ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে চালু এআই ‘অটো ফাইন’, আইন ভাঙলেই যাবে মামলা

ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই প্রযুক্তিনির্ভর ‘অটো ফাইন সিস্টেম’ চালু করেছে হাইওয়ে পুলিশ। এর ফলে মহাসড়কে ট্রাফিক আইন লঙ্ঘনের ঘটনা ক্যামেরায় শনাক্ত হওয়ার পর স্বয়ংক্রিয়ভাবে মামলা প্রক্রিয়া শুরু হবে। একই সঙ্গে সংশ্লিষ্ট গাড়ির নিবন্ধিত মালিকের মোবাইল নম্বরে পাঠানো হবে মামলার তথ্য।

মঙ্গলবার (১৮ই  আগস্ট) নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁয়ের মেঘনাঘাটে হাইওয়ে পুলিশের ‘কমান্ড, কন্ট্রোল অ্যান্ড মনিটরিং সেন্টারে’ আয়োজিত অনুষ্ঠানে এ ব্যবস্থার উদ্বোধন করা হয়। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ প্রধান অতিথি হিসেবে এর উদ্বোধন করেন।

অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন হাইওয়ে পুলিশের অতিরিক্ত আইজি ফারুক আহমেদ। বিশেষ অতিথি ছিলেন বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন শ্রমিক ফেডারেশনের সভাপতি ও সংসদ সদস্য শামছুর রহমান শিমুল বিশ্বাস, নারায়ণগঞ্জ-৩ আসনের সংসদ সদস্য আজহারুল ইসলাম মান্নান এবং আইজিপি মো. আলী হোসেন ফকির।

হাইওয়ে পুলিশের নতুন ব্যবস্থাটি মূলত এআই ক্যামেরা, স্বয়ংক্রিয় নম্বর প্লেট শনাক্তকরণ এবং বিআরটিএর তথ্যভান্ডারের সমন্বয়ে কাজ করবে।

কোনো যানবাহন ট্রাফিক আইন ভাঙলে ক্যামেরা প্রথমে ঘটনাটি শনাক্ত ও রেকর্ড করবে। এরপর সংশ্লিষ্ট গাড়ির নম্বর প্লেট শনাক্ত করা হবে। আইন লঙ্ঘনের তথ্য বিআরটিএর ডেটাবেজে থাকা গাড়ির নিবন্ধন তথ্যের সঙ্গে মিলিয়ে দেখা হবে।

এরপর নিবন্ধিত মালিকের মোবাইল নম্বরে এসএমএস পাঠানো হবে। এতে মামলার বিবরণ ও জরিমানার তথ্য জানানো হবে।

জরিমানার অর্থ পরিশোধের জন্য আদালত বা পুলিশের কার্যালয়ে যাওয়ার প্রয়োজন হবে না। মালিক তাঁর সুবিধামতো মোবাইল ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিস ব্যবহার করে অর্থ পরিশোধ করতে পারবেন।

বারবার ট্রাফিক আইন লঙ্ঘনের ক্ষেত্রে আরও কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ থাকবে। হাইওয়ে পুলিশ জানিয়েছে, বিআরটিএর বিধি অনুযায়ী প্রয়োজন হলে সংশ্লিষ্ট গাড়ির নিবন্ধন বাতিলের মতো প্রশাসনিক ও আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হতে পারে।

ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের প্রায় ২৫০ কিলোমিটার অংশকে প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারির আওতায় আনার উদ্যোগ কয়েক বছর আগে নেওয়া হয়। নারায়ণগঞ্জের সাইনবোর্ড থেকে চট্টগ্রামের সিটি গেট পর্যন্ত ৪৯০টি স্থানে ক্যামেরা স্থাপনের তথ্য আগে থেকেই প্রকাশিত হয়েছে।

আগের প্রকল্পসংক্রান্ত তথ্যে বলা হয়েছিল, এসব পয়েন্টে বিভিন্ন ধরনের মোট ১ হাজার ৪২৭টি ক্যামেরা ব্যবহারের পরিকল্পনা রয়েছে। এর মধ্যে বুলেট, পিটিজেড ডোম, লং-ভিশন ও চেকপয়েন্ট ক্যামেরা রয়েছে।

ক্যামেরাগুলো শুধু ট্রাফিক আইন প্রয়োগের জন্য নয়। মহাসড়কের সার্বিক নিরাপত্তা ও অপরাধ নিয়ন্ত্রণেও এগুলো ব্যবহার করা হচ্ছে।

এআই প্রযুক্তির মাধ্যমে নির্ধারিত গতিসীমার বেশি গতিতে গাড়ি চালানো শনাক্ত করা যাবে। বিপজ্জনক ওভারটেকিং এবং উল্টোপথে গাড়ি চালানোর ঘটনাও শনাক্ত করা সম্ভব হবে।

এ ছাড়া ট্রাফিক সিগন্যাল ও সাইন অমান্য করা এবং অবৈধ পার্কিংয়ের মতো অপরাধ শনাক্ত করা যাবে।

আগের প্রকল্পসংক্রান্ত তথ্যে স্বয়ংক্রিয় নম্বর প্লেট শনাক্তকরণ, গাড়ির গতিপথ পর্যবেক্ষণ এবং হাইস্পিড ডিটেকশনের সক্ষমতার কথাও জানানো হয়েছিল।

এর ফলে কোনো গাড়ি ঘটনাস্থল থেকে চলে গেলেও ক্যামেরায় ধারণ করা তথ্য ব্যবহার করে সেটিকে শনাক্ত করা সম্ভব হবে।

এআই নজরদারি ব্যবস্থার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো মহাসড়কের ঘটনা রিয়েল টাইমে পর্যবেক্ষণের সুযোগ। বিভিন্ন পর্যায়ের মনিটরিং সেন্টারের মাধ্যমে ক্যামেরার ফুটেজ ও শনাক্ত করা ঘটনাগুলো পর্যবেক্ষণ করা হবে।

আগের প্রকল্পের তথ্যমতে, নারায়ণগঞ্জের মেঘনাঘাটে কেন্দ্রীয় কমান্ড ও কন্ট্রোল সেন্টার এবং একাধিক মনিটরিং সেন্টার স্থাপন করা হয়েছে। এর সঙ্গে রয়েছে ডেটা সেন্টার, ভিডিও ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম এবং অটোমেটিক নম্বর প্লেট রিকগনিশন ব্যবস্থা।

এই প্রযুক্তি দুর্ঘটনার কারণ অনুসন্ধানেও কাজে আসতে পারে। একই সঙ্গে অপরাধে ব্যবহৃত বা দুর্ঘটনায় জড়িত যানবাহন শনাক্ত করার সুযোগ তৈরি হবে।

বর্তমান ব্যবস্থার সবচেয়ে বড় পরিবর্তন হলো আইন প্রয়োগের প্রক্রিয়ায় প্রযুক্তির সরাসরি ব্যবহার। আগে কোনো ট্রাফিক আইন ভাঙার ঘটনা শনাক্ত করতে পুলিশের সদস্যের সরাসরি উপস্থিতি প্রয়োজন হতো। অটো ফাইন ব্যবস্থায় ক্যামেরাই প্রথম পর্যায়ে আইন লঙ্ঘনের তথ্য সংগ্রহ করবে।

এতে মামলা দেওয়ার ক্ষেত্রে ব্যক্তিনির্ভরতা কমানোর সুযোগ তৈরি হবে। একই সঙ্গে মহাসড়কের বিপুলসংখ্যক যানবাহনের ওপর সার্বক্ষণিক নজরদারিও সহজ হবে।

তবে এই ব্যবস্থার কার্যকারিতা নির্ভর করবে ক্যামেরার তথ্যের নির্ভুলতা, বিআরটিএর ডেটাবেজের হালনাগাদ অবস্থা এবং ভুল শনাক্তকরণের ক্ষেত্রে আপিল বা সংশোধনের কার্যকর ব্যবস্থার ওপর।

এর আগে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের এআই ক্যামেরা প্রকল্প নিয়ে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, ক্যামেরার মাধ্যমে অপরাধ ও দুর্ঘটনার তথ্য সংগ্রহের পাশাপাশি স্বয়ংক্রিয়ভাবে মামলা দেওয়ার জন্য বিআরটিএর সঙ্গে সংযোগ স্থাপনের বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ ছিল।

অটো ফাইন সিস্টেম চালুর ফলে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে ট্রাফিক আইন প্রয়োগের ধরন বদলে যেতে পারে। চালক ঘটনাস্থলে পুলিশের সদস্য না দেখলেও আইন ভাঙলে পার পাওয়ার সুযোগ কমবে।

বিশেষ করে অতিরিক্ত গতি, বিপজ্জনক ওভারটেকিং ও উল্টোপথে গাড়ি চালানোর মতো ঝুঁকিপূর্ণ আচরণ নিয়ন্ত্রণে প্রযুক্তিটি কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে।

তবে শুধু জরিমানা আদায় নয়, এ ব্যবস্থার মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত দুর্ঘটনা কমানো এবং মহাসড়কে নিরাপদ চলাচল নিশ্চিত করা। সে জন্য পরিবহন মালিক, চালক, শ্রমিক সংগঠন এবং সাধারণ যাত্রীদেরও নতুন ব্যবস্থার সঙ্গে মানিয়ে চলতে হবে।

হাইওয়ে পুলিশও পরিবহন মালিক-শ্রমিক ফেডারেশন এবং সাধারণ মানুষকে এ উদ্যোগ সফল করতে সহযোগিতার আহ্বান জানিয়েছে।

ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে এআইভিত্তিক নজরদারির পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়ন হলে এটি দেশের সড়ক ব্যবস্থাপনায় একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনের সূচনা করতে পারে। আইন প্রয়োগের ক্ষেত্রে প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানোর পাশাপাশি চালকদের আচরণেও এর প্রভাব পড়বে। তবে প্রযুক্তির পাশাপাশি স্বচ্ছতা, নির্ভুলতা এবং জবাবদিহি নিশ্চিত করাই হবে এই ব্যবস্থার দীর্ঘমেয়াদি সাফল্যের প্রধান পরীক্ষা।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *