গণতন্ত্র মঞ্চ ভেঙে যাওয়ায় সংস্কারের রাজনীতি অভিভাবকহীন হয়েছে: হাসনাত কাইয়ূম

ঢাকায় অনুষ্ঠিত এক আলোচনা সভায় বাংলাদেশ রাষ্ট্র সংস্কার আন্দোলনের সভাপতি হাসনাত কাইয়ূম বলেছেন, গণতন্ত্র মঞ্চের বিলুপ্তির ফলে দেশের সংস্কারের রাজনীতি কার্যত অভিভাবকহীন অবস্থায় পড়েছে। তিনি দাবি করেন, একসময় শেখ হাসিনার সরকারের বিরুদ্ধে গণতান্ত্রিক আন্দোলনের গুরুত্বপূর্ণ প্ল্যাটফর্ম হিসেবে গণতন্ত্র মঞ্চ মানুষের মধ্যে আশা তৈরি করেছিল। তবে জোটের কিছু নেতার রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত ও লক্ষ্যচ্যুতির কারণে সেই সম্ভাবনা নষ্ট হয়েছে।

রাজধানীর তোপখানা রোডে বাংলাদেশ রাষ্ট্র সংস্কার আন্দোলনের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে “গণতন্ত্র মঞ্চের ওপর হামলার ২ বছর: সংস্কারের রাজনীতির পূর্বাপর ও আজকের করণীয়” শীর্ষক এক বিশেষ আলোচনা সভায় তিনি এসব কথা বলেন।

সভায় সভাপতিত্ব করেন হাসনাত কাইয়ূম। এতে অতিথি হিসেবে বক্তব্য দেন জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল (জেএসডি)-এর ভাইস প্রেসিডেন্ট অ্যাডভোকেট কে এম জাবির, অহিংস গণঅভ্যুত্থান বাংলাদেশের সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট আলহাজ্ব ইঞ্জিনিয়ার নজরুল হক, সংগঠনটির সাধারণ সম্পাদক মো. মাহবুবুল আলম চৌধুরী, নেটওয়ার্ক ফর পিপলস অ্যাকশন (এনপিএ)-এর সংগঠক বাকী বিল্লাহ, বাংলাদেশ ভূমিহীন আন্দোলনের সাধারণ সম্পাদক শেখ নাসিরউদ্দিন এবং জাস্টিস অ্যান্ড ডেমোক্রেসি পার্টি (জেডিপি)-এর আহ্বায়ক নাঈম আহমাদসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক ও নাগরিক সংগঠনের প্রতিনিধিরা।

আলোচনা সভায় বক্তারা দেশের বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি, রাষ্ট্র সংস্কারের প্রয়োজনীয়তা এবং ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক করণীয় নিয়ে মতামত তুলে ধরেন।

সভাপতির বক্তব্যে হাসনাত কাইয়ূম বলেন, বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতায় গণতন্ত্র মঞ্চের সাংগঠনিক অস্তিত্ব না থাকলেও এটি একসময় শেখ হাসিনার শাসনের বিরুদ্ধে প্রতিবাদের একটি কার্যকর রাজনৈতিক প্ল্যাটফর্ম ছিল। তাঁর ভাষায়, জোটভিত্তিক সংস্কারের রাজনীতির পথিকৃৎ ছিল গণতন্ত্র মঞ্চ। কিন্তু পরবর্তী সময়ে নেতৃত্বের রাজনৈতিক স্বার্থ ও লক্ষ্যহীনতার কারণে সংস্কারমুখী রাজনীতি বড় ধরনের সংকটে পড়ে।

তিনি আরও বলেন, গণতন্ত্র মঞ্চের শেষ সময়ে বিএনপি ও জামায়াতের বাইরে “গণতন্ত্র মঞ্চ প্লাস” নামে একটি বিকল্প রাজনৈতিক শক্তি গড়ে তোলার চেষ্টা হয়েছিল। সেই উদ্যোগ সফল হলে নির্বাচনী সাফল্য বড় বিষয় না হলেও সংস্কারের রাজনীতি একটি সুসংগঠিত নেতৃত্ব পেত বলে তিনি মনে করেন।

বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে মন্তব্য করতে গিয়ে হাসনাত কাইয়ূম বলেন, আজ এমন একটি বাস্তবতা তৈরি হয়েছে যেখানে উগ্র ডানপন্থী ও অতীতে গণহত্যার অভিযোগে অভিযুক্ত রাজনৈতিক শক্তিগুলোই দৃশ্যত সংস্কারের রাজনীতির ধারক-বাহক হিসেবে নিজেদের উপস্থাপন করছে। তাঁর দাবি, এ পরিস্থিতি তৈরি হওয়ার পেছনে বিকল্প সংস্কারবাদী রাজনৈতিক শক্তি গড়ে তুলতে ব্যর্থতাও একটি কারণ।

তিনি আরও অভিযোগ করেন, বর্তমানে বিএনপি সংসদে দাঁড়িয়ে সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠনের সাংবিধানিক বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন তুলছে। তাঁর মতে, শক্তিশালী বিকল্প রাজনৈতিক শক্তি গড়ে উঠলে এমন অবস্থার সৃষ্টি হতো না।

নতুন বাংলাদেশের রাজনীতিতে নতুন মূল্যায়নের প্রয়োজনীয়তার কথা তুলে ধরে হাসনাত কাইয়ূম বলেন, রাজনীতিবিদদের বিচার করতে হবে তারা ব্যক্তিগত স্বার্থকে অগ্রাধিকার দিয়েছেন, নাকি দেশের স্বার্থকে। তাঁর ভাষায়, “আপনি ফার্স্ট, নাকি বাংলাদেশ ফার্স্ট”—এই প্রশ্নই ভবিষ্যতের রাজনীতির অন্যতম মানদণ্ড হওয়া উচিত।

সভার শেষদিকে রাষ্ট্র সংস্কার আন্দোলনের নেতারা বলেন, তারা সংস্কারের রাজনীতি থেকে সরে দাঁড়াচ্ছেন না। বরং জুলাই গণঅভ্যুত্থানের চেতনা ও গণরায়ের প্রতি অঙ্গীকারবদ্ধ ব্যক্তি ও সংগঠনগুলোকে একত্রিত করে একটি বৃহত্তর রাজনৈতিক ঐক্য গড়ে তোলার উদ্যোগ নেওয়া হবে। একই সঙ্গে জুলাই গণঅভ্যুত্থানের প্রত্যাশা বাস্তবায়নে সরকারকে চাপ প্রয়োগের লক্ষ্যে জনগণকে সঙ্গে নিয়ে গণআন্দোলন গড়ে তোলার প্রত্যয়ও ব্যক্ত করেন তারা।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *