বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক বাণিজ্য সক্ষমতা বাড়াতে এবং বৈশ্বিক অর্থনৈতিক পরিবর্তনের সঙ্গে তাল মিলিয়ে নীতি প্রণয়নে সহায়তা করতে বাংলাদেশ ফরেন ট্রেড ইনস্টিটিউট (বিএফটিআই)-কে একটি শক্তিশালী জাতীয় থিংক ট্যাংক হিসেবে গড়ে তোলার পরিকল্পনা ঘোষণা করেছে সরকার।
মঙ্গলবার (২১শে জুলাই) রাজধানীর বিএফটিআই সম্মেলন কক্ষে অনুষ্ঠিত প্রতিষ্ঠানের ৬৩তম পরিচালনা পর্ষদের সভায় এ ঘোষণা দেন বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির। তিনি বলেন, ভবিষ্যতের বাণিজ্যিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় বৈশ্বিক বাজার, আন্তর্জাতিক বাণিজ্যব্যবস্থা এবং অর্থনৈতিক প্রবণতা নিয়ে নিয়মিত ও গভীর গবেষণার কোনো বিকল্প নেই। এই লক্ষ্যেই বিএফটিআইকে নতুন পরিকল্পনার আওতায় আরও শক্তিশালী করা হচ্ছে।
বাণিজ্যমন্ত্রীর ভাষায়, প্রয়োজনীয় অর্থায়নের অভাব নেই; বরং এতদিন দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার ঘাটতি ছিল। এখন সেই পরিকল্পনা বাস্তবায়নের কাজ শুরু হয়েছে। তিনি জানান, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য চুক্তি, বাণিজ্য আইন এবং বৈশ্বিক বিধিবিধান সম্পর্কে দক্ষ জনবল গড়ে তুলতে বিএফটিআই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে।
সরকারের পরিকল্পনা অনুযায়ী, চীন, ভারত, যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নসহ বিশ্বের প্রধান অর্থনীতিগুলোর বাজার পরিস্থিতি, বাণিজ্য প্রবণতা, সম্ভাব্য ঝুঁকি এবং অর্থনৈতিক পরিবর্তন নিয়ে নিয়মিত গবেষণা করবে প্রতিষ্ঠানটি। এসব গবেষণার ফলাফল সরকারের নীতিনির্ধারণের পাশাপাশি ব্যবসায়ী ও উদ্যোক্তাদের সিদ্ধান্ত গ্রহণেও সহায়ক হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
সভায় আন্তর্জাতিক মানের প্রশিক্ষণ কার্যক্রম চালুর পরিকল্পনার কথাও তুলে ধরা হয়। বিশ্বের খ্যাতনামা বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর সহযোগিতায় সরকারি কর্মকর্তা এবং বেসরকারি খাতের প্রতিনিধিদের জন্য আন্তর্জাতিক বাণিজ্য, বাণিজ্য আইন ও অর্থনৈতিক নীতিবিষয়ক বিশেষায়িত প্রশিক্ষণের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। একই সঙ্গে সরকারি ও বেসরকারি খাতের বাণিজ্য আইন বিশেষজ্ঞদের সমন্বয়ে একটি পেশাদার নেটওয়ার্ক গড়ে তোলার পরিকল্পনাও রয়েছে।
পরিচালনা পর্ষদের সভায় বাংলাদেশ ফরেন ট্রেড ইনস্টিটিউটের নতুন প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা হিসেবে ড. মোস্তফা আবীদ খানের নিয়োগ অনুমোদন দেওয়া হয়।
সভায় জানানো হয়, দেশের বাণিজ্য নীতি উন্নয়ন এবং রপ্তানি সক্ষমতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে বাংলাদেশ ট্রেড অ্যান্ড ট্যারিফ কমিশন (বিটিটিসি) ইতোমধ্যে একাধিক গবেষণা ও প্রশিক্ষণ কার্যক্রম পরিচালনা করছে। এসব গবেষণার মধ্যে রয়েছে বিদ্যমান আইন ও বিধিমালা পর্যালোচনা, রপ্তানি বহুমুখীকরণে Anti-Export Bias-এর প্রভাব, অ্যান্টি-ডাম্পিং, কাউন্টারভেইলিং ও সেফগার্ড ব্যবস্থার চ্যালেঞ্জ এবং বাংলাদেশের চামড়া খাতের রপ্তানি বাজার সম্প্রসারণের সম্ভাবনা।
এ ছাড়া বাংলাদেশ প্রতিযোগিতা কমিশনের জন্য দেশের এয়ার টিকিটিং বাজারে প্রতিযোগিতার অবস্থা নিয়েও একটি গবেষণা চলছে। পাশাপাশি বাণিজ্য নীতি, কোম্পানি নিবন্ধন ও বার্ষিক রিটার্ন দাখিল, কর, ভ্যাট, কাস্টমস এবং আমদানি-রপ্তানি প্রক্রিয়া বিষয়ে নিয়মিত প্রশিক্ষণ কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে।
উচ্চশিক্ষা ও গবেষণার ক্ষেত্রেও নতুন উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। বিএফটিআই এবং ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের যৌথ উদ্যোগে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও ব্যবসা বিষয়ে পোস্ট গ্র্যাজুয়েট ডিপ্লোমা (পিজিডি) চালুর প্রস্তুতি চলছে। একই সঙ্গে ইউএনডিপি, সানেম এবং ইনস্টিটিউট অব ইকোনমিক রিপোর্টার্স ফোরামের (আইইআরএফ) সঙ্গে অংশীদারত্বের মাধ্যমে গবেষণা ও দক্ষতা উন্নয়ন কার্যক্রম আরও বিস্তৃত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
সভায় অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের সচিব মো. শাহরিয়ার কাদের সিদ্দিকী, বাণিজ্য সচিব মো. আতাউর রহমান খান, রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) ভাইস চেয়ারম্যান মোহাম্মদ হাসান আরিফ, বিএফটিআইয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ড. সাইফ উদ্দিন আহমেদ, পরিচালনা পর্ষদের ভাইস চেয়ারম্যান মাহবুবুর রহমানসহ সংশ্লিষ্ট সদস্যরা উপস্থিত ছিলেন।
সরকারের এই উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য, বাণিজ্য আইন এবং অর্থনৈতিক গবেষণায় দেশের নিজস্ব সক্ষমতা বাড়বে। একই সঙ্গে বৈশ্বিক বাণিজ্য পরিবেশের পরিবর্তনের সঙ্গে দ্রুত খাপ খাইয়ে নিতে নীতিনির্ধারক, গবেষক এবং ব্যবসায়ীদের জন্য একটি কার্যকর জ্ঞানভিত্তিক প্ল্যাটফর্ম হিসেবে বিএফটিআইর ভূমিকা আরও শক্তিশালী হবে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।