সংগ্রামের পথ পেরিয়ে বঙ্গভবনে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর

দীর্ঘ রাজনৈতিক পথপরিক্রমার পর রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ সাংবিধানিক পদে আসীন হলেন বিএনপির প্রবীণ নেতা মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। বৃহস্পতিবার (২০শে  আগস্ট) জাতীয় সংসদে অনুষ্ঠিত রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে তিনি ২৫৫ ভোট পেয়ে নির্বাচিত হয়েছেন। তাঁর একমাত্র প্রতিদ্বন্দ্বী লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টির (এলডিপি) চেয়ারম্যান কর্নেল (অব.) অলি আহমদ পেয়েছেন ৮৮ ভোট।

এই নির্বাচনের মধ্য দিয়ে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর দেশের ২৩তম রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হয়েছেন। একই সঙ্গে ১৯৯১ সালের পর প্রথমবারের মতো প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ রাষ্ট্রপতি নির্বাচন দেখল বাংলাদেশ। ৩৪৯ জন সংসদ সদস্য ভোট দেওয়ার অধিকারী ছিলেন। তাঁদের মধ্যে ৩৪৩ জন ভোট দেন। ছয়টি ভোট পড়েনি। ব্যবহৃত সব ৩৪৩টি ব্যালটই বৈধ ছিল।

প্রধান নির্বাচন কমিশনার ও রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের নির্বাচনী কর্মকর্তা এ এম এম নাসির উদ্দিন ভোট গণনা শেষে ফল ঘোষণা করেন। নির্বাচন কমিশন পরে প্রজ্ঞাপন জারি করে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরকে রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হওয়ার বিষয়টি আনুষ্ঠানিকভাবে জানায়।

বাংলাদেশে সংসদীয় ব্যবস্থা পুনঃপ্রতিষ্ঠার পর রাষ্ট্রপতি নির্বাচন সাধারণত একক প্রার্থীর মধ্যেই সীমাবদ্ধ থেকেছে। এবার সেই ধারায় পরিবর্তন এসেছে। মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের বিপরীতে প্রার্থী হন কর্নেল (অব.) অলি আহমদ। তিনি জামায়াতে ইসলামী নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় জোটের প্রার্থী ছিলেন।

রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের ফল ঘোষণার পর প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান মির্জা ফখরুলকে ফুল দিয়ে অভিনন্দন জানান।

মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের রাজনৈতিক জীবন দীর্ঘ। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের ছাত্র থাকাকালে তিনি ছাত্ররাজনীতিতে যুক্ত হন। স্বাধীনতার পর তিনি শিক্ষকতা পেশায় যোগ দেন। পরে আবার সক্রিয় রাজনীতিতে ফিরে আসেন।

১৯৮৮ সালে তিনি ঠাকুরগাঁও পৌরসভার চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন। ১৯৯০-এর দশকের শুরুতে বিএনপিতে যোগ দেন। ১৯৯২ সালে তিনি ঠাকুরগাঁও জেলা বিএনপির সভাপতি হন। ২০০১ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ঠাকুরগাঁও-১ আসন থেকে বিএনপির প্রার্থী হিসেবে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। পরে কৃষি এবং বেসামরিক বিমান চলাচল ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন।

বিএনপির জাতীয় রাজনীতিতে তাঁর উত্থান আরও স্পষ্ট হয় ২০০৯ সালের কাউন্সিলে। ওই কাউন্সিলে তিনি দলের সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব হন। ২০১১ সালে তাঁকে ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব করা হয়। ২০১৬ সালের মার্চে তিনি বিএনপির মহাসচিব নির্বাচিত হন।

এরপর প্রায় এক দশক তিনি দলটির মহাসচিবের দায়িত্ব পালন করেন। বিশেষ করে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ সরকারের দীর্ঘ শাসনামলে বিএনপির আন্দোলন ও রাজনৈতিক কর্মসূচিতে তিনি ছিলেন দলের অন্যতম প্রধান মুখ। তাঁর রাজনৈতিক জীবনে গ্রেপ্তার, মামলা ও কারাবাসও এসেছে। ২০১৬ সালে মহাসচিব হওয়ার দিনই তিনি রাজনৈতিক মামলায় কারাগারে গিয়েছিলেন।

২০২৪ সালে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর বাংলাদেশের রাজনীতিতে বড় পরিবর্তন আসে। অন্তর্বর্তী সরকারের সময় পার করে ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারির জাতীয় নির্বাচনে বিএনপি ক্ষমতায় ফিরে আসে। দলটির নেতৃত্বে সরকার গঠিত হয়। তারেক রহমান প্রধানমন্ত্রী হন। মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর পান স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব।

রাষ্ট্রপতি পদে প্রার্থী হওয়ার আগে তিনি বিএনপির মহাসচিব এবং দলের জাতীয় স্থায়ী কমিটির সদস্য পদ থেকে সরে দাঁড়ান। তাঁর রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হওয়ার মধ্য দিয়ে বিএনপির দীর্ঘদিনের অন্যতম প্রধান সংগঠক এবার দলীয় রাজনীতির বাইরে রাষ্ট্রের সাংবিধানিক প্রধানের দায়িত্ব নিতে যাচ্ছেন।

বাংলাদেশের সংবিধান অনুযায়ী রাষ্ট্রপতি রাষ্ট্রের প্রধান। সংসদীয় ব্যবস্থায় নির্বাহী ক্ষমতার মূল দায়িত্ব প্রধানমন্ত্রী ও মন্ত্রিসভার হাতে থাকলেও রাষ্ট্রপতির সাংবিধানিক অবস্থান গুরুত্বপূর্ণ।

রাষ্ট্রপতি রাষ্ট্রের আনুষ্ঠানিক কার্যক্রম পরিচালনা করেন। একই সঙ্গে তিনি সশস্ত্র বাহিনীর সর্বাধিনায়ক। রাজনৈতিক বা সাংবিধানিক সংকটের সময় রাষ্ট্রপতির ভূমিকা আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।

মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের ক্ষেত্রে এই দায়িত্বের রাজনৈতিক তাৎপর্যও রয়েছে। দীর্ঘ সময় তিনি ছিলেন বিরোধী দলের শীর্ষ নেতা। এখন তাঁকেই রাষ্ট্রের নিরপেক্ষ সাংবিধানিক প্রধানের দায়িত্ব পালন করতে হবে। দলীয় রাজনীতির অভিজ্ঞতা এবং রাষ্ট্রপতির সাংবিধানিক দায়িত্বের মধ্যে ভারসাম্য রাখা হবে তাঁর অন্যতম বড় পরীক্ষা।

রাষ্ট্রপতি হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার আগে শুক্রবার (২১শে আগস্ট) বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমান ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার কবর জিয়ারত করেন মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। জুমার নামাজের পর তিনি শেরেবাংলা নগরের জিয়া উদ্যানে যান। সেখানে দুই নেতার কবরে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানান। ফাতেহা পাঠ করেন এবং দোয়া করেন।

শুক্রবার (২১শে আগস্ট) সন্ধ্যা সাড়ে সাতটায় বঙ্গভবনের দরবার হলে আয়োজিত অনুষ্ঠানে রাষ্ট্রপতি হিসেবে শপথ নিয়েছেন এই বর্ষীয়ান রাজনীতিবিদ। মির্জা ফখরুল ইসলামকে রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ সাংবিধানিক এই পদের শপথ পাঠ করিয়েছেন জাতীয় সংসদের ভারপ্রাপ্ত স্পিকার কায়সার কামাল।

রাষ্ট্রপতির শপথ অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান, মন্ত্রিসভার সদস্য, প্রধান বিচারপতি, কূটনীতিকসহ রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিরা উপস্থিত ছিলেন।

মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের রাষ্ট্রপতি নির্বাচন শুধু একটি সাংবিধানিক পদে পরিবর্তন নয়। এটি বাংলাদেশের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক রূপান্তরেরও একটি গুরুত্বপূর্ণ পর্ব।

একসময় যিনি রাজপথে বিরোধী দলের কর্মসূচিতে নেতৃত্ব দিয়েছেন, মামলা ও কারাবাস মোকাবিলা করেছেন, সেই রাজনীতিক এবার রাষ্ট্রের অভিভাবকসুলভ সাংবিধানিক দায়িত্ব নিতে যাচ্ছেন।

তবে রাষ্ট্রপতি হিসেবে তাঁর সাফল্য নির্ধারিত হবে রাজনৈতিক পরিচয়ের বাইরে গিয়ে সংবিধান, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান এবং নাগরিক স্বার্থের প্রতি তাঁর অবস্থানের মাধ্যমে। দলীয় রাজনীতির দীর্ঘ অভিজ্ঞতা তাঁর শক্তি। একই অভিজ্ঞতা নিরপেক্ষ সাংবিধানিক দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে কতটা দূরত্ব তৈরি করতে পারে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।

বাংলাদেশের নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতায় তাই মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের রাষ্ট্রপতিত্ব একটি প্রতীকী পরিবর্তনের পাশাপাশি একটি বাস্তব সাংবিধানিক পরীক্ষাও। তাঁর সামনে এখন দলীয় রাজনীতির পরিচয় পেছনে রেখে রাষ্ট্রের সব নাগরিকের রাষ্ট্রপতি হওয়ার চ্যালেঞ্জ।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *