চট্টগ্রামের আনোয়ারায় কর্ণফুলী নদীর পূর্ব তীরে চীন-বাংলাদেশ যৌথ উদ্যোগে গড়ে ওঠা চায়না ইকোনমিক অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিয়াল জোন (সিইআইজেড)-এর ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করা হয়েছে। সরকারের আশা, এই শিল্পাঞ্চল দেশের শিল্পায়ন, বিদেশি বিনিয়োগ, রপ্তানি বৈচিত্র্য এবং কর্মসংস্থানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথির বক্তব্যে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, এই প্রকল্প বাংলাদেশের শিল্প খাতে একটি নতুন অধ্যায়ের সূচনা করবে। তাঁর ভাষায়, এটি শুধু একটি শিল্পাঞ্চল নির্মাণ নয়, বরং বাংলাদেশ ও চীনের অর্থনৈতিক সহযোগিতাকে আরও শক্তিশালী করার একটি দীর্ঘমেয়াদি উদ্যোগ।
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। তিনি বলেন, সরকার দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ বাড়াতে বিভিন্ন সংস্কার কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে। তাঁর মতে, এই শিল্পাঞ্চলে অবকাঠামো ও শিল্প স্থাপনে প্রায় ১ বিলিয়ন মার্কিন ডলার বিনিয়োগ আসতে পারে।
অর্থমন্ত্রী জানান, বিনিয়োগকারীদের জন্য দ্রুত সেবা নিশ্চিত করতে সরকার শিগগিরই শতভাগ কার্যকর সিঙ্গেল উইন্ডো সার্ভিস চালুর পরিকল্পনা করছে। পাশাপাশি পুঁজিবাজার ও মূলধনী খাতে কৌশলগত বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণেও উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। তিনি শিল্পাঞ্চলে একটি আধুনিক স্কিল ডেভেলপমেন্ট সেন্টার প্রতিষ্ঠার জন্য চীনা অংশীদারদের প্রতি আহ্বান জানান, যাতে স্থানীয় জনগণ দক্ষতা অর্জনের মাধ্যমে নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ পায়।
সরকারের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, সিইআইজেড প্রায় ৭৭৬ একর (৩১৪.৩৯ হেক্টর) জমির ওপর গড়ে উঠবে। প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে চট্টগ্রাম অঞ্চলে ৩৬ হাজারের বেশি মানুষের প্রত্যক্ষ কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
শিল্পাঞ্চলে তৈরি পোশাক ও টেক্সটাইলের পাশাপাশি বায়ো-ফার্মাসিউটিক্যালস, খাদ্য ও পানীয় প্রক্রিয়াজাতকরণ এবং চামড়াজাত পণ্য উৎপাদনকারী শিল্প স্থাপনের পরিকল্পনা রয়েছে। সরকারের মতে, এর মাধ্যমে বাংলাদেশের রপ্তানি খাত আরও বৈচিত্র্যময় হবে এবং উচ্চমূল্যের শিল্পে বিনিয়োগ বাড়বে।
অবস্থানগত দিক থেকেও প্রকল্পটিকে কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ বলে উল্লেখ করা হয়েছে। শিল্পাঞ্চলটি কর্ণফুলী টানেল থেকে প্রায় ৭০০ মিটার, শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে ৬ কিলোমিটার এবং চট্টগ্রাম বন্দর থেকে ১২ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত। এছাড়া এটি এন-১ জাতীয় মহাসড়কের সঙ্গে সরাসরি সংযুক্ত হওয়ায় পণ্য পরিবহন সহজ হবে বলে সরকারের দাবি।
পরিবেশ সুরক্ষার বিষয়টিও প্রকল্পে গুরুত্ব পেয়েছে বলে জানানো হয়েছে। শিল্পাঞ্চলে আন্তর্জাতিক মানের সেন্ট্রাল এফলুয়েন্ট ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্ট (সিইটিপি) এবং পরিবেশবান্ধব অবকাঠামো নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, বিনিয়োগকারীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেবে। একই সঙ্গে বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্তৃপক্ষের (বেজা) ওয়ান-স্টপ সার্ভিস ব্যবস্থার মাধ্যমে দ্রুত অনুমোদন ও গ্যাস-বিদ্যুতের মতো সেবা নিশ্চিত করার প্রতিশ্রুতি দেন তিনি।
অনুষ্ঠানে আরও বক্তব্য দেন ভূমি ও পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক প্রতিমন্ত্রী মীর মোহাম্মদ হেলাল উদ্দীন, বাংলাদেশে নিযুক্ত চীনের রাষ্ট্রদূত ইয়াও ওয়েন, চট্টগ্রাম-১৩ আসনের সংসদ সদস্য সারোয়ার জামাল নিজাম এবং চায়না রোড অ্যান্ড ব্রিজ করপোরেশনের (সিআরবিসি) ভাইস চেয়ারম্যান লি চ্যাংগুই। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (বিডা) ও বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্তৃপক্ষের (বেজা) নির্বাহী চেয়ারম্যান আশিক চৌধুরী।
সিইআইজেড প্রকল্পটি বাংলাদেশ ও চীন সরকারের যৌথ উদ্যোগে এবং বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ (বিআরআই)-এর আওতায় বাস্তবায়িত হচ্ছে। সরকার মনে করছে, প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে এটি দুই দেশের অর্থনৈতিক সহযোগিতার একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হয়ে উঠবে।