মারুফ আহমেদ
ফল ও শাকসবজি স্বাস্থ্যকর খাদ্যের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা ও পুষ্টির চাহিদা মেটাতে প্রতিদিনই মানুষ ফল খায়। কিন্তু বাজার থেকে কেনা ফল কতটা নিরাপদ, তা নিয়ে ভোক্তাদের মধ্যে প্রশ্ন বাড়ছে।
বিশেষ করে অপরিপক্ব ফল দ্রুত পাকানো, রং পরিবর্তন এবং বাজারজাত করতে বিভিন্ন রাসায়নিক ব্যবহারের অভিযোগ রয়েছে। রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন ফলের আড়ত ও বাজারে এসব অনিয়ম নিয়ে মাঝেমধ্যে অভিযানও হয়। তবে অভিযোগ রয়েছে, জরিমানা ও সাময়িক ব্যবস্থা নেওয়ার পর অনেক ক্ষেত্রে একই ব্যবসা আবার শুরু হয়।
তবে এ বিষয়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈজ্ঞানিক পার্থক্য বোঝা জরুরি। ইথেফোন নিজেই এমন কোনো রাসায়নিক নয়, যাকে সব ধরনের ব্যবহারে ‘মরণঘাতী বিষ’ বলা যায়। এটি উদ্ভিদের একটি স্বীকৃত গ্রোথ রেগুলেটর। উদ্ভিদে প্রয়োগের পর এটি ইথিলিন ছাড়ে। ইথিলিন উদ্ভিদের স্বাভাবিক বৃদ্ধি, পরিপক্বতা ও পাকায় ভূমিকা রাখে। আন্তর্জাতিকভাবে নির্দিষ্ট ফসল, মাত্রা ও ব্যবহারের নিয়ম মেনে ইথেফোনের ব্যবহার অনুমোদিত।
কিন্তু এখানেই মূল প্রশ্ন। অনুমোদিত কৃষি ব্যবহার আর অপরিপক্ব ফলকে অবৈধভাবে রাসায়নিক দিয়ে দ্রুত পাকানো এক বিষয় নয়।
জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা (এফএও) ও বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার যৌথ বিশেষজ্ঞ কমিটি ইথেফোন নিয়ে টেকনোলজিক্যাল ও অবশিষ্টাংশ মূল্যায়ন করেছে। ২০১৫ সালের মূল্যায়নে ইথেফোনের গ্রহণযোগ্য দৈনিক গ্রহণমাত্রা (এডিআই) নির্ধারণ করা হয় প্রতি কেজি শরীরের ওজনের জন্য ০ থেকে ০.০৫ মিলিগ্রাম। একই মূল্যায়নে খাদ্যের মাধ্যমে মানুষের জন্য ক্যানসারের ঝুঁকি তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা কম বলে উল্লেখ করা হয়।
অর্থাৎ ইথেফোন ব্যবহারের ক্ষেত্রে মাত্রা, প্রয়োগের পদ্ধতি, ফসলের পরিপক্বতার স্তর এবং ফসল তোলার পর কত সময় পার হয়েছে—সবই গুরুত্বপূর্ণ।
এফএও-এর কৃষি তথ্যেও দেখা যায়, কিছু ফসল পাকানো বা পরিপক্বতা ত্বরান্বিত করতে ইথেফোন ব্যবহারের অনুমোদিত নজির রয়েছে। আবার বিভিন্ন ফসলের ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট মাত্রা ও ফসল তোলার আগে অপেক্ষার সময়ও নির্ধারিত থাকে।
বাংলাদেশেও কৃষি গবেষণায় ইথেফোনের ব্যবহার নিয়ে পরীক্ষা হয়েছে। বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটের একটি গবেষণায় টমেটো পাকাতে বিভিন্ন মাত্রায় ইথেফোন ব্যবহারের প্রভাব পরীক্ষা করা হয়। গবেষণায় নির্দিষ্ট সময় পর ফলের ইথেফোন অবশিষ্টাংশ নিরাপদ সীমার নিচে থাকার তথ্য পাওয়া যায়।
তাই ‘ইথেফোন মানেই বিষ’—এমন সরল সিদ্ধান্ত বৈজ্ঞানিকভাবে সঠিক নয়। আবার ‘ইথেফোন কৃষিতে ব্যবহার হয়, তাই যেকোনোভাবে ফল পাকানো নিরাপদ’—এমন ধারণাও ভুল।
বিপদ তৈরি হতে পারে যখন কৃষি ব্যবহারের জন্য নির্ধারিত রাসায়নিকের অনুমোদিত ব্যবহারবিধি না মেনে তা ফলের ওপর প্রয়োগ করা হয়।
বিশেষজ্ঞদের মতে, কোনো রাসায়নিকের নিরাপত্তা নির্ভর করে তার ব্যবহারমাত্রা, প্রয়োগের স্থান, প্রয়োগের সময় এবং অবশিষ্টাংশের মাত্রার ওপর। খাদ্যে অনুমোদিত সীমার বেশি রাসায়নিক অবশিষ্টাংশ থাকলে তা খাদ্য নিরাপত্তার প্রশ্ন তৈরি করতে পারে।
ফলে অপরিপক্ব ফল সংগ্রহ করে অজানা ঘনত্বের রাসায়নিক দ্রবণে ডুবিয়ে দ্রুত পাকানো হলে বিষয়টি অবশ্যই পরীক্ষা করা দরকার। শুধু ফলের বাইরের রং দেখে নিরাপত্তা নিশ্চিত করা যায় না।
বাংলাদেশের নিরাপদ খাদ্য আইন, ২০১৩ খাদ্যে মানবস্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর বা বিষক্রিয়া সৃষ্টিকারী রাসায়নিক ব্যবহারে নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে। আইনের ২৩ ধারায় ক্যালসিয়াম কার্বাইড, ফরমালিনসহ বিভিন্ন ক্ষতিকর রাসায়নিক এবং কীটনাশক বা বালাইনাশক খাদ্যদ্রব্যে ব্যবহার বা মেশানোর বিরুদ্ধে বিধান রয়েছে।
আইনটি শুধু উৎপাদনের পর্যায়েই সীমাবদ্ধ নয়। খাদ্য উৎপাদন, মজুদ, সরবরাহ, বিপণন ও বিক্রয়ের বিভিন্ন পর্যায় নিরাপদ রাখার দায়িত্বও এর আওতায় পড়ে।
বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষও খাদ্য নিরাপত্তায় রাসায়নিক ঝুঁকি নিয়ন্ত্রণের ওপর গুরুত্ব দেয়। সংস্থাটি ভোক্তাদের ফল ও শাকসবজি নিরাপদ পানি দিয়ে ধুয়ে খাওয়ার পরামর্শ দিয়েছে।
দেশের বাজারে কলা, আম, পেঁপে, আনারসসহ বিভিন্ন ফল দ্রুত পাকানো নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে অভিযোগ রয়েছে। এসব অভিযোগের সবগুলো যে সত্য, তা পরীক্ষার তথ্য ছাড়া বলা যায় না।
তবে অভিযোগগুলোকে গুরুত্ব দিয়ে নিয়মিত নমুনা পরীক্ষা করা জরুরি।
কারণ একটি ফল বাইরে থেকে পাকা দেখালেই তার ভেতরের রাসায়নিক অবস্থা নিরাপদ—এমন নিশ্চয়তা নেই। আবার কেবল রং দেখে কোনো ফল রাসায়নিক দিয়ে পাকানো হয়েছে—এমন সিদ্ধান্তও দেওয়া যায় না।
এখানেই প্রয়োজন বাজারভিত্তিক বৈজ্ঞানিক পরীক্ষা।
কোন আড়ত থেকে নমুনা নেওয়া হলো, কোন ফল পরীক্ষা করা হলো, কী রাসায়নিক পাওয়া গেল, কত মাত্রায় পাওয়া গেল এবং তা অনুমোদিত সর্বোচ্চ অবশিষ্টাংশের সীমার মধ্যে আছে কি না—এসব তথ্য প্রকাশ করা দরকার।
ফল ব্যবসার পুরো দায় কৃষকের ওপর চাপানোও যুক্তিসংগত নয়।
অনেক কৃষক দ্রুত ফল বিক্রি করতে বাধ্য হন। উৎপাদন খরচ, ঋণ, বাজারদর এবং মধ্যস্বত্বভোগীদের চাপ তাদের সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করে।
অন্যদিকে ব্যবসায়ীরা যদি অপরিপক্ব ফলের জন্য বেশি দাম দেন, তাহলে কৃষকের আগেভাগে ফল সংগ্রহের প্রবণতা তৈরি হতে পারে।
এই ব্যবস্থায় কৃষক, আড়তদার, পাইকার ও খুচরা বিক্রেতা—প্রতিটি পর্যায়ের ভূমিকা আলাদাভাবে দেখতে হবে।
মাঝেমধ্যে বাজারে অভিযান চালিয়ে রাসায়নিক জব্দ বা জরিমানা করলেই সমস্যার স্থায়ী সমাধান হবে না।
প্রথম প্রয়োজন ফলের সরবরাহব্যবস্থায় ট্রেসেবিলিটি তৈরি করা। কোন বাগান থেকে ফল এসেছে, কখন সংগ্রহ করা হয়েছে, কোন আড়তে গেছে এবং কোন ব্যবসায়ী তা বাজারজাত করছেন—এসব তথ্য সংরক্ষণ করা গেলে দায় নির্ধারণ সহজ হবে।
দ্বিতীয়ত, ঝুঁকিপূর্ণ বাজার ও আড়তে নিয়মিত নমুনা পরীক্ষা করতে হবে।
তৃতীয়ত, পরীক্ষার ফল জনসমক্ষে প্রকাশ করা দরকার।
চতুর্থত, কৃষকদের অনুমোদিত কৃষি উপকরণ ব্যবহারের প্রশিক্ষণ দিতে হবে। একই সঙ্গে ব্যবসায়ীদের জানাতে হবে, অনুমোদিত রাসায়নিকও অনুমোদিত মাত্রা ও পদ্ধতির বাইরে ব্যবহার করা যাবে না।
ভোক্তার জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো আতঙ্ক নয়, সচেতনতা।
ফল কেনার পর পরিষ্কার প্রবাহমান পানিতে ভালোভাবে ধুয়ে নিতে হবে। বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষও ফল ও শাকসবজি নিরাপদ পানি দিয়ে ধোয়ার পরামর্শ দেয়।
তবে ধোয়া সব ধরনের রাসায়নিক অবশিষ্টাংশ দূর করবে—এমন নিশ্চয়তা নেই। তাই নিরাপদ খাদ্যের মূল দায়িত্ব কেবল ভোক্তার ওপর চাপিয়ে দেওয়াও ঠিক নয়।
খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করার প্রধান দায়িত্ব উৎপাদন থেকে বাজারজাতকরণ পর্যন্ত পুরো ব্যবস্থার।
ফল মানুষের পুষ্টির উৎস। সেটিকে ভয় পাওয়ার বিষয় বানানো নয়, বরং নিরাপদ রাখা রাষ্ট্র, ব্যবসায়ী, কৃষক ও ভোক্তা—সবার দায়িত্ব।
সবচেয়ে বড় প্রয়োজন তাই গুজব নয়, পরীক্ষা।
কোন ফল নিরাপদ, কোনটি ঝুঁকিপূর্ণ এবং কোথায় অনিয়ম হচ্ছে—এর উত্তর দিতে হবে ল্যাবরেটরি পরীক্ষার তথ্য দিয়ে। তাহলেই ফলের বাজারে ‘নীরব ঘাতক’-এর গল্পের বদলে বাস্তব ঝুঁকি চিহ্নিত করা সম্ভব হবে।