পোশাক কারখানায় কম খরচে সবুজ জ্বালানি ব্যবহারের সুযোগ

বাংলাদেশের তৈরি পোশাক খাতের সামনে এখন শুধু উৎপাদন বাড়ানোর চ্যালেঞ্জ নয়। একই সঙ্গে কম খরচে উৎপাদন, জ্বালানি সাশ্রয় এবং পরিবেশগত মান উন্নয়নের চাপও বাড়ছে। আন্তর্জাতিক বাজারে টিকে থাকতে এসব বিষয় ক্রমেই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।

এই বাস্তবতায় দেশের ৩৩৯টি পোশাক কারখানায় জ্বালানি ব্যবহারের ওপর বড় পরিসরের মূল্যায়ন করা হয়েছে। উদ্যোগটি নিয়েছে বাংলাদেশে ডেনমার্ক দূতাবাস এবং ব্র্যাক ইনস্টিটিউট অব গভর্ন্যান্স অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট (বিআইজিডি)। সংশ্লিষ্টদের দাবি, বাংলাদেশে এ ধরনের উদ্যোগের মধ্যে এটি এখন পর্যন্ত সবচেয়ে বড় পরিসরের একটি।

মূল্যায়নের লক্ষ্য ছিল কারখানাগুলো কোথায় এবং কীভাবে জ্বালানি কম ব্যবহার করতে পারে, তা চিহ্নিত করা। একই সঙ্গে উৎপাদন ব্যাহত না করে পরিচালন ব্যয় কমানোর সুযোগও খোঁজা হয়েছে।

পোশাক কারখানায় উৎপাদনের বিভিন্ন ধাপে বিদ্যুৎ ও তাপশক্তির প্রয়োজন হয়। মেশিন পরিচালনা, আলো, বায়ু চলাচল ও শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ, বয়লার, কমপ্রেসড এয়ারসহ বিভিন্ন ব্যবস্থায় জ্বালানি ব্যবহার হয়।

এসব ব্যবস্থার দক্ষতা কম হলে একই পরিমাণ উৎপাদনের জন্য বেশি জ্বালানি প্রয়োজন হয়। ফলে বাড়ে উৎপাদন ব্যয়। একই সঙ্গে বাড়ে কারখানার কার্বন নিঃসরণ।

এনার্জি অ্যাসেসমেন্টের উদ্দেশ্য হলো এই জায়গাগুলোকে তথ্যের ভিত্তিতে শনাক্ত করা। কোথায় কত জ্বালানি ব্যবহৃত হচ্ছে, কোন ব্যবস্থায় দক্ষতা বাড়ানো সম্ভব এবং কোন পদক্ষেপে অর্থনৈতিকভাবে লাভ পাওয়া যেতে পারে—এসব প্রশ্নের উত্তর খোঁজা হয়েছে।

এই উদ্যোগের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো শুধু পৃথক কারখানার মূল্যায়নেই কাজটি সীমাবদ্ধ থাকেনি। প্রকল্পের আওতায় একটি ওপেন-সোর্স ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম তৈরি করা হয়েছে।

এখানে বিভিন্ন কারখানার জ্বালানি ব্যবহারের তথ্য একত্র করা হচ্ছে। ফলে ভবিষ্যতে একটি কারখানা নিজের জ্বালানি ব্যবহারের দক্ষতা অন্য কারখানার সঙ্গে তুলনা করতে পারবে।

এ ধরনের বেঞ্চমার্কিং ব্যবস্থার ফলে কারখানা কর্তৃপক্ষ নিজেদের দুর্বল জায়গা শনাক্ত করতে পারে। একই সঙ্গে জ্বালানি ব্যবহারের পরিবর্তনও পর্যবেক্ষণ করা সম্ভব।

শিল্প খাতের জন্য এটি গুরুত্বপূর্ণ। কারণ পরিবেশগত কর্মদক্ষতা এখন আর শুধু কারখানার অভ্যন্তরীণ বিষয় নয়। বৈশ্বিক ক্রেতারা সরবরাহকারীদের পরিবেশগত ও সামাজিক কর্মদক্ষতা সম্পর্কে ক্রমেই বেশি তথ্য চাইছে।

জ্বালানি দক্ষতার আলোচনায় পরিবেশের বিষয়টি সামনে থাকলেও ব্যবসায়িক দিকটি কম গুরুত্বপূর্ণ নয়। বরং পোশাক কারখানার জন্য এটি সরাসরি খরচের সঙ্গে যুক্ত।

একই উৎপাদন ধরে রেখে যদি কম বিদ্যুৎ বা জ্বালানি ব্যবহার করা যায়, তাহলে কারখানার পরিচালন ব্যয় কমে। দীর্ঘমেয়াদে এর প্রভাব পড়তে পারে পণ্যের উৎপাদন খরচ ও প্রতিযোগিতা সক্ষমতার ওপর।

বাংলাদেশের পোশাক শিল্প আন্তর্জাতিক বাজারে মূলত মূল্য ও উৎপাদন সক্ষমতার পাশাপাশি মান ও নির্ভরযোগ্যতার প্রতিযোগিতায় রয়েছে। এ অবস্থায় জ্বালানি দক্ষতা বাড়ানো উৎপাদন খরচ নিয়ন্ত্রণের একটি উপায় হতে পারে।

জ্বালানি দক্ষতা বাড়ানোর আরেকটি সুবিধা হলো পরিবেশগত প্রভাব কমানো। কম জ্বালানি ব্যবহার মানে সাধারণভাবে একই উৎপাদনের জন্য কম শক্তি প্রয়োজন। এর সঙ্গে কার্বন নিঃসরণ কমানোর সুযোগও তৈরি হয়।

বাংলাদেশের পোশাক শিল্পে সবুজ কারখানার সংখ্যা নিয়ে ইতোমধ্যে আন্তর্জাতিকভাবে আলোচনা রয়েছে। তবে একটি কারখানার পরিবেশবান্ধব অবকাঠামো থাকা এবং প্রতিদিনের উৎপাদনে জ্বালানি দক্ষতার সঙ্গে কাজ করা এক বিষয় নয়।

তাই শুধু ভবন বা প্রযুক্তিতে বিনিয়োগ নয়, জ্বালানি ব্যবহারের তথ্য সংগ্রহ এবং নিয়মিত ব্যবস্থাপনাও গুরুত্বপূর্ণ।

আন্তর্জাতিক পোশাক বাজারে পরিবেশ, সামাজিক দায়বদ্ধতা ও সুশাসন বা ইএসজি-সংক্রান্ত তথ্যের গুরুত্ব বাড়ছে। ইউরোপসহ বড় বাজারগুলোর ক্রেতা প্রতিষ্ঠানগুলো সরবরাহ চেইনের পরিবেশগত প্রভাব সম্পর্কে আরও তথ্য চাইছে।

এই পরিস্থিতিতে কারখানার জ্বালানি ব্যবহারের নির্ভরযোগ্য তথ্য গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ হয়ে উঠতে পারে। ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মটি সেই তথ্য ব্যবস্থাপনার ভিত্তি তৈরিতে সহায়তা করতে পারে।

ডেটা থাকলে কারখানা শুধু দাবি করতে পারবে না যে তারা পরিবেশবান্ধব। তারা নিজেদের জ্বালানি ব্যবহারের প্রবণতা ও উন্নতির তথ্যও দেখাতে পারবে।

প্রকল্পটি বাংলাদেশ গার্মেন্ট ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন (বিজিএমইএ) এবং বাংলাদেশ নিটওয়্যার ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন (বিকেএমইএ)-এর সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সহযোগিতায় পরিচালিত হয়েছে।

শিল্প সংগঠনগুলোর সম্পৃক্ততা এ উদ্যোগের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক। কারণ কারখানা পর্যায়ে তথ্য সংগ্রহ এবং বাস্তবসম্মত জ্বালানি ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করতে শিল্প মালিকদের অংশগ্রহণ প্রয়োজন।

ডেনমার্কের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এসডিজি অপচ্যুনিটি উইনডো-এর সহায়তায় পরিচালিত এই উদ্যোগকে দুই দেশের বৃহত্তর ‘পার্টনারশীপ ফর সাসটেইনেবল প্রসপারিটি’-এর অংশ হিসেবেও দেখা হচ্ছে। ডেনমার্কের এই অংশীদারত্বে বাংলাদেশের সবুজ রূপান্তর, প্রতিযোগিতা সক্ষমতা ও টেকসই অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিকে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।

৩৩৯টি কারখানার মূল্যায়ন গুরুত্বপূর্ণ একটি ডেটাবেস তৈরি করেছে। তবে এর প্রকৃত প্রভাব নির্ভর করবে চিহ্নিত সুযোগগুলো কতটা বাস্তবে কাজে লাগানো হয় তার ওপর।

কোন কারখানা কতটি সুপারিশ বাস্তবায়ন করল, এতে কত জ্বালানি সাশ্রয় হলো এবং উৎপাদন ব্যয় কতটা কমল—এসব তথ্য ভবিষ্যতে প্রকাশ করা গেলে উদ্যোগটির অর্থনৈতিক প্রভাব আরও স্পষ্ট হবে।

বাংলাদেশের পোশাক শিল্পের জন্য তাই জ্বালানি দক্ষতা এখন শুধু পরিবেশ রক্ষার বিষয় নয়। এটি উৎপাদন ব্যয়, আন্তর্জাতিক বাজারের শর্ত এবং দীর্ঘমেয়াদি প্রতিযোগিতা সক্ষমতার সঙ্গেও যুক্ত।

৩৩৯ কারখানার মূল্যায়ন সেই পরিবর্তনের জন্য একটি তথ্যভিত্তিক ভিত্তি তৈরি করেছে। এখন চ্যালেঞ্জ হলো তথ্যকে সিদ্ধান্তে এবং সিদ্ধান্তকে বাস্তব বিনিয়োগে পরিণত করা।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *