প্রায় ১২ বছরের দীর্ঘ অপেক্ষার পর অবশেষে আসছে বিশ্বের অন্যতম প্রতীক্ষিত ভিডিও গেম গ্র্যান্ড থেফট অটো ৬ (GTA ৬)। গেমটি ঘিরে গেমারদের আগ্রহ অনেক আগেই বিনোদন জগতের সীমানা ছাড়িয়ে গেছে। বিশ্লেষকদের মতে, এটি শুধু একটি ভিডিও গেম নয়; বরং আধুনিক ডিজিটাল বিনোদন শিল্পের অন্যতম বড় ঘটনা।
রকস্টার গেমস ঘোষণা দিয়েছে, ১৯ নভেম্বর ২০২৬-এ প্লেস্টেশন ৫ এবং এক্সবক্স সিরিজ X/S-এর জন্য GTA ৬ মুক্তি পাবে। ২০১৩ সালে GTA ৫ প্রকাশের পর এটিই সিরিজের প্রথম নতুন মূল গেম।
GTA ৬-এর উন্নয়ন ব্যয় নিয়ে আনুষ্ঠানিক কোনো সংখ্যা প্রকাশ করা হয়নি। তবে শিল্প বিশ্লেষকদের ধারণা, এর উন্নয়ন ও বিপণনে ১ থেকে ২ বিলিয়ন মার্কিন ডলার পর্যন্ত ব্যয় হতে পারে। যদি এই হিসাব সঠিক হয়, তাহলে এটি ইতিহাসের সবচেয়ে ব্যয়বহুল ভিডিও গেম হবে।
রকস্টারের মূল প্রতিষ্ঠান টেক-টু ইন্টারঅ্যাক্টিভ-এর প্রধান নির্বাহী স্ট্রস জেলনিক ব্যয়ের পরিমাণ নিশ্চিত না করলেও স্বীকার করেছেন, প্রকল্পটি অত্যন্ত ব্যয়বহুল ছিল। বহু বছরের উন্নয়ন, বিশ্বজুড়ে বিভিন্ন স্টুডিওর সমন্বয় এবং নতুন প্রযুক্তির ব্যবহার এই ব্যয়ের প্রধান কারণ।
GTA ৬-এর গল্প আবর্তিত হয়েছে দুই প্রধান চরিত্রকে ঘিরে। তারা হলেন লুসিয়া ক্যামিনোস এবং জেসন ডুভাল।
লুসিয়া সিরিজের প্রথম গুরুত্বপূর্ণ নারী প্রধান চরিত্র। তিনি কারাগার থেকে মুক্তি পাওয়ার পর নতুন জীবন শুরু করার চেষ্টা করেন। অন্যদিকে জেসন সাবেক সেনাসদস্য। পরে তিনি অপরাধ জগতের সঙ্গে জড়িয়ে পড়েন।
রকস্টারের তথ্য অনুযায়ী, তাদের সম্পর্ক বিখ্যাত অপরাধী যুগল বনি অ্যান্ড ক্লাইড থেকে অনুপ্রাণিত। একটি ব্যর্থ ডাকাতির পর তারা বড় ষড়যন্ত্রে জড়িয়ে পড়ে। এরপর শুরু হয় টিকে থাকার লড়াই।
GTA ৬-এর কাহিনি এগোবে লিওনিডা নামের একটি কাল্পনিক রাজ্যে। এটি যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডা অঙ্গরাজ্যের আদলে তৈরি।
এই রাজ্যের সবচেয়ে পরিচিত শহর ভাইস সিটি। এটি মূলত মায়ামি থেকে অনুপ্রাণিত। সর্বশেষ ২০০২ সালের GTA: Vice City-তে এই শহর দেখা গিয়েছিল।
এ ছাড়া গেমে থাকবে লিওনিডা কিজ, গ্রাসরিভার্স, পোর্ট গেলহর্ন, মাউন্ট কালাগা ন্যাশনাল পার্ক এবং অ্যামব্রোসিয়াসহ বিভিন্ন এলাকা। প্রতিটি অঞ্চলের পরিবেশ, সংস্কৃতি ও ভৌগোলিক বৈশিষ্ট্য আলাদা।
GTA ৬-এর ট্রেইলার প্রকাশের পরই নতুন রেকর্ড তৈরি হয়।
২০২৩ সালের ডিসেম্বরে প্রকাশিত প্রথম ট্রেইলার ২৪ ঘণ্টায় প্রায় ৯৩ মিলিয়ন বার দেখা হয়। এটি ইউটিউবের ইতিহাসে নন-মিউজিক ভিডিওর অন্যতম বড় উদ্বোধন।
এরপর ২০২৫ সালের মে মাসে প্রকাশিত দ্বিতীয় ট্রেইলার প্রথম ২৪ ঘণ্টায় ৪৭৫ মিলিয়ন ভিউ অর্জন করে। এটিকে ইতিহাসের সবচেয়ে বড় ভিডিও লঞ্চগুলোর একটি হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
এই ট্রেইলারে ব্যবহৃত দি পয়েন্টার সিস্টার্স-এর হট টুগেদার গানটির স্ট্রিমিংও হঠাৎ করে কয়েক হাজার গুণ বেড়ে যায়। এতে আবারও প্রমাণ হয়, GTA সিরিজের সাংস্কৃতিক প্রভাব গেমের বাইরেও বিস্তৃত।
প্রথম ধাপে GTA ৬ শুধুমাত্র প্লেস্টেশন ৫ এবং এক্সবক্স সিরিজ X/S-এ মুক্তি পাবে।
রকস্টার এখনো পিসি সংস্করণ ঘোষণা করেনি। তবে অতীতের অভিজ্ঞতা বলছে, কনসোল সংস্করণের কিছু সময় পর পিসিতে গেমটি প্রকাশ হতে পারে।
রকস্টার গেমটির দুটি সংস্করণের মূল্য ঘোষণা করেছে।
স্ট্যান্ডার্ড সংস্করণের দাম ৭৯.৯৯ মার্কিন ডলার। আর আল্টিমেট সংস্করণের দাম ৯৯.৯৯ মার্কিন ডলার।
আল্টিমেট সংস্করণে অতিরিক্ত গাড়ি, অস্ত্র, পোশাক, মিশন এবং বিভিন্ন ডিজিটাল সুবিধা থাকবে। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে প্রি-অর্ডার করলে বিশেষ ভিন্টেজ ভাইস সিটি প্যাক পাওয়া যাবে।
GTA ৬-এর একটি আলোচিত বিষয় হলো এর ফিজিক্যাল সংস্করণ। বিভিন্ন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বক্সে প্রচলিত গেম ডিস্কের পরিবর্তে শুধু একটি ডাউনলোড কোড থাকতে পারে।
এ নিয়ে গেমারদের একাংশ অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন। তাদের মতে, এতে গেমের স্থায়ী মালিকানার ধারণা দুর্বল হতে পারে। তবে ডিজিটাল বিতরণ এখন পুরো গেমিং শিল্পেই দ্রুত বাড়ছে।
রকস্টার শুরু থেকেই GTA ৬-কে একটি শক্তিশালী সিঙ্গেল-প্লেয়ার অভিজ্ঞতা হিসেবে তুলে ধরছে।
বিশ্লেষকদের ধারণা, নতুন অনলাইন সংস্করণটি পরে আলাদা পণ্য হিসেবে প্রকাশ করা হতে পারে। যদিও এ বিষয়ে এখনো আনুষ্ঠানিক ঘোষণা আসেনি।
GTA ৬-এর মুক্তির সময়সূচি ইতোমধ্যে গেমিং শিল্পে প্রভাব ফেলেছে। অনেক প্রকাশক নিজেদের গেমের প্রকাশের তারিখ পরিবর্তন করছেন। কারণ একই সময়ে GTA ৬-এর সঙ্গে প্রতিযোগিতায় যেতে তারা অনিচ্ছুক।
বাজার বিশ্লেষকদের মতে, গেমটি শুধু সফটওয়্যার বিক্রিই বাড়াবে না, নতুন কনসোল বিক্রিতেও বড় ভূমিকা রাখবে।
GTA ৫ মুক্তির তিন দিনের মধ্যে ১ বিলিয়ন মার্কিন ডলার আয় করে ইতিহাস গড়েছিল। সেই রেকর্ড ভাঙার সম্ভাবনাও এখন GTA ৬-এর সামনে।
বাজার গবেষণা প্রতিষ্ঠান ডিএফসি ইন্টেলিজেন্স-এর পূর্বাভাস অনুযায়ী, প্রথম বছরে গেমটি প্রায় ৪০ মিলিয়ন কপি বিক্রি হতে পারে। এতে আয় পৌঁছাতে পারে ৩.২ বিলিয়ন মার্কিন ডলারে।
GTA ৬ শুধু নতুন একটি ভিডিও গেম নয়। এটি প্রযুক্তি, গল্প, ওপেন-ওয়ার্ল্ড নকশা এবং বাণিজ্যিক সম্ভাবনার নতুন মানদণ্ড তৈরি করতে পারে। দীর্ঘ ১২ বছরের অপেক্ষার পর ১৯শে নভেম্বর বিশ্বের কোটি কোটি গেমার এখন দেখতে চান, রকস্টার গেমস তাদের প্রত্যাশা কতটা পূরণ করতে পারে।