জাতিসংঘের রিপোর্টে বাংলাদেশ: ‘আল-কায়েদা সেল গড়ার চেষ্টা’—আসলে কী বলা হয়েছে

বাংলাদেশে আল-কায়েদার ভারতীয় উপমহাদেশীয় শাখা—আল-কায়েদা ইন দ্য ইন্ডিয়ান সাবকন্টিনেন্ট বা একিউআইএস —সেল গঠনের চেষ্টা করছে বলে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদ কোনো সিদ্ধান্ত নেয়নি। এমন কোনো রেজুলেশনও পাস হয়নি।

তবে বিষয়টি একেবারে ভিত্তিহীনও নয়। ১০ই  আগস্ট ২০২৬ প্রকাশিত জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের ১২৬৭/১৯৮৯/২২৫৩ স্যাঙ্কশনস কমিটিকে সহায়তাকারী এনালিটিক্যাল সাপোর্ট এন্ড স্যাংঙ্কশন মনিটরিং টিম (এএসএমটি)-এর ৩৮তম প্রতিবেদনে বাংলাদেশকে ঘিরে একিউআইএস-এর সম্ভাব্য তৎপরতা নিয়ে উদ্বেগের কথা এসেছে। জাতিসংঘের নিজস্ব ওয়েবসাইটে প্রতিবেদনটির নথি নম্বর S/2026/651 এবং প্রকাশের তারিখ ১০ই  আগস্ট ২০২৬ হিসেবে উল্লেখ রয়েছে।

এখানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—মনিটরিং টিম -এর পর্যবেক্ষণ আর নিরাপত্তা পরিষদের আনুষ্ঠানিক সিদ্ধান্ত এক জিনিস নয়।

S/2026/651 হলো ১২৬৭/১৯৮৯/২২৫৩ স্যাঙ্কশনস কমিটির সহায়ক মনিটরিং টিম-এর ৩৮তম প্রতিবেদন। জাতিসংঘের তালিকায় এর আগের প্রতিবেদনটি ছিল S/2026/44, যা ৪ঠা ফেব্রুয়ারি ২০২৬-এ ৩৭তম প্রতিবেদন হিসেবে প্রকাশিত হয়।

মনিটরিং টিম মূলত আল-কায়েদা, আইএসআইএল/দায়েশ এবং সংশ্লিষ্ট নেটওয়ার্কগুলোর হুমকি, সদস্যরাষ্ট্রগুলোর দেওয়া তথ্য এবং জাতিসংঘের নিষেধাজ্ঞা ব্যবস্থার বাস্তবায়ন নিয়ে বিশ্লেষণ করে।

তাই প্রতিবেদনে কোনো দেশের নাম থাকা মানেই ওই দেশের বিরুদ্ধে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের সিদ্ধান্ত হয়ে যাওয়া নয়।

জাতিসংঘের কাঠামোয় মনিটরিং টিম একটি বিশেষজ্ঞ সংস্থা, যা সংশ্লিষ্ট স্যাঙ্কশনস কমিটিকে বিশ্লেষণ ও সুপারিশ দিয়ে সহায়তা করে। কমিটি পরবর্তী সময়ে এসব সুপারিশ নিয়ে নিজের অবস্থান জানাতে পারে।

জাতিসংঘের ওয়েবসাইটে মনিটরিং টিম-এর প্রতিবেদন এবং পরবর্তী সময়ে ১২৬৭ কমিটির সুপারিশ-সংক্রান্ত অবস্থান আলাদা নথি হিসেবে প্রকাশিত হওয়ার নজির রয়েছে।

অতএব সংবাদে “জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদ বলেছে বাংলাদেশে আল-কায়েদার সেল গঠনের চেষ্টা চলছে”—এভাবে লিখলে বিষয়টি ভুল ভাবে উপস্থাপিত হবে।

বরং সঠিক ভাষা হবে—জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের ১২৬৭ স্যাঙ্কশনস কমিটিকে সহায়তাকারী মনিটরিং টিম-এর প্রতিবেদনে একিউআইএস -এর বাংলাদেশকে ব্যবহার করে সেল গঠনের সম্ভাবনা নিয়ে উদ্বেগের কথা এসেছে।

বাংলাদেশ নিয়ে আলোচিত অংশটির মূল তাৎপর্য হলো, একিউআইএস বাংলাদেশকে ব্যবহার করে সেখানে সাংগঠনিক সেল বা নেটওয়ার্ক তৈরির চেষ্টা করতে পারে—এমন একটি নিরাপত্তা মূল্যায়ন প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।

এখানে ভাষার মাত্রা গুরুত্বপূর্ণ।

নিরাপত্তা ও গোয়েন্দা মূল্যায়নে “may”, “could”, “concern”, “reported” বা “according to a Member State”—এ ধরনের শব্দের আলাদা অর্থ রয়েছে।

“May” সম্ভাবনা বোঝায়। এটি কোনো কর্মকাণ্ড নিশ্চিতভাবে ঘটছে—এমন বক্তব্য নয়।

একইভাবে কোনো বিষয়ে “concern” প্রকাশ করা মানেই সেই বিষয়ে চূড়ান্ত প্রমাণ পাওয়া গেছে—এমনও নয়।

সুতরাং “বাংলাদেশে আল-কায়েদার সেল গড়ে উঠেছে” এবং “বাংলাদেশকে ব্যবহার করে আল-কায়েদার সেল গঠনের চেষ্টা হতে পারে—এ নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে”—এই দুই বক্তব্যকে এক করে দেখা ঠিক হবে না।

সাংবাদিকতার ভাষায় এই পার্থক্যটিই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।

এই জায়গায় আরেকটি বিষয় সামনে আসে—মনিটরিং টিম এবং ভারতের নিয়মিত যোগাযোগ।

ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সরকারি তথ্য অনুযায়ী, ২০২২ সালের ৮ থেকে ১০ মার্চ মনিটরিং টিম-এর একটি প্রতিনিধিদল ভারত সফর করে। সফরটি ছিল ভারত সরকারের আমন্ত্রণে এবং সংশ্লিষ্ট সদস্যরাষ্ট্রগুলোর সঙ্গে মনিটরিং টিম-এর নিয়মিত পরামর্শের অংশ। প্রতিনিধিদলটি ভারতের বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করে এবং দক্ষিণ এশিয়ায় সন্ত্রাসবাদসহ বিভিন্ন নিরাপত্তা বিষয়ে ভারতের অগ্রাধিকার ও উদ্বেগ সম্পর্কে অবহিত হয়।

ভারতের সরকারি বিবরণে বলা হয়, বৈঠকে সন্ত্রাসবাদের জন্য নতুন ও উদীয়মান প্রযুক্তি ও ড্রোন ব্যবহারের হুমকি, সন্ত্রাসবাদ ও সংগঠিত অপরাধের যোগসূত্র এবং সন্ত্রাসে অর্থায়নের বিভিন্ন পদ্ধতি নিয়েও আলোচনা হয়েছিল।

২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে ৩৭তম মনিটরিং টিম-এর প্রতিবেদন নিয়ে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রণধীর জয়সওয়ালও বলেন, ওই প্রতিবেদনে সন্ত্রাসবাদ ও সীমান্তপারের সন্ত্রাস নিয়ে ভারতের দেওয়া ইনপুট বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে।

এই তথ্যগুলো গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু এখান থেকে সরাসরি বলা যাবে না যে বাংলাদেশ-সংক্রান্ত এএসএমটি-এর মূল্যায়ন ভারতের তৈরি বা ভারতের নির্দেশিত।

কারণ সদস্যরাষ্ট্রের কাছ থেকে তথ্য নেওয়া এবং সেই তথ্যের ভিত্তিতে মনিটরিং টিম-এর নিজস্ব মূল্যায়ন তৈরি করা—দুটি আলাদা বিষয়।

ভারত মনিটরিং টিম-কে তথ্য দিয়েছে—এটি যাচাইযোগ্য।

কিন্তু বাংলাদেশ-সংক্রান্ত নির্দিষ্ট মূল্যায়নের প্রতিটি তথ্য ভারতের দেওয়া এবং তা স্বাধীনভাবে যাচাই করা হয়নি—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে হলে প্রতিবেদনের তথ্যের উৎস ও যাচাই প্রক্রিয়া আরও বিস্তারিতভাবে জানা প্রয়োজন।

রিপোর্টের আলোচনায় দিল্লির রেড ফোর্ট এলাকায় ২০২৫ সালের বিস্ফোরণের প্রসঙ্গও এসেছে।

এ বিষয়ে সংবাদ পরিবেশনের ক্ষেত্রে এট্রিবিউশন বা তথ্যের উৎস উল্লেখ করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

এর আগে ৩৭তম মনিটরিং টিম-এর প্রতিবেদনে ভারতের দেওয়া তথ্যের প্রসঙ্গও ছিল। ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় পরে প্রকাশ্যেই বলেছিল, প্রতিবেদনে সীমান্তপারের সন্ত্রাস নিয়ে ভারতের দেওয়া তথ্য ও উদ্বেগ বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে।

অন্যদিকে ভারতের জাতীয় তদন্ত সংস্থা এনআইএ ২০২৬ সালের মে মাসে রেড ফোর্ট বিস্ফোরণ মামলায় আদালতে যে চার্জশিট দাখিল করেছে, সেখানে হামলাটির সঙ্গে একিউআইএস-সংশ্লিষ্ট আনসার গাজওয়াত উল হিন্দ -এর যোগসূত্রের কথা বলা হয়েছে। অর্থাৎ এই ঘটনাটির আলাদা একটি ভারতীয় তদন্ত-ভিত্তিক প্রেক্ষাপটও রয়েছে।

তবে কোনো দেশের তদন্ত সংস্থার দাবি এবং জাতিসংঘ মনিটরিং টিম-এর মূল্যায়ন—দুটিকেও একই প্রমাণমূল্য দিয়ে উপস্থাপন করা উচিত নয়।

রিপোর্ট মানেই কি বাংলাদেশের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা?

না।

কোনো মনিটরিং টিম-এর প্রতিবেদনে বাংলাদেশের নাম আসা মানেই বাংলাদেশের বিরুদ্ধে জাতিসংঘের নিষেধাজ্ঞা জারি হওয়া নয়।

১২৬৭/১৯৮৯/২২৫৩ ব্যবস্থার আওতায় নিষেধাজ্ঞা আরোপের বিষয়টি সংশ্লিষ্ট স্যাঙ্কশনস কমিটির প্রাতিষ্ঠানিক প্রক্রিয়ার সঙ্গে যুক্ত। মনিটরিং টিম-এর কাজ হলো কমিটিকে বিশ্লেষণ ও সুপারিশ দিয়ে সহায়তা করা।

জাতিসংঘের নথিপত্রে মনিটরিং টিম-এর প্রতিবেদন এবং কমিটির পরবর্তী অবস্থান আলাদা পর্যায়ে প্রকাশিত হওয়ার বিষয়টি স্পষ্ট।

তাই এই প্রতিবেদনকে বাংলাদেশের বিরুদ্ধে নতুন কোনো নিষেধাজ্ঞা, বাংলাদেশকে সন্ত্রাসবাদের পৃষ্ঠপোষক রাষ্ট্র হিসেবে চিহ্নিত করা বা বাংলাদেশে আল-কায়েদার সক্রিয় সেল থাকার চূড়ান্ত প্রমাণ হিসেবে দেখার সুযোগ নেই।

তবে উদ্বেগকে উড়িয়ে দেওয়াও ঠিক নয়

এখানে আবার উল্টো ভুল করার সুযোগও রয়েছে।

জাতিসংঘের মনিটরিং টিম কোনো সম্ভাব্য হুমকির কথা বলেছে বলেই সেটিকে মিথ্যা বলে উড়িয়ে দেওয়া যেমন ঠিক হবে না, তেমনি সেটিকে চূড়ান্ত সত্য হিসেবে প্রচার করাও ঠিক নয়।

একিউআইএস-এর বাংলাদেশ-সংক্রান্ত আগ্রহ নতুন কোনো বিষয় নয়। যুক্তরাষ্ট্রের সন্ত্রাসবাদবিষয়ক রিপোর্টগুলোতে একিউআইএস-এর কার্যক্রমের ভৌগোলিক পরিসরের মধ্যে বাংলাদেশকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে এবং বাংলাদেশে বিভিন্ন হত্যাকাণ্ডের দায় একিউআইএস দাবি করেছিল বলে উল্লেখ করা হয়েছে।

আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসবাদবিষয়ক গবেষণাতেও বাংলাদেশে একিউআইএস-সংশ্লিষ্ট নেটওয়ার্ক ও স্থানীয় উগ্রপন্থী সংগঠনগুলোর সম্পর্ক নিয়ে আলোচনা রয়েছে। কমব্যাটিং টেররিজম সেন্টার-এর একটি গবেষণায় ২০১৯ সালে বাংলাদেশে একিউআইএস-এর সাংগঠনিক তৎপরতা পুনরুজ্জীবিত করার চেষ্টা এবং স্থানীয় নেটওয়ার্ক ব্যবহার করে সংগঠিত হওয়ার প্রচেষ্টার কথা উল্লেখ করা হয়েছিল।

অতএব বাংলাদেশের জন্য বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে দেখা প্রয়োজন। কিন্তু গুরুত্ব দেওয়া এবং আতঙ্ক ছড়ানো এক বিষয় নয়।

বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে কার্যকর অবস্থান হতে পারে—অস্বীকার নয়, যাচাই।

প্রথমত, মনিটরিং টিম-এর প্রতিবেদনে বাংলাদেশ নিয়ে যে মূল্যায়ন করা হয়েছে, তার ভিত্তি সম্পর্কে কূটনৈতিক পর্যায়ে ব্যাখ্যা চাওয়া যেতে পারে।

দ্বিতীয়ত, বাংলাদেশের নিজস্ব আইনশৃঙ্খলা ও গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর মাধ্যমে বিষয়টি স্বাধীনভাবে যাচাই করা প্রয়োজন।

প্রশ্ন হওয়া উচিত:

  • একিউআইএস বাংলাদেশকে ব্যবহার করে সাংগঠনিক সেল গঠনের চেষ্টা করছে—এমন কোনো নির্দিষ্ট তথ্য কি বাংলাদেশের কাছে আছে?
  • দেশে একিউআইএস-এর সক্রিয় নেটওয়ার্ক আছে কি?
  • থাকলে সেটি সাংগঠনিকভাবে কতটা কার্যকর?
  • কোনো স্থানীয় সংগঠন বা ব্যক্তির সঙ্গে একিউআইএস-এর বর্তমান যোগাযোগ রয়েছে কি?
  • প্রতিবেদনে বাংলাদেশের বিষয়ে কোন ধরনের তথ্য ব্যবহার করা হয়েছে?
  • এসব তথ্যের উৎস কী এবং কীভাবে যাচাই করা হয়েছে?

এসব প্রশ্নের উত্তর ছাড়া শুধু রাজনৈতিক বক্তব্যের ভিত্তিতে বিষয়টির সত্যতা নির্ধারণ করা উচিত নয়।

একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক কোনো প্রতিবেদনের বক্তব্যকে ইচ্ছাকৃতভাবে বাড়িয়ে দেশের বিরুদ্ধে প্রচারণার হাতিয়ার বানানোও উচিত নয়।

কারণ সন্ত্রাসবাদ বাংলাদেশের জন্য বাস্তব নিরাপত্তা ঝুঁকি। এই ঝুঁকি নিয়ে অতিরঞ্জিত প্রচার যেমন ক্ষতিকর, তেমনি রাজনৈতিক কারণে বাস্তব ঝুঁকি অস্বীকার করাও ক্ষতিকর।

জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদ বাংলাদেশে আল-কায়েদার সেল আছে বা সেল গঠনের চেষ্টা চলছে—এমন কোনো সিদ্ধান্ত বা রেজুলেশন পাস করেনি।

১০ই  আগস্ট ২০২৬ প্রকাশিত S/2026/651 হলো ১২৬৭/১৯৮৯/২২৫৩ স্যাঙ্কশনস কমিটিকে সহায়তাকারী এনালিটিক্যাল সাপোর্ট এন্ড স্যাংশনস মনিটরিং টিম-এর ৩৮তম প্রতিবেদন। জাতিসংঘের নিজস্ব ওয়েবসাইটে প্রতিবেদনটি এই পরিচয়েই তালিকাভুক্ত।

প্রতিবেদনে একিউআইএস-এর বাংলাদেশকে ব্যবহার করে সেল গঠনের সম্ভাবনা নিয়ে উদ্বেগের কথা এসেছে—এটিকে একটি সতর্কতামূলক নিরাপত্তা মূল্যায়ন হিসেবে দেখা বেশি সঠিক; নিরাপত্তা পরিষদের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হিসেবে নয়।

বাংলাদেশের জন্য তাই সবচেয়ে যুক্তিসংগত পথ হলো—বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করা।

সন্ত্রাসবাদ মোকাবিলায় দরকার সতর্কতা; আর সাংবাদিকতায় দরকার তার চেয়েও বেশি—প্রমাণ, এট্রিবিউশন এবং ভাষার নির্ভুলতা

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *