অন্ধদের ‘দেখতে’ সাহায্য করছে মিশরীয় তরুণের এআই অ্যাপ

চার বছর আগেও মিশরের কায়রোর তরুণ মার্ক মোরাদ জানতেন না, তাঁর নিজের অন্ধত্বই একদিন তাঁকে এমন একটি প্রযুক্তি তৈরির পথে নিয়ে যাবে, যা বিশ্বের বিভিন্ন দেশের দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী মানুষের দৈনন্দিন জীবন সহজ করবে।

২০ বছর বয়সী মার্ক মোরাদ নিজে দৃষ্টিশক্তিহীন। তাঁর ১৬ বছর বয়সী বোন কারেন মোরাদও অন্ধ। কিন্তু মার্কের তৈরি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক অ্যাপ ScribeMe এখন দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী মানুষকে চারপাশের পৃথিবী সম্পর্কে তথ্য বুঝতে সাহায্য করছে।

সম্প্রতি কেনিয়ায় এক সাফারি ভ্রমণে কারেন অ্যাপটির এমন একটি অভিজ্ঞতা পান, যা তাঁর কাছে প্রায় ‘দেখতে পাওয়ার’ মতো অনুভূতি তৈরি করে। মেটা স্মার্ট গ্লাসের মাধ্যমে স্ক্রাইবমি তাঁকে আশপাশের প্রাণীদের অবস্থান, তারা কী করছে এবং কত দূরে রয়েছে—এসব বিষয়ে ধারাবাহিক বর্ণনা দেয়। ফলে কারেন নিজের কল্পনায় সাফারির দৃশ্যপট তৈরি করতে পারেন।

মার্কের দৃষ্টিশক্তি হারানোর শুরু ২০১৮ সালে। মিশর ও বিদেশে বিভিন্ন পরীক্ষা-নিরীক্ষার পরও তাঁর সমস্যার সুনির্দিষ্ট কোনো রোগ নির্ণয় করা যায়নি। চিকিৎসকেরা তাঁকে জানান, একটি বিরল ও নিরাময়-অযোগ্য অপটিক নার্ভের সমস্যার কারণে তিনি শেষ পর্যন্ত দৃষ্টিশক্তি হারাতে পারেন।

২০২১ সালের শেষ নাগাদ মার্ক ও কারেন—দুজনই সম্পূর্ণ দৃষ্টিশক্তি হারান। কারেনের দৃষ্টিশক্তি হারাতে প্রায় ছয় মাস সময় লাগে, আর মার্কের ক্ষেত্রে সময় লাগে প্রায় তিন বছর।

এরপর পরিবারের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জগুলোর একটি হয়ে দাঁড়ায় শিক্ষা। পদার্থবিজ্ঞান ও রসায়ন পড়ার সময় মার্ক দেখেন, প্রচলিত স্ক্রিন-রিডিং অ্যাপগুলো চার্ট, ডায়াগ্রাম ও সমীকরণের মতো বিষয় ব্যাখ্যা করতে গিয়ে কার্যত অকার্যকর হয়ে পড়ে।

তিনি একই ধরনের প্রযুক্তি নিয়ে কাজ করা বিদেশি অ্যাপ নির্মাতাদের কাছে সাহায্য চেয়েছিলেন। কিন্তু সাড়া পাননি।

শেষ পর্যন্ত নিজের সমস্যার সমাধান নিজেই করার সিদ্ধান্ত নেন মার্ক।

ইউটিউবের টিউটোরিয়াল দেখে মার্ক নিজে কোডিং শেখা শুরু করেন। ২০২৩ সালের মধ্যেই তিনি একটি কার্যকর অ্যাপ তৈরি করে ফেলেন।

শুরুতে অ্যাপটি মূলত নথি স্ক্যান করার কাজে ব্যবহৃত হলেও পরবর্তী সময়ে এটি অনেক বেশি উন্নত হয়। ২০২৪ সালে ভোডাফোন মিশর আয়োজিত  ভোডাফোন এআই এসিস্টিভ টুলস হ্যাকাথন -এ স্বীকৃতি পাওয়ার পর মার্ক একজন কো-ফাউন্ডার পান এবং স্ক্রাইবমি -এর সক্ষমতা আরও বাড়তে থাকে।

বর্তমানে অ্যাপটি ফোনের ক্যামেরার মাধ্যমে ব্যবহারকারীর বিভিন্ন প্রশ্নের রিয়েল-টাইম উত্তর দিতে পারে এবং আশপাশের পরিবেশ সম্পর্কে তথ্য দিতে পারে।

স্ক্রাইবমি-এর অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো এর ভাষা সমর্থন। অ্যাপটি ২০টি ভাষায় কাজ করে, যার মধ্যে আরবিও রয়েছে।

মার্কের মতে, অন্যান্য অনেক প্রযুক্তিতে আরবি ভাষার সুবিধা না থাকায় তিনি এই জায়গাটিকে বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছেন।

অ্যাপটি আইফোন বা অ্যান্ড্রয়েড ফোনে ব্যবহার করা যায়। পাশাপাশি মেটা-এর স্মার্ট গ্লাসের সঙ্গেও এটি ইন্টিগ্রেট করা হয়েছে। এর ফলে ব্যবহারকারীর হাতে ফোন ধরে রাখার প্রয়োজন হয় না—হাঁটার সময় ছড়ি ব্যবহারসহ অন্যান্য কাজের জন্য দুই হাতই মুক্ত রাখা যায়।

স্ক্রাইবমি বিনামূল্যে ডাউনলোড করা যায়। তবে অতিরিক্ত সুবিধার জন্য মাসিক ২০ ডলার অথবা বার্ষিক ২০০ ডলারের সাবস্ক্রিপশন রয়েছে।

মার্কের উদ্ভাবন এখন আর শুধু তাঁর নিজের পরিবারের প্রয়োজনের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। রয়টার্স-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, স্ক্রাইবমি বর্তমানে ১৪০টি দেশের হাজারো ব্যবহারকারীকে সেবা দিচ্ছে।

কারেন নিজেও দৈনন্দিন জীবনে অ্যাপটি ব্যবহার করেন। শ্রেণিকক্ষ খুঁজে পাওয়া, দোকান শনাক্ত করা, পোশাক নির্বাচন এমনকি পড়াশোনার ক্ষেত্রেও এটি তাঁকে সহায়তা করে।

কেনিয়ার সাফারি ভ্রমণের অভিজ্ঞতা অবশ্য এই প্রযুক্তির সম্ভাবনাকে আরও স্পষ্ট করে দিয়েছে। নিজের চারপাশের প্রাণী ও পরিবেশ সম্পর্কে ধারাবাহিক তথ্য শুনতে শুনতে কারেনের মনে হয়েছে, তিনি যেন দৃশ্যগুলো দেখতে পাচ্ছেন।

মার্ক মোরাদের গল্প কেবল একটি এআই অ্যাপ তৈরির গল্প নয়। নিজের জীবনের একটি গভীর সীমাবদ্ধতা থেকে তিনি এমন একটি প্রযুক্তির ধারণা তৈরি করেছেন, যা একই ধরনের সমস্যায় থাকা অন্য মানুষদের আরও স্বাধীনভাবে চলতে ও দৈনন্দিন কাজ করতে সাহায্য করছে।

মার্কের বাবা মোরাদ সেদকির কাছে চার বছর আগের বাস্তবতা আর আজকের পরিস্থিতির মধ্যে পার্থক্যটা যেন অবিশ্বাস্য। তিনি বলেন, তখন কেউ যদি তাঁকে বলত তাঁর ছেলে ও মেয়ে একদিন এমন অবস্থানে পৌঁছাবে, তিনি হয়তো তা বিশ্বাসই করতেন না।

তাঁর ভাষায়, স্বপ্ন বড় হতে থাকে। আর এই পরিবার এখন আর কোনো কিছুকেই অসম্ভব বলে ধরে নিতে চায় না।

মার্কের তৈরি স্ক্রাইবমি দেখিয়ে দিচ্ছে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা শুধু উৎপাদনশীলতা বা ব্যবসার প্রযুক্তি নয়—সঠিকভাবে ব্যবহার করা গেলে এটি মানুষের সীমাবদ্ধতা কমিয়ে আরও স্বাধীন ও অন্তর্ভুক্তিমূলক জীবন তৈরির হাতিয়ারও হতে পারে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *