চারণভূমি রক্ষায় স্থানীয় জনগোষ্ঠীকে যুক্ত করার আহ্বান পরিবেশমন্ত্রীর

বাংলাদেশের গ্রামীণ অর্থনীতি ও প্রাণিসম্পদ খাতের জন্য ক্রমশ কমে আসা চারণভূমি রক্ষায় স্থানীয় জনগোষ্ঠীকে সরাসরি সম্পৃক্ত করার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তনমন্ত্রী আবদুল আউয়াল মিন্টু।

বুধবার (২৬শে আগস্ট) মঙ্গোলিয়ার রাজধানী উলানবাটরে জাতিসংঘ মরুকরণ প্রতিরোধ কনভেনশনের (UNCCD) ১৭তম কনফারেন্স অব দ্য পার্টিজের (COP17) একটি মন্ত্রী পর্যায়ের সংলাপে তিনি এ আহ্বান জানান। ‘রেস্টোরেশন অফ রেঞ্জল্যান্ড এন্ড দ্য ওয়েলবিং অফ প্যাসটোরালিস্ট কমিউনিটিজ’ শীর্ষক এই সংলাপে বিভিন্ন দেশের মন্ত্রী, উপমন্ত্রী ও প্রতিনিধি দলের প্রধানরা অংশ নেন।

মন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশকে প্রচলিত অর্থে বিস্তীর্ণ চারণভূমির দেশ বলা যায় না। তবে দেশের গ্রামীণ মানুষের জীবন ও অর্থনীতিতে প্রাণিসম্পদের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। ফসল কাটার পর কৃষিজমি, পতিত জমি, চরাঞ্চল, জলাভূমি এবং সড়কের পাশের বিভিন্ন জায়গা গবাদিপশুর চারণভূমি হিসেবে ব্যবহৃত হয়।

প্রাণিসম্পদ খাত বাংলাদেশের মোট দেশজ উৎপাদনে প্রায় ২ শতাংশ অবদান রাখে এবং এর সঙ্গে লাখো মানুষের জীবিকা জড়িত। কিন্তু জনসংখ্যা বৃদ্ধি, কৃষি সম্প্রসারণ, বসতি ও অন্যান্য ভূমি ব্যবহারের কারণে পশুচারণের জায়গা ক্রমেই সংকুচিত হচ্ছে। উপকূলীয় অঞ্চলে এই সংকট আরও স্পষ্ট বলে জানান মন্ত্রী।

এ পরিস্থিতিতে কমিউনিটি ও খাস চারণভূমি চিহ্নিত করে মানচিত্রে অন্তর্ভুক্ত করার ওপর জোর দেন তিনি। একই সঙ্গে স্থানীয় প্রশাসন ও জনগোষ্ঠীর মধ্যে সমন্বয় বাড়ানো এবং ভূমি ব্যবহারের বিরোধ দ্রুত নিষ্পত্তির জন্য কার্যকর ব্যবস্থা গড়ে তোলার কথা বলেন।

মিন্টু বলেন, বাংলাদেশের জলাভূমি ও বন্যাপ্রবণ অঞ্চল শুধু পশুচারণের জায়গা নয়; এগুলো মাটির উর্বরতা ধরে রাখা, পানি নিয়ন্ত্রণ, জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ এবং কার্বন ধারণের ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ। তাই প্রাণিসম্পদ উৎপাদন ও পরিবেশ সংরক্ষণকে পরস্পরের প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে দেখার পরিবর্তে জাতীয় ভূমি ব্যবস্থাপনার অংশ হিসেবে সমন্বিতভাবে বিবেচনা করা প্রয়োজন।

এ ক্ষেত্রে টাঙ্গুয়ার হাওরের কমিউনিটিভিত্তিক ব্যবস্থাপনার উদাহরণ তুলে ধরেন তিনি। তাঁর মতে, স্থানীয় জনগোষ্ঠীকে সম্পৃক্ত করে প্রাকৃতিক সম্পদ ব্যবস্থাপনা জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণে ইতিবাচক ফল দিতে পারে। তবে এ ধরনের উদ্যোগ দীর্ঘমেয়াদে কার্যকর রাখতে নিয়মিত অর্থায়ন ও দীর্ঘস্থায়ী সরকারি অঙ্গীকার প্রয়োজন।

মন্ত্রী জানান, ভবিষ্যতে বাংলাদেশ টেকসই চারণভূমি ও কমন ল্যান্ড ব্যবস্থাপনাকে দেশের বৃহত্তর পরিবেশ ও জলবায়ু নীতির সঙ্গে আরও ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত করবে। এ ক্ষেত্রে জাতীয় জীববৈচিত্র্য কৌশল ও কর্মপরিকল্পনা, জাতীয় অভিযোজন পরিকল্পনা এবং ভূমি অবক্ষয়, খরা ও মরুকরণ মোকাবিলার জাতীয় রোডম্যাপের সঙ্গে সমন্বয় বাড়ানোর পরিকল্পনা রয়েছে।

তিনি চারণভূমি পুনরুদ্ধার ও টেকসই ভূমি ব্যবস্থাপনায় পর্যাপ্ত অর্থায়ন, জবাবদিহি এবং বাস্তবভিত্তিক পদক্ষেপ নিশ্চিত করার আহ্বান জানান। একই সঙ্গে বাংলাদেশ এ বিষয়ে নিজের অভিজ্ঞতা অন্য দেশগুলোর সঙ্গে ভাগ করে নিতে এবং অন্য দেশগুলোর কার্যকর অভিজ্ঞতা থেকে শিখতে প্রস্তুত বলেও জানান।

মঙ্গোলিয়ায় অনুষ্ঠিত UNCCD COP17-এর আলোচনায় বিশ্বজুড়ে ভূমির অবক্ষয়, মরুকরণ, চারণভূমি পুনরুদ্ধার এবং পশুপালননির্ভর জনগোষ্ঠীর জীবন ও জীবিকা রক্ষার বিষয়গুলো গুরুত্ব পাচ্ছে। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে এই আলোচনার গুরুত্ব মূলত বিস্তীর্ণ প্রাকৃতিক চারণভূমির পরিমাণের চেয়ে বেশি—দেশের কৃষিজমি, চর, জলাভূমি ও কমন ল্যান্ড কীভাবে একই সঙ্গে মানুষের জীবিকা ও পরিবেশের জন্য টেকসইভাবে ব্যবহার করা যায়, সেই প্রশ্নে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *