নয়াদিল্লিতে ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ও মিয়ানমারের সামরিক সরকারের শীর্ষ নেতা সিনিয়র জেনারেল মিন অং হ্লাইংয়ের মধ্যে উচ্চপর্যায়ের বৈঠক দক্ষিণ এশিয়ার কূটনীতিতে একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড় নিয়ে এসেছে। এই বৈঠক মিয়ানমারে ২০২১ সালের সামরিক অভ্যুত্থানের পর দুই দেশের সম্পর্কের স্বাভাবিকীকরণ প্রক্রিয়ারই অংশ বলে মনে করা হচ্ছে। তবে, এই সম্পর্কের পেছনে ভারতের কৌশলগত বাধ্যবাধকতা এবং কূটনৈতিক দ্বিধাদ্বন্দ্বও স্পষ্ট।
২০২১ সালের ১লা ফেব্রুয়ারি সামরিক অভ্যুত্থানের পর মিয়ানমারের সামরিক জান্তা আন্তর্জাতিকভাবে ক্রমশ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। আসিয়ানের বৈঠক থেকে বিতাড়িত, পাশ্চাত্যের কঠোর সমালোচনার মুখে এবং আন্তর্জাতিক আদালতে নির্যাতনের অভিযোগে অভিযুক্ত মিন অং হ্লাইংয়ের আন্তর্জাতিক ভ্রমণ ব্যাপকভাবে সীমিত। এর মধ্যেই ২০২৫ সালের আগস্টে চীনে অনুষ্ঠিত সাংহাই সহযোগিতা সংস্থার (এসসিও) সম্মেলনের ফাঁকে মোদি ও মিন অং হ্লাইংয়ের বৈঠক হয়, যা ছিলো জান্তা নেতার কয়েকটি বিরল আন্তর্জাতিক উপস্থিতির একটি।
সম্প্রতি নয়াদিল্লিতে অনুষ্ঠিত এই বৈঠকে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক, নিরাপত্তা সহযোগিতা এবং আঞ্চলিক সংযোগ প্রকল্পগুলো নিয়ে আলোচনা হয়েছে বলে কূটনৈতিক সূত্রে জানা গেছে।
ভারত মিয়ানমারের সামরিক সরকারের সাথে সম্পর্ক রাখার ক্ষেত্রে পাশ্চাত্যের নীতি অনুসরণ করছে না। নয়াদিল্লি অভ্যুত্থানের নিন্দা করেনি এবং সামরিক সরকারের সাথে বাস্তবসম্মত সম্পর্ক বজায় রেখেছে। বিশ্লেষকরা একে ভারতের ‘কৌশলগত স্বায়ত্তশাসন’ নীতির অংশ হিসেবে দেখছেন।
অবজারভার রিসার্চ ফাউন্ডেশনের এক গবেষণায় বলা হয়, ভারত মিয়ানমারের স্টেট অ্যাডমিনিস্ট্রেশন কাউন্সিলের (এসএসি) সাথে সম্পর্ককে স্বাভাবিক দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের স্তরেই পরিচালনা করছে। কিছু দ্বিপাক্ষিক বৈঠকে ‘গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠা’র উল্লেখও কমিয়ে দেওয়া হয়েছে।
ভারতের মিয়ানমার নীতির পেছনে বেশ কয়েকটি কারণ কাজ করছে:
সীমান্ত নিরাপত্তা: ভারত ও মিয়ানমারের মধ্যে ১,৬০০ কিলোমিটার সীমান্ত রয়েছে। দশকের পর দশক ধরে ভারত উত্তর-পূর্বাঞ্চলের বিদ্রোহী গোষ্ঠী দমনে মিয়ানমার সেনাবাহিনীর (তাতমাদাউ) সহযোগিতার ওপর নির্ভরশীল। ২০১৯ সালে দুই দেশের সেনাবাহিনী যৌথভাবে বিদ্রোহী শিবির ধ্বংসের অভিযান চালায়।
চীনের প্রভাব মোকাবিলা: মিয়ানমারে চীনের ক্রমবর্ধমান প্রভাব ভারতের জন্য একটি বড় উদ্বেগের কারণ। কোকো দ্বীপে চীনের সম্ভাব্য শ্রোতা কেন্দ্র (লিসেনিং পোস্ট) ভারতের আন্দামান ও নিকোবর দ্বীপপুঞ্জের ত্রি-সেবা কমান্ডের ওপর নজরদারির আশঙ্কা তৈরি করেছে।
সংযোগ প্রকল্প: কালাদান বহুমুখী ট্রানজিট পরিবহন প্রকল্প এবং ভারত-মিয়ানমার-থাইল্যান্ড ত্রিপাক্ষিক মহাসড়ক ভারতের ‘অ্যাক্ট ইস্ট’ নীতির মেরুদণ্ড। দুটি প্রকল্পই সংঘাতের কারণে বারবার বিলম্বিত হলেও দীর্ঘমেয়াদী কৌশলগত গুরুত্ব বহন করে।
বাণিজ্যিক স্বার্থ: ২০২৩-২৪ অর্থবছরে দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য ১.৭৪ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে এবং তা ২০২৪-২৫ সালে ২.১ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছানোর আশা করা হচ্ছে। মিয়ানমারে ৩৯টি ভারতীয় কোম্পানি ৭৮২.৮ মিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করেছে।
ভারতের এই সম্পর্ক নিয়ে প্রশ্ন উঠছে। মিয়ানমারে ২০২৫-২০২৬ সালের নির্বাচনকে জান্তা ‘নিয়ন্ত্রিত গণতন্ত্র’ হিসেবে চালিয়েছে, যেখানে বিরোধী দলগুলোকে বাতিল করা হয়েছে, নেতারদের কারাবন্দি করা হয়েছে এবং দেশের বড় অংশে ভোটগ্রহণ সম্ভব হয়নি। জাতীয় লীগ ফর ডেমোক্রেসি (এনএলডি) বিলুপ্ত ঘোষিত হয়েছে।
তারপরও ভারত বৈঠকে ‘সকলের অংশগ্রহণে স্বচ্ছ, নিরপেক্ষ ও অন্তর্ভুক্তিমূলক নির্বাচনের’ কথা বলেছে, যা জান্তার রাজনৈতিক রোডম্যাপের প্রতি পরোক্ষ সমর্থন হিসেবে দেখা হচ্ছে।
গবেষক অংশুমান চৌধুরীর মতে, “ভারতের চিন্তাধারায় নেইপিদোতে যে ক্ষমতায় আছে তার সাথেই সম্পর্ক রাখার রক্ষণশীল নীতি প্রাধান্য পায়। কিন্তু অঞ্চলের বৃহত্তম ফেডারেল গণতন্ত্র হিসেবে ভারতের জান্তার প্রতি সমর্থন নিজের ঘোষিত গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের সাথে সাংঘর্ষিক।”
মোদি-মিন অং হ্লাইং বৈঠকের পেছনে রোহিঙ্গা সংকটের ছায়া দীর্ঘস্থায়ী। ২০১৭ সালে মিয়ানমার সেনাবাহিনীর নির্যাতনে ৭ লাখের বেশি রোহিঙ্গা বাংলাদেশে পালিয়ে যায়। জাতিসংঘ মানবাধিকারবিষয়ক উচ্চ কমিশনার একে ‘জাতিগত নির্মূলের পাঠ্যবই উদাহরণ’ বলে অভিহিত করেছেন।
ভারতে ৬৫,০০০-এর বেশি মিয়ানমারের নাগরিক আশ্রয় নিয়েছে। তবে ভারত সরকার সীমান্ত কঠোর করেছে, ১,৬০০ কিলোমিটার সীমান্ত প্রাচীর নির্মাণ ত্বরান্বিত করেছে এবং শরণার্থীদের ওপর নজরদারি বাড়িয়েছে।
মিয়ানমারে গৃহযুদ্ধ চলমান। বিরোধী গোষ্ঠীগুলো—জাতীয় ঐক্য সরকার (এনইউজি) ও বিভিন্ন নৃগোষ্ঠী সশস্ত্র সংগঠন—দেশের বড় অংশ নিয়ন্ত্রণ করছে। জান্তা ৯১টি শহর হারিয়েছে। এমন প্রেক্ষাপটে ভারত একদিকে জান্তার সাথে সম্পর্ক রাখছে, অন্যদিকে কিছু বিরোধী গোষ্ঠীর সাথেও পরোক্ষ যোগাযোগ রাখছে।
আইএসইএএস-ইউসুফ ইশাক ইনস্টিটিউটের জোয়ান লিন মনে করেন, “ভারতের হিসাব-নিকাশ চূড়ান্তভাবে ব্যবহারবাদী। নয়াদিল্লি জানে যে তার সংযোগ ও অর্থনৈতিক স্বার্থ—কালাদান প্রকল্প, সীমান্ত বাণিজ্য করিডোর এবং অ্যাক্ট ইস্ট উচ্চাকাঙ্ক্ষা—মিয়ানমারের অবনতি হওয়া পরিস্থিতি থেকে যে স্থিতিশীলতা পাওয়া যায় তার ওপর নির্ভরশীল।”
মোদি ও মিন অং হ্লাইংয়ের নয়াদিল্লি বৈঠক ভারতের মিয়ানমার নীতির একটি নতুন অধ্যায়ের সূচনা করতে পারে। কিন্তু এই সম্পর্ক কৌশলগত স্বার্থ ও গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের মধ্যে একটি সূক্ষ্ম ভারসাম্য বজায় রাখার চেষ্টা মাত্র। মিয়ানমারে গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠা, মানবাধিকার রক্ষা এবং আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা—এই তিন লক্ষ্যের মধ্যে কোনটিকে অগ্রাধিকার দেওয়া হবে, তা নিয়ে ভারতের কূটনীতিকদের সামনে কঠিন পরীক্ষা অপেক্ষা করছে।
—
সূত্র: বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনের ভিত্তিতে প্রস্তুত।