তাপস চন্দ্র সরকার
লালনসংগীতের অন্যতম প্রধান শিল্পী ফরিদা পারভীনের জীবন, সাধনা ও শিল্পীসত্তাকে নতুনভাবে জানার সুযোগ করে দিয়েছে জীবনালেখ্যগ্রন্থ ‘অন্তরে অচিন পাখি’। লেখক ফাহিম সব্যসাচী রচিত এ গ্রন্থকে কেন্দ্র করে কুমিল্লায় অনুষ্ঠিত হয়েছে পাঠক প্রতিক্রিয়া ও আলোচনা সভা। বক্তারা বলেছেন, বইটি শুধু একজন শিল্পীর জীবনী নয়; এটি বাংলার লোকসংগীত, লালনদর্শন এবং সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ দলিল।
বুধবার (২২শে জুলাই) রাতে কুমিল্লার জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম ইনস্টিটিউট, কুমিল্লা কেন্দ্র মিলনায়তনে এ অনুষ্ঠানের আয়োজন করে মহর্ষি মনোমোহন ফাউন্ডেশন। সহযোগিতায় ছিল জোড়া শালিক। সাহিত্য, সংগীত ও সংস্কৃতিচর্চার সঙ্গে যুক্ত বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের উপস্থিতিতে মিলনায়তন পরিণত হয় এক প্রাণবন্ত সাংস্কৃতিক আসরে।
অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন মহর্ষি মনোমোহন ফাউন্ডেশনের উপদেষ্টা মো. এরশাদ আলী। তিনি বলেন, একটি জীবনালেখ্য কেবল একজন মানুষের জীবনকথা নয়; এটি একটি সময়, একটি সংস্কৃতি এবং একটি জাতির আত্মপরিচয়েরও দলিল। তাঁর মতে, ‘অন্তরে অচিন পাখি’ ফরিদা পারভীনের ব্যক্তিগত জীবনকে ছাড়িয়ে বাংলার লোকসংস্কৃতির ইতিহাসও ধারণ করেছে।
অনুষ্ঠানের প্রধান আকর্ষণ ছিলেন একুশে পদকপ্রাপ্ত বীর মুক্তিযোদ্ধা, বরেণ্য বংশীবাদক এবং ফরিদা পারভীনের জীবনসঙ্গী গাজী আবদুল হাকিম। দীর্ঘ দাম্পত্য জীবনের স্মৃতিচারণ করে তিনি বলেন, দর্শক যে ফরিদা পারভীনকে মঞ্চে দেখেন, তাঁর পেছনে রয়েছে দীর্ঘ সংগ্রাম, নিরলস সাধনা এবং অসংখ্য ত্যাগের ইতিহাস।
তিনি বলেন, একজন শিল্পীর সাফল্যের পেছনের কষ্টের গল্প সাধারণ মানুষ খুব কমই জানতে পারেন। পারিবারিক দায়িত্ব, অসুস্থতা কিংবা নানা প্রতিকূলতা কখনোই ফরিদা পারভীনকে সংগীতচর্চা থেকে বিচ্যুত করতে পারেনি। বরং প্রতিটি চ্যালেঞ্জ তাঁকে আরও দৃঢ় করেছে।
গাজী আবদুল হাকিম বলেন, ফরিদা পারভীনের কাছে লালনের গান কখনোই শুধু সংগীত ছিল না। এটি ছিল তাঁর জীবনদর্শনের অংশ। মানুষের প্রতি ভালোবাসা, অসাম্প্রদায়িক চেতনা, সহনশীলতা ও আত্মশুদ্ধির যে শিক্ষা লালন দিয়েছেন, তিনি তা নিজের জীবন ও গানের মাধ্যমে ধারণ করেছেন।
তিনি আরও বলেন, ‘অন্তরে অচিন পাখি’ পড়লে পাঠক একজন কিংবদন্তি শিল্পীর পাশাপাশি একজন সংগ্রামী নারী এবং একনিষ্ঠ সাধকের জীবনও জানতে পারবেন। তাঁর বিশ্বাস, বইটি নতুন প্রজন্মকে বাংলা লোকসংগীতের প্রতি আগ্রহী করবে।
বিশেষ অতিথি হিসেবে বক্তব্য দেন ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নবীনগর সাতমোড়া আনন্দ আশ্রমের অধ্যক্ষ সাধ্বী শঙ্করী দত্ত। তিনি বলেন, আত্মিক বিকাশে সংগীতের ভূমিকা অপরিসীম। ফরিদা পারভীনের কণ্ঠে লালনের গান মানুষকে নিজের ভেতরের মানুষকে খুঁজে নিতে সহায়তা করে।
আলোচনায় অংশ নেন অর্থনীতিবিদ, কবি ও কথাশিল্পী ড. আবুল বাসার এবং লেখক, আবৃত্তিশিল্পী ও যোগ প্রশিক্ষক কাজী মাহতাব সুমন। তাঁরা বলেন, ফাহিম সব্যসাচী গবেষণাভিত্তিক তথ্য ও আন্তরিক উপস্থাপনার মাধ্যমে শিল্পীর জীবনের বহু অজানা অধ্যায় পাঠকের সামনে তুলে ধরেছেন।
বক্তারা আরও বলেন, বর্তমান সময়ে সাংস্কৃতিক চর্চা নানা চ্যালেঞ্জের মুখে রয়েছে। এমন সময়ে একটি নির্ভরযোগ্য জীবনালেখ্য ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে শিকড়ের সন্ধান দিতে পারে। বাংলা লোকসংগীতের ঐতিহ্য সংরক্ষণেও এ ধরনের গ্রন্থ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
অনুষ্ঠানের সাংস্কৃতিক পর্বে লালনসংগীত ও লোকগান পরিবেশন করেন শিল্পী শিউলী রায় এবং শৈলী সূত্রধর স্বর্ণা। তাঁদের পরিবেশনায় উপস্থিত দর্শক-শ্রোতারা মুগ্ধ হন। করতালিতে বারবার মুখরিত হয়ে ওঠে মিলনায়তন।
অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেন রীতা সরকার ও জোড়া শালিকের কর্ণধার হালিম আব্দুল্লাহ। আলোচনা, স্মৃতিচারণ, পাঠক প্রতিক্রিয়া এবং সংগীত পরিবেশনার সমন্বয়ে অনুষ্ঠানটি পূর্ণতা পায়।
শেষে উপস্থিত পাঠক ও দর্শকরা মত প্রকাশ করেন, ‘অন্তরে অচিন পাখি’ শুধু একটি জীবনীগ্রন্থ নয়; এটি বাংলার লোকঐতিহ্য, লালনদর্শন এবং এক নিবেদিতপ্রাণ শিল্পীর জীবনসংগ্রামের প্রামাণ্য দলিল। তাঁদের প্রত্যাশা, বইটি ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে ফরিদা পারভীনের জীবন ও কর্মকে আরও বিস্তৃতভাবে পৌঁছে দেবে এবং বাংলা লোকসংগীতের ঐতিহ্য সংরক্ষণে ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে।