বাংলাদেশের বন্য হাতির ভবিষ্যৎ ক্রমেই অনিশ্চিত হয়ে উঠছে। বন উজাড়, হাতির আবাসস্থল দখল ও ধ্বংস, অবৈধ শিকার এবং বন্যপ্রাণী অপরাধের পাশাপাশি মানুষের সঙ্গে হাতির সংঘাতও এখন এ প্রাণীটির টিকে থাকার বড় চ্যালেঞ্জ। আর এই সংকট মোকাবিলায় শুধু সরকারি উদ্যোগ নয়, স্থানীয় মানুষ থেকে শুরু করে গবেষক, বনকর্মী, তরুণ, শিক্ষার্থী ও বেসরকারি সংস্থাগুলোর সম্মিলিত অংশগ্রহণ প্রয়োজন বলে জানিয়েছেন পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তনমন্ত্রী আবদুল আউয়াল মিন্টু এমপি।
বুধবার (১২ই আগস্ট) রাজধানীর আগারগাঁওয়ে বন অধিদপ্তরের সম্মেলন কক্ষে বিশ্ব হাতি দিবস ২০২৬ উপলক্ষে আয়োজিত আলোচনা অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
এবারের বিশ্ব হাতি দিবসের আন্তর্জাতিক প্রতিপাদ্য “ব্রিংগিং দ্য ওয়ার্ল্ড টুগেদার টু হেল্প এলিফ্যান্টস”। বাংলায় এর ভাবার্থ—“বিশ্বজুড়ে ঐক্য গড়ি, হাতির জীবন রক্ষা করি।” হাতি ও তার আবাসস্থল রক্ষায় জনসচেতনতা বাড়ানো এবং প্রাণীটির নিরাপদ ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করাই দিবসটির মূল লক্ষ্য।
মন্ত্রী বলেন, একসময় বাংলাদেশে বন্য হাতির সংখ্যা তুলনামূলকভাবে বেশি থাকলেও বর্তমানে এ প্রাণীর সংখ্যা কমছে। বন ও হাতির বিচরণক্ষেত্র সংকুচিত হওয়ায় মানুষের সঙ্গে হাতির সংঘাতও বাড়ছে।
২০১৫ সালের জরিপ অনুযায়ী, দেশে স্থায়ীভাবে বসবাসকারী বন্য হাতি ছিল ২৬৮টি। এর বাইরে ছিল ৯৩টি পরিযায়ী বন্য হাতি এবং ৯৬টি পোষা হাতি। তবে এক দশক পর দেশের হাতির বর্তমান সংখ্যা জানতে ২০২৭ সালের মধ্যে নতুন করে হাতি জরিপের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
হাতির সংখ্যা কমে যাওয়ার পেছনে আবাসস্থল দখল ও ধ্বংস, বন উজাড়, অবৈধ শিকার এবং বন্যপ্রাণী অপরাধকে বড় হুমকি হিসেবে উল্লেখ করেন মন্ত্রী।
তিনি বলেন, হাতির আবাসস্থল রক্ষা করা মানে শুধু একটি প্রাণীকে রক্ষা করা নয়। এর সঙ্গে বন, জীববৈচিত্র্য ও পরিবেশের ভারসাম্য জড়িত। শেষ পর্যন্ত এর প্রভাব পড়ে মানুষের ভবিষ্যতের ওপরও।
বাংলাদেশে হাতি সংরক্ষণের জন্য সরকার বাংলাদেশ এলিফ্যান্টস কনজারভেশন একশন প্ল্যান (২০১৮–২০২৭) গ্রহণ করেছে। এতে হাতি সংরক্ষণে ৪০টি অগ্রাধিকার কার্যক্রম চিহ্নিত করা হয়েছে। বিভিন্ন প্রকল্পের মাধ্যমে এসব কার্যক্রম বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে জানান মন্ত্রী।
তবে কাগজে পরিকল্পনা থাকলেই হাতি রক্ষা সম্ভব নয়। এর বাস্তব প্রয়োগের সঙ্গে স্থানীয় মানুষের জীবন ও জীবিকার বিষয়টিও যুক্ত করতে হবে। কারণ দেশের যেসব এলাকায় হাতির বিচরণ রয়েছে, সেসব এলাকার মানুষই প্রায়ই হাতির সঙ্গে সরাসরি সংঘাতের মুখোমুখি হন।
হাতির আক্রমণে মানুষের মৃত্যু, আহত হওয়া কিংবা ঘরবাড়ি ও ফসলের ক্ষতির জন্য সরকার ক্ষতিপূরণ দিচ্ছে।
‘বন্যপ্রাণী দ্বারা আক্রান্ত জানমালের ক্ষতিপূরণ বিধিমালা, ২০২১’ অনুযায়ী, বন্যপ্রাণীর আক্রমণে নিহত ব্যক্তির পরিবারকে ৩ লাখ টাকা, আহত ব্যক্তিকে সর্বোচ্চ ১ লাখ টাকা এবং ঘরবাড়ি ও ফসলসহ জানমালের ক্ষতির জন্য সর্বোচ্চ ৫০ হাজার টাকা পর্যন্ত দেওয়া হয়।
বন অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ২০১২ সাল থেকে ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত হাতির আক্রমণসহ বন্যপ্রাণীর কারণে ক্ষতিগ্রস্তদের মধ্যে নিহত ৩২২ জনের পরিবার, আহত ১৬৯ জন এবং ঘরবাড়ি ও ফসলের ক্ষতির শিকার ৩ হাজার ২১৫টি পরিবারকে মোট প্রায় ১৩ কোটি ৭৭ লাখ টাকা ক্ষতিপূরণ দেওয়া হয়েছে।
ক্ষতিগ্রস্ত মানুষ যেন দ্রুত এই অর্থ পান, সে জন্য বন অধিদপ্তরকে নির্দেশনা দিয়েছেন মন্ত্রী।
মানুষ ও হাতির সংঘাত কমাতে স্থানীয় জনগণকে সরাসরি কাজে যুক্ত করার উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে। হাতি অধ্যুষিত এলাকায় এ পর্যন্ত ১৫৯টি এলিফ্যান্টস রেসপন্স টিম (ইআরটি) গঠন করা হয়েছে।
এসব দলের কাজ হলো এলাকায় হাতির উপস্থিতি সম্পর্কে দ্রুত সতর্কবার্তা দেওয়া, হাতির গতিবিধি পর্যবেক্ষণ করা এবং নিরাপদ উপায়ে মানুষ ও হাতির মুখোমুখি সংঘাত কমাতে সহায়তা করা।
মন্ত্রী বলেন, স্থানীয় জনগণের অংশগ্রহণই হাতি সংরক্ষণের সবচেয়ে বড় শক্তি। স্থানীয় মানুষকে বাদ দিয়ে দীর্ঘমেয়াদে হাতি সংরক্ষণ সম্ভব নয়।
অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ সহকারী (পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন বিষয়ক) ড. মো. সাইমুম পারভেজ বলেন, প্রাণ ও প্রকৃতি রক্ষায় হাতির গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। মানুষের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে জীববৈচিত্র্য রক্ষার বিকল্প নেই।
পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের ভারপ্রাপ্ত সচিব ড. ফাহমিদা খানম বলেন, হাতি শুধু বাংলাদেশেই নয়, বিশ্বজুড়েই বিপন্ন। হাতি সংরক্ষণ থেকে পরিবেশ ও সমাজ কতটা উপকৃত হয়, তা অনেক সময় সরাসরি বোঝা যায় না। ফলে নতুন প্রকল্পের জন্য অর্থায়ন ও অনুমোদন পাওয়া কঠিন হয়ে পড়ে।
তিনি সরকারি অর্থায়নের পাশাপাশি দেশি-বিদেশি প্রতিষ্ঠানগুলোকে হাতি সংরক্ষণে সরকারের সঙ্গে একযোগে কাজ করার আহ্বান জানান।
অনুষ্ঠানে শেরপুর-৩ আসনের সংসদ সদস্য মাহমুদুল হক রুবেল তাঁর এলাকায় হাতির আক্রমণ ও ক্ষতিপূরণ পরিস্থিতির বিভিন্ন তথ্য তুলে ধরেন।
প্রধান বন সংরক্ষক মো. আমীর হোসাইন চৌধুরীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে আরণ্যক ফাউন্ডেশনের ভারপ্রাপ্ত নির্বাহী পরিচালক ড. মো. আব্দুল মোতালেব হাতি সংরক্ষণ নিয়ে বিভিন্ন তথ্য ও উপাত্ত উপস্থাপন করেন।
অনুষ্ঠানে হাতি সংরক্ষণে কাজ করা বিভিন্ন সংগঠনের প্রতিনিধি, পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয় ও বন অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা এবং প্রিন্ট, ইলেকট্রনিক ও অনলাইন গণমাধ্যমের সাংবাদিকরা উপস্থিত ছিলেন।
বাংলাদেশে হাতি সংরক্ষণের সামনে তাই চ্যালেঞ্জটি কেবল হাতির সংখ্যা বাড়ানো নয়। তাদের বিচরণক্ষেত্র টিকিয়ে রাখা, বন রক্ষা করা এবং হাতির সঙ্গে বসবাসকারী মানুষের নিরাপত্তা ও জীবিকার বিষয়টি একই পরিকল্পনার মধ্যে আনাই এখন বড় কাজ। কারণ হাতির জন্য নিরাপদ বন এবং মানুষের জন্য নিরাপদ বসতি—দুটিই নিশ্চিত না হলে মানুষ-হাতির সংঘাতের চক্র ভাঙা কঠিন।