পাচারবিরোধী আইনে যৌন পাচার ও বাচ্চা বাজি অপরাধ হিসেবে অন্তর্ভুক্ত হয়। ২০১৮ সালের দণ্ডবিধিতেও এ-সংক্রান্ত শাস্তির বিধান রাখা হয়। শিশু বা বাচ্চা বাজির ক্ষেত্রে শাস্তি আরও কঠোর ছিল।
কিন্তু আইন থাকলেই যে বিচার নিশ্চিত হয় না, আফগানিস্তানের অভিজ্ঞতা তার উদাহরণ।
২০২১ সালের আগস্টে তালেবান আবার আফগানিস্তানের নিয়ন্ত্রণ নেয়।
এর পর থেকে তালেবান প্রকাশ্যে বাচ্চা বাজিকে নিষিদ্ধ বলে আসছে। কিন্তু আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষণ বলছে, নিষেধাজ্ঞার সঙ্গে বাস্তব পরিস্থিতির বড় পার্থক্য রয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তরের ২০২৩ সালের মানব পাচারবিষয়ক প্রতিবেদনে তালেবানের মধ্যে বাচ্চা বাজির মাধ্যমে যৌন দাসত্বের একটি ‘ধারাবাহিক ধরন’ থাকার কথা বলা হয়। প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, ওই সময়ে বাচ্চা বাজির ঘটনা বেড়েছে বলে পর্যবেক্ষকদের ধারণা ছিল। তালেবান সদস্য ও কমান্ডারদেরও কিছু ঘটনায় জড়িত থাকার অভিযোগ উঠে আসে।
পরের বছরের প্রতিবেদনে পরিস্থিতির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক উঠে আসে।
২০২৪ সালের প্রতিবেদনে বলা হয়, তালেবান মানব পাচারসংক্রান্ত কোনো তদন্ত, মামলা বা দণ্ডের তথ্য দেয়নি। বাচ্চা বাজি আনুষ্ঠানিকভাবে নিষিদ্ধ থাকলেও তা চলতে থাকার কথা প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়। পর্যবেক্ষকদের মতে, তালেবানের কিছু সদস্যও এ ধরনের অপরাধের সঙ্গে জড়িত ছিলেন।
অর্থাৎ সরকারি নিষেধাজ্ঞা আছে। কিন্তু কার্যকর জবাবদিহির প্রমাণ খুবই সীমিত। বাচ্চা বাজির শিকার ছেলেদের জন্য বিচার চাওয়া নিজেই ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তরের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ভুক্তভোগীরা শাস্তির ভয় এবং সামাজিক কলঙ্কের কারণে অভিযোগ করতে অনাগ্রহী। বিশেষ করে যৌন নিপীড়নের শিকার পুরুষ শিশুদের ক্ষেত্রে সামাজিক লজ্জা বড় বাধা হয়ে দাঁড়ায়।
এখানে একটি ভয়াবহ দ্বৈত নিপীড়ন কাজ করে।
প্রথমে শিশুটিকে যৌনভাবে শোষণ করা হয়। পরে সেই শোষণের দায়ও অনেক সময় তার ওপর চাপানো হয়।
মুস্তাফার বক্তব্যে এই বাস্তবতাই স্পষ্ট। তার অভিযোগ, অপরাধীদের বদলে তাকে প্রশ্ন করা হতে পারে—সে কেন ওই অনুষ্ঠানে গিয়েছিল।
বাচ্চা বাজিকে কেবল তালেবান শাসনের সমস্যা হিসেবে দেখলে আফগানিস্তানের দীর্ঘ সংকটের একটি বড় অংশ বাদ পড়ে যায়।
তালেবান ক্ষমতায় ফেরার আগেও এই প্রথা ছিল। বরং আন্তর্জাতিক নথিতে আফগান নিরাপত্তা বাহিনী, পুলিশ, সামরিক কমান্ডার, স্থানীয় ক্ষমতাবান ব্যক্তি ও যুদ্ধবাজ নেতাদের বিরুদ্ধে বহু অভিযোগ নথিভুক্ত হয়েছে।
২০২০ সালের মার্কিন মানব পাচারবিষয়ক প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, আফগানিস্তানে বাচ্চা বাজি ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে ছিল। ওই বছর আফগান কর্তৃপক্ষ ২৩৭টি মামলা বিচারের জন্য পাঠানোর এবং আরও ১৮৫টি মামলা তদন্তাধীন থাকার তথ্য দিয়েছিল। একই প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০১৪ সালের একটি মানবাধিকার তদন্তে সাক্ষাৎকার দেওয়া ৩৬ জন বাচ্চা বাজি চর্চাকারীর ৮৯ শতাংশ জানিয়েছিলেন, তাদের কখনো আদালতে নেওয়া হয়নি।
অর্থাৎ তালেবানের আগে সমস্যাটি ছিল। কিন্তু ক্ষমতাবানদের দায়মুক্তি সমস্যাটিকে আরও গভীর করেছে।
আফগানিস্তানে বিদেশি সেনাদের উপস্থিতির সময়ও বাচ্চা বাজি নিয়ে গুরুতর অভিযোগ উঠেছিল।
২০০৬ সালে হেলমান্দের সাঙ্গিনে ব্রিটিশ সেনারা এমন এক পুলিশ কর্মকর্তাকে রক্ষার নির্দেশ পেয়েছিল, যার বিরুদ্ধে শিশু অপহরণ ও ধর্ষণের অভিযোগ ছিল। মার্কিন বাহিনীর সদস্যরাও একই ধরনের পরিস্থিতির মুখোমুখি হন।
২০১১ সালে মার্কিন স্পেশাল ফোর্সেসের ক্যাপ্টেন ড্যান কুইন এক আফগান মিলিশিয়া কমান্ডারের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেন। ওই কমান্ডারের কাছে একটি ছেলে যৌনদাস হিসেবে আটকে থাকার অভিযোগ ছিল। কুইনকে পরে দায়িত্ব থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়।
২০১২ সালে মার্কিন মেরিন ল্যান্স কর্পোরাল গ্রেগরি বাকলি জুনিয়র আফগানিস্তানে নিহত হন। তার বাবার কাছে করা শেষ ফোনকলের বর্ণনা অনুযায়ী, তিনি ঘাঁটিতে ছেলেদের যৌন নির্যাতনের চিৎকার শুনতে পাওয়ার কথা বলেছিলেন।
এই ঘটনাগুলো দেখায়, বাচ্চা বাজি কোনো একক রাজনৈতিক শক্তির তৈরি সমস্যা নয়। এটি যুদ্ধ, দারিদ্র্য, পুরুষতান্ত্রিক ক্ষমতা, শিশুর অসহায়ত্ব এবং বিচারহীনতার দীর্ঘ সমন্বিত ফল।
মুস্তাফার বয়স এখন ২০। কিন্তু তার জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বছরগুলো কেটেছে ভয় এবং যৌন নিপীড়নের মধ্যে।
তার মতো অনেক ভুক্তভোগী প্রকাশ্যে আসেন না। কেউ পরিবারকে বলতে পারেন না। কেউ পুলিশে যেতে ভয় পান। কেউ দেশ ছেড়ে পালান।
মুস্তাফার কয়েকজন বন্ধু একটি স্থানীয় এনজিওর সহায়তায় পাকিস্তানে নিরাপদে যেতে পেরেছেন বলে তিনি জানিয়েছেন। কিন্তু তিনি এখনো হেরাতেই আছেন। নিরাপত্তার কারণে মুখ আড়াল করে কথা বলতে হয় তাকে।
বাচ্চা বাজির প্রকৃত পরিসর নির্ধারণ করা কঠিন। কারণ অধিকাংশ ঘটনাই প্রকাশ্যে আসে না। আন্তর্জাতিক প্রতিবেদনগুলোও বলছে, ভুক্তভোগীদের মধ্যে অভিযোগ না করার প্রবণতা প্রবল। ফলে সরকারি পরিসংখ্যান বাস্তব চিত্রের চেয়ে অনেক ছোট হতে পারে।
মুস্তাফার গল্প তাই শুধু একজন তরুণের নির্যাতনের গল্প নয়।
এটি একটি প্রশ্নও।
কোনো সরকার কোনো প্রথাকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করলেই কি তা শেষ হয়ে যায়?
আফগানিস্তানের বাচ্চা বাজির ক্ষেত্রে উত্তরটি এখনো ‘না’।
আইন আছে। নিষেধাজ্ঞা আছে। কিন্তু ভুক্তভোগীর নিরাপত্তা নেই। কার্যকর বিচার নেই। আর ক্ষমতাবানদের জবাবদিহিও নেই।
এই শূন্যতার মধ্যেই মুস্তাফার মতো ছেলেরা আবারও নাচের মঞ্চে ওঠে।
তারপর আলো নিভে যায়।