নেপাল-তিব্বত সীমান্তে হিমবাহ ধসের পর ভয়াবহ বন্যা

হিমালয়ের নেপাল-চীন সীমান্তে হিমবাহের একটি অংশ ধসে সৃষ্ট ভয়াবহ আকস্মিক বন্যায় অন্তত ১৬০ জন নিহত হয়েছেন। বুধবারের এই দুর্যোগে নেপালের রাসুয়া, নুওয়াকোট ও আশপাশের এলাকায় ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ হয়েছে। সীমান্তের ওপারে চীনের তিব্বত স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চলের গিরং কাউন্টিতেও প্রাণহানি ঘটেছে। শত শত মানুষ এখনো নিখোঁজ।

নেপালি কর্তৃপক্ষের হিসাবে দেশটিতে অন্তত ১৫৭ জনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। তিব্বতে আরও তিনজন নিহত হয়েছেন। নিখোঁজের সংখ্যা নিয়ে বিভিন্ন সময়ের হিসাবে পার্থক্য রয়েছে। নেপালে ৪০০ জনের বেশি মানুষ নিখোঁজ বলে জানানো হয়েছে। তাঁদের মধ্যে ৩৪১ জন বিদেশি নাগরিক। তিব্বতের গিরং কাউন্টিতে চীনা কর্তৃপক্ষের হিসাবে নিখোঁজের সংখ্যা ২৬৫ থেকে বেড়ে ৫০০-এর বেশি হয়েছে। ফলে দুই দেশের মিলিয়ে নিখোঁজের সংখ্যা ৭০০ ছাড়িয়েছে।

বুধবার (২৬শে আগস্ট) সকালে নেপালের রাসুয়া জেলার লেন্দে খোলা নদী উপত্যকায় হঠাৎ ভয়াবহ পানির স্রোত নেমে আসে। পানি, কাদা, পাথর ও বরফের বিশাল প্রবাহ ভুটেকোশী নদী হয়ে নিচের দিকে ছড়িয়ে পড়ে। পরে এই স্রোত ত্রিশূলী নদী অববাহিকাতেও ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি ঘটায়।

আন্তর্জাতিক পর্বত গবেষণা সংস্থা আইসিআইএমওডির প্রাথমিক বিশ্লেষণ বলছে, উচ্চ হিমালয়ের একটি হিমবাহ বা বরফঢাকা অংশ থেকে বিপুল পরিমাণ বরফ ও পাথর ধসে পড়তে পারে। এই আইসরক এভালঞ্চ লেন্দে খোলা নদীতে পড়ে সাময়িকভাবে নদীর প্রবাহ আটকে দেয়। পরে সেই প্রাকৃতিক বাধ ভেঙে গেলে বিপুল পানি ও ধ্বংসাবশেষ আকস্মিক বন্যার মতো নিচের দিকে নেমে আসে।

স্যাটেলাইট বিশ্লেষণে দেখা গেছে, প্রায় ৫,২০০ মিটার উচ্চতা থেকে হিমবাহের নিচের একটি বড় অংশ ভেঙে প্রায় ১,২০০ মিটার নিচে নেমে আসে। পথে এটি বিপুল পরিমাণ পাথর ও পলি সংগ্রহ করে। পরে সেই ধ্বংসাবশেষ নদীতে পড়ে বিপজ্জনক পরিস্থিতি তৈরি করে।

তবে দুর্যোগের সুনির্দিষ্ট কারণ এখনো চূড়ান্তভাবে নির্ধারিত হয়নি। প্রথম দিকে ভূমিকম্পকে সম্ভাব্য কারণ মনে করা হয়েছিল। পরে যুক্তরাষ্ট্রের ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থা ইউএসজিএসের বিশ্লেষণে দেখা যায়, যে ভূকম্পন সংকেতটি পাওয়া গিয়েছিল, সেটি ভূমিধসের কারণ নয়। বরং ভূমিধসের ফলেই ওই সংকেত তৈরি হয়েছিল। ঘটনাটি পরে ৫.২ মাত্রার ভূকম্পন হিসেবে রেকর্ড হয়।

বন্যার ভয়াবহতা বোঝা যায় নদীর পানির উচ্চতা বৃদ্ধির গতিতে। আইসিআইএমওডির প্রাথমিক পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, ত্রিশূলী নদীর গালছিতে মাত্র ৩০ মিনিটে পানির উচ্চতা প্রায় ৯ মিটার বেড়ে যায়। মালেখুতেও পানির উচ্চতা প্রায় ৭ মিটার বৃদ্ধি পায়।

এ ধরনের আকস্মিক স্রোত সাধারণ বন্যার তুলনায় অনেক বেশি বিধ্বংসী। কারণ পানির সঙ্গে বিপুল পরিমাণ পাথর, বোল্ডার, কাদা ও গাছের গুঁড়ি নেমে আসে। ফলে নদীর তীরবর্তী ঘরবাড়ি, সেতু, সড়ক ও অন্যান্য স্থাপনা মুহূর্তের মধ্যে ধ্বংস হয়ে যায়।

নেপালে অন্তত ১৯টি সেতু এবং প্রায় ৪০ কিলোমিটার সড়ক ক্ষতিগ্রস্ত বা ভেসে গেছে বলে প্রাথমিক প্রতিবেদনে জানা গেছে। ছয়টি গুরুত্বপূর্ণ জলবিদ্যুৎ ও বিদ্যুৎ সঞ্চালন স্থাপনাও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

বিপর্যয়ের অন্যতম বড় উদ্বেগ হলো নিখোঁজ বিদেশি নাগরিকদের সংখ্যা। নেপাল ট্যুরিজম বোর্ডের হিসাবে ৪০৩ জনের সন্ধান পাওয়া যাচ্ছিল না। তাঁদের মধ্যে ৩৪১ জন বিদেশি। তাঁদের অনেকেই পর্যটন, তীর্থযাত্রা বা ট্রেকিংয়ের উদ্দেশ্যে ওই অঞ্চলে ছিলেন।

নিখোঁজ বিদেশিদের মধ্যে ভারতের নাগরিকের সংখ্যাই বেশি। তাঁদের একটি অংশ কৈলাস-মানস সরোবর তীর্থযাত্রার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, অস্ট্রেলিয়া ও কানাডার নাগরিকও নিখোঁজ রয়েছেন। তিব্বতের দিকে বিদেশি নাগরিকদেরও হতাহতের আশঙ্কা রয়েছে।

নেপালের গোসাইকুণ্ড এলাকায় জনাই পূর্ণিমা উপলক্ষে যাওয়া স্থানীয় তীর্থযাত্রী ও ট্রেকাররাও দুর্যোগের মধ্যে পড়েন। রাসুয়া ও নুওয়াকোটের পাশাপাশি জলবিদ্যুৎ প্রকল্পে কর্মরত বিদেশি শ্রমিকদের নিয়েও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। দক্ষিণ কোরিয়ার নয়জন নাগরিকের সঙ্গে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হওয়ার পর দেশটি জরুরি উদ্ধারকারী দল পাঠানোর উদ্যোগ নিয়েছে।

দুর্যোগের পর নেপাল সরকার সেনাবাহিনী, পুলিশ ও উদ্ধারকারী দল মোতায়েন করেছে। হেলিকপ্টার, ড্রোন ও প্রশিক্ষিত কুকুর ব্যবহার করে নিখোঁজদের সন্ধান চলছে। কিন্তু ধ্বংস হয়ে যাওয়া সড়ক, নদীর পানির উচ্চতা এবং বিপুল পরিমাণ কাদা ও পাথরের কারণে অনেক এলাকায় স্থলপথে পৌঁছানো কঠিন হয়ে পড়েছে। কিছু এলাকায় হেলিকপ্টারও অবতরণ করতে পারছে না।

নদীতীরবর্তী বাসিন্দাদের নিরাপদ স্থানে সরে যাওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। কারণ উজানে এখনো ধ্বংসাবশেষ জমে থাকায় নতুন করে পানির প্রবল স্রোত নেমে আসার আশঙ্কা রয়েছে। আইসিআইএমওডি সতর্ক করেছে, উজানে কোনো প্রাকৃতিক বাধ থাকলে সেটি ভেঙে গেলে দ্বিতীয় দফায়ও বড় ধরনের বন্যা হতে পারে।

বিপর্যয়ের পর নেপাল আন্তর্জাতিক সহায়তা চেয়েছে। ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি নেপালের প্রধানমন্ত্রী বালেন্দ্র শাহর সঙ্গে কথা বলে সহায়তার আশ্বাস দিয়েছেন। ভারত জরুরি ত্রাণসামগ্রী নিয়ে একটি উদ্ধারকারী বিমান পাঠিয়েছে। এতে আশ্রয় সামগ্রী, কম্বল, স্বাস্থ্যসামগ্রী, সৌর বাতি ও ওষুধ রয়েছে।

আন্তর্জাতিক রেড ক্রস ও রেড ক্রিসেন্ট ফেডারেশন নেপালের ত্রাণ কার্যক্রমে জরুরি সহায়তার জন্য ১০ লাখ সুইস ফ্রাঁ বরাদ্দ করেছে। জাতিসংঘও নেপালের উদ্ধার ও ত্রাণ কার্যক্রমে সহায়তার প্রস্তুতি জানিয়েছে। ইউরোপীয় ইউনিয়ন ক্ষয়ক্ষতির মানচিত্র তৈরি ও উদ্ধার সমন্বয়ের জন্য স্যাটেলাইটভিত্তিক কোপার্নিকাস জরুরি ব্যবস্থাপনা সেবা সক্রিয় করেছে।

বিপর্যয়ের সঙ্গে জলবায়ু পরিবর্তনের সম্পর্ক নিয়ে বিজ্ঞানীরা সতর্ক। তবে এই নির্দিষ্ট হিমবাহ ধসের পেছনে জলবায়ু পরিবর্তন সরাসরি কতটা ভূমিকা রেখেছে, তা এখনো নিশ্চিত নয়।

হিন্দুকুশ-হিমালয় অঞ্চলে গত কয়েক দশকে হিমবাহ দ্রুত সঙ্কুচিত হয়েছে। ২০১১ থেকে ২০২০ সালের মধ্যে এ অঞ্চলের হিমবাহের বরফ ক্ষয়ের হার আগের দশকের তুলনায় ৬৫ শতাংশ বেশি ছিল। নেপালের হিমবাহগুলোও গত প্রায় তিন দশকে তাদের মোট বরফের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ হারিয়েছে।

তাপমাত্রা বাড়লে হিমবাহ দ্রুত গলতে পারে। একই সঙ্গে পাহাড়ি ঢাল ও বরফের কাঠামো অস্থিতিশীল হয়ে উঠতে পারে। এতে বরফধস, ভূমিধস এবং আকস্মিক বন্যার ঝুঁকি বাড়ে। তবে কোনো একটি দুর্যোগকে শুধু জলবায়ু পরিবর্তনের ফল হিসেবে চিহ্নিত করার আগে স্থানীয় ভূতাত্ত্বিক ও আবহাওয়াগত কারণও বিশ্লেষণ করা জরুরি।

নেপাল-তিব্বত সীমান্তের এই বিপর্যয় হিমালয়ের দ্রুত পরিবর্তনশীল ঝুঁকির একটি বড় উদাহরণ। মাত্র কয়েক মিনিটের মধ্যে বিপুল পরিমাণ বরফ, পাথর ও পানি নদীর গতিপথ বদলে দিতে পারে। এর প্রভাব সীমান্তের দুই পাশের জনবসতি, পর্যটন, যোগাযোগ ও জলবিদ্যুৎ অবকাঠামোয় পড়ছে।

সবচেয়ে বড় প্রশ্ন এখন উদ্ধার অভিযান কত দ্রুত দুর্গম এলাকাগুলোতে পৌঁছাতে পারবে। একই সঙ্গে উজানে আটকে থাকা পানি ও ধ্বংসাবশেষ নতুন বিপদ তৈরি করবে কি না, সেটিও নজরে রাখতে হচ্ছে।

বিজ্ঞানীরা বলছেন, উষ্ণ হয়ে ওঠা হিমালয়ে শুধু দুর্যোগের পর উদ্ধার ব্যবস্থা জোরদার করলেই হবে না। হিমবাহ, নদী ও পাহাড়ি ঢালের পরিবর্তন নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করতে হবে। দ্রুত সতর্কবার্তা পৌঁছে দেওয়ার ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। কারণ এই অঞ্চলে কয়েক মিনিটের ব্যবধানই জীবন ও মৃত্যুর পার্থক্য তৈরি করতে পারে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *