সংযুক্ত আরব আমিরাতে বাংলাদেশিদের ভিসা বাতিলের কারণ খুঁজছে সরকার

সংযুক্ত আরব আমিরাতে (ইউএই) সম্প্রতি উল্লেখযোগ্য সংখ্যক বাংলাদেশি প্রবাসীর ভিসা বাতিলের ঘটনায় উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে পর্যবেক্ষণ করছে প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়। তবে এখন পর্যন্ত ভিসা বাতিলের সুনির্দিষ্ট কারণ জানতে পারেনি সরকার।

প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী বলেছেন, ভিসা বাতিলের কারণ অনুসন্ধান করা হচ্ছে। প্রয়োজনীয় তথ্য সংগ্রহের পর এ বিষয়ে সরকারি উদ্যোগ নেওয়া হবে।

সোমবার (১৭ই আগস্ট) মন্ত্রণালয়ের সম্মেলন কক্ষে বাংলাদেশ সিআইপি বিজনেস অ্যাসোসিয়েশন, দুবাইয়ের একটি প্রতিনিধি দলের সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ ও মতবিনিময় সভায় এসব কথা বলেন তিনি।

মন্ত্রী জানান, সংযুক্ত আরব আমিরাতে বাংলাদেশ দূতাবাস ইতোমধ্যে গণবিজ্ঞপ্তি জারি করেছে। ভিসা বাতিল হওয়া বাংলাদেশিদের কাছ থেকে তথ্য সংগ্রহ করা হচ্ছে। এসব তথ্যের ভিত্তিতে বাতিল হওয়া ভিসাধারীদের একটি সমন্বিত ডেটাবেজ তৈরির কাজ চলছে।

২০২৪ সালের জুলাইয়ের পর থেকে সংযুক্ত আরব আমিরাতে বাংলাদেশিদের বিভিন্ন ধরনের ভিসা নিয়ে কড়াকড়ি ও স্থবিরতা চলছে বলে সভায় উল্লেখ করেন মন্ত্রী।

ফ্যামিলি, স্টুডেন্ট, ট্যুরিস্ট ও এমপ্লয়মেন্ট ভিসার ক্ষেত্রে নানা ধরনের বিধিনিষেধ রয়েছে। একই সঙ্গে এক কোম্পানি থেকে অন্য কোম্পানিতে ভিসা ট্রান্সফার নিয়েও জটিলতা তৈরি হয়েছে।

মন্ত্রণালয় এসব বিষয়ে অবগত রয়েছে বলে জানান আরিফুল হক চৌধুরী। তাঁর ভাষ্য, যৌথ কূটনৈতিক উদ্যোগ এবং সর্বোচ্চ সরকারি পর্যায়ের হস্তক্ষেপের মাধ্যমে সংকট দ্রুত সমাধানের চেষ্টা চলছে।

দুবাই সরকার ও স্থানীয় কর্তৃপক্ষের সঙ্গে বাংলাদেশি সিআইপি ও ব্যবসায়ীদের সুসম্পর্ক রয়েছে। এই সম্পর্ককে কাজে লাগিয়ে ভিসা জটিলতা নিরসনে সম্পূরক ভূমিকা রাখার আহ্বান জানান মন্ত্রী।

দেশে প্রবাসী বাংলাদেশিদের বিনিয়োগ বাড়াতে বিশেষ সুবিধা দেওয়ার কথাও জানান প্রবাসী কল্যাণমন্ত্রী।

তিনি বলেন, বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল ও হাই-টেক পার্কে প্রবাসী বিনিয়োগকারীদের জন্য জমি, প্লট বা অবকাঠামো বরাদ্দে বিশেষ কোটা দেওয়ার উদ্যোগ থাকবে। পাশাপাশি কর ছাড়ের সুবিধাও দেওয়া হবে।

বিনিয়োগের ক্ষেত্রে প্রশাসনিক জটিলতা কমানোর ওপরও গুরুত্ব দেন তিনি। বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (বিডা), কাস্টমস, জাতীয় রাজস্ব বোর্ডসহ সংশ্লিষ্ট সরকারি দপ্তরে ফাইলিং ও অন্যান্য প্রক্রিয়া সহজ করতে ‘ওয়ান-স্টপ সার্ভিস’-এর মাধ্যমে দ্রুত ও ডিজিটাল সেবা নিশ্চিত করার কথা জানান তিনি।

সংযুক্ত আরব আমিরাতের স্থানীয় আইন, প্রথা ও বিধিবিধান কঠোরভাবে মেনে চলতে সাধারণ প্রবাসীদের সচেতন করার আহ্বান জানিয়েছেন মন্ত্রী।

তিনি বলেন, সংবেদনশীল কোনো ঘটনা বা পরিস্থিতিতে ছবি ও ভিডিও ধারণের ক্ষেত্রে সতর্ক থাকতে হবে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সেগুলো প্রকাশের ক্ষেত্রেও দায়িত্বশীল হতে হবে।

এআই প্রযুক্তির অপব্যবহার করে নেতিবাচক প্রচারণা চালানো থেকেও বিরত থাকার আহ্বান জানান তিনি। অবৈধ কর্মকাণ্ড বা অপরাধমূলক আচরণে না জড়াতে প্রবাসীদের সচেতন করতে কনস্যুলেট ও মিশনের সঙ্গে যৌথভাবে প্রচারাভিযান পরিচালনার ওপর গুরুত্ব দেন মন্ত্রী।

রেমিট্যান্স প্রবাহ স্বাভাবিক রাখতে বৈধ ব্যাংকিং চ্যানেলে অর্থ পাঠানোর বিষয়ে প্রবাসীদের উৎসাহিত করার আহ্বান জানানো হয়।

মন্ত্রী বলেন, সিআইপি ব্যবসায়ীদের অধীনস্থ কর্মীদের হুন্ডি পরিহার করে বৈধ ব্যাংকিং চ্যানেলে দেশে অর্থ পাঠাতে উদ্বুদ্ধ করতে হবে।

তিনি জানান, অতি দ্রুত সর্বজনীন ও স্বচ্ছ ‘প্রবাসী কার্ড’ চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এই কার্ডের মাধ্যমে প্রবাসীরা দেশে সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতালে সাশ্রয়ী এবং অগ্রাধিকারভিত্তিক চিকিৎসা সুবিধা পাবেন।

বৈধ ব্যাংকিং চ্যানেলে দেশে অর্থ পাঠানোর ক্ষেত্রেও কার্ডটি ভূমিকা রাখবে বলে জানান তিনি।

প্রবাসীদের যাতায়াতের ক্ষেত্রে টিকিট সিন্ডিকেট ভাঙা এবং যৌক্তিক বিমান ভাড়া নিশ্চিত করার বিষয়েও সরকারের উদ্যোগের কথা তুলে ধরেন মন্ত্রী।

তিনি জানান, বেসামরিক বিমান পরিবহন মন্ত্রণালয় ও সংশ্লিষ্ট এয়ারলাইনগুলোর সঙ্গে এ বিষয়ে আলোচনা অব্যাহত রয়েছে।

মতবিনিময় সভায় বাংলাদেশ সিআইপি বিজনেস অ্যাসোসিয়েশন, দুবাইয়ের প্রতিনিধি দল বিভিন্ন দাবি ও প্রস্তাব তুলে ধরে।

এর মধ্যে রয়েছে সংযুক্ত আরব আমিরাতে বাংলাদেশিদের ভিসা চালুর জন্য সর্বোচ্চ পর্যায়ে উদ্যোগ নেওয়া। বিদেশগমনেচ্ছু কর্মীদের দক্ষতা ও মান উন্নয়নও তাদের দাবির মধ্যে ছিল।

এ ছাড়া প্রবাসী কার্ড চালু, সরকারি খরচে প্রবাসীদের মরদেহ দেশে আনা, দেশে প্রবাসীদের সাশ্রয়ী মূল্যে চিকিৎসা, প্রবাসী সন্তানদের শিক্ষার সুযোগ নিশ্চিত করা এবং কম মূল্যে বিমান টিকিটের ব্যবস্থা করার দাবি জানানো হয়।

প্রতিনিধি দলটি ড্রাই ফুড প্রসেসিং প্ল্যান্ট স্থাপন এবং বাংলাদেশে বিনিয়োগের মুনাফা বিদেশে প্রত্যাবাসনের সুযোগ দেওয়ার বিষয়েও প্রস্তাব দেয়।

সভায় মন্ত্রী সংযুক্ত আরব আমিরাতে বসবাসরত বাংলাদেশি সিআইপি, উদ্যোক্তা ও ব্যবসায়ীদের দেশের অর্থনীতিতে অবদানের প্রশংসা করেন। তিনি বলেন, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ শক্তিশালী করা, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং রেমিট্যান্স প্রবাহ সচল রাখতে প্রবাসী ব্যবসায়ী ও সিআইপিদের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে।

সভায় প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. মোখতার আহমেদ, জনশক্তি কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর (বিএমইটি) মহাপরিচালক জামিল আহমেদসহ মন্ত্রণালয়ের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *