মালয়েশিয়ায় বাংলাদেশের হাইকমিশনার মনজুরুল করিম খান চৌধুরী দেশটির উপ-অর্থমন্ত্রী লিউ চিন টং-এর সঙ্গে বৈঠক করেছেন। বৈঠকে বাংলাদেশ ও মালয়েশিয়ার মধ্যে অর্থনৈতিক ও আর্থিক সহযোগিতা আরও জোরদারের বিভিন্ন দিক নিয়ে আলোচনা হয়।
৬ই আগস্ট ২০২৬ মালয়েশিয়ার অর্থ মন্ত্রণালয়ে এ বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। বাংলাদেশের হাইকমিশনারের দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে দুই দেশের বাণিজ্য ও বিনিয়োগ সম্পর্ক জোরদারে তাঁর বিভিন্ন পর্যায়ে যোগাযোগ অব্যাহত রয়েছে। মালয়েশিয়ার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তথ্যেও এর আগে দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য, বিনিয়োগ, উৎপাদন, সরবরাহ ব্যবস্থা ও মানবসম্পদ উন্নয়নে সহযোগিতা বাড়ানোর বিষয়ে তাঁর আলোচনার কথা উঠে এসেছে।
বৈঠকে আলোচনার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ছিল প্রস্তাবিত বাংলাদেশ–মালয়েশিয়া মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি বা এফটিএ। দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্য সম্প্রসারণ এবং ভবিষ্যৎ অর্থনৈতিক সম্পর্কের কাঠামো আরও শক্তিশালী করতে এ উদ্যোগ গুরুত্বপূর্ণ বলে বিবেচিত হচ্ছে।
এ ছাড়া দুই দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মধ্যে প্রাতিষ্ঠানিক সহযোগিতা নিয়েও আলোচনা হয়। ইসলামী অর্থায়ন এবং হালাল শিল্পে অর্থায়নের সম্ভাবনাও আলোচনায় স্থান পায়। এসব খাতে সহযোগিতা বাড়ানো গেলে দুই দেশের আর্থিক প্রতিষ্ঠান ও ব্যবসায়িক খাতের মধ্যে নতুন সুযোগ তৈরি হতে পারে।
অর্থপাচার প্রতিরোধ এবং পাচার করা সম্পদ পুনরুদ্ধারের বিষয়টিও বৈঠকে গুরুত্ব পায়। সীমান্ত পেরিয়ে আর্থিক অপরাধ মোকাবিলায় তথ্য বিনিময় ও প্রাতিষ্ঠানিক সহযোগিতা বাড়ানোর প্রয়োজনীয়তা রয়েছে। দুই দেশের আর্থিক খাতের সম্পৃক্ততা বাড়ার সঙ্গে এ ধরনের সহযোগিতার গুরুত্বও বাড়ছে।
বৈঠকে মালয়েশিয়ায় কর্মরত বাংলাদেশি শ্রমিকদের একটি বাস্তব সমস্যার বিষয়ও উঠে আসে। বিশেষ করে যারা কাজ শেষে বাংলাদেশে ফিরে গেছেন, তাদের মালয়েশিয়ার ব্যাংকে থাকা আমানত উত্তোলন সহজ করার বিষয়ে আলোচনা হয়। সংশ্লিষ্ট প্রক্রিয়া সহজ হলে দেশে ফিরে যাওয়া শ্রমিকদের নিজেদের অর্থ ব্যবহারে সুবিধা হবে।
বিনিয়োগের ক্ষেত্রেও বেশ কয়েকটি সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা হয়েছে। নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতে বিনিয়োগ এবং মালয়েশিয়ার রাষ্ট্রায়ত্ত বিনিয়োগ তহবিল খাজানাহর সঙ্গে সহযোগিতার বিষয়টি এর মধ্যে রয়েছে।
বাংলাদেশের প্রস্তাবিত একটি ফান্ডে মালয়েশিয়ার কৌশলগত বিনিয়োগের সম্ভাবনাও আলোচনায় আসে। এর মাধ্যমে দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ ও অর্থনৈতিক অংশীদারত্বের নতুন ক্ষেত্র তৈরি হতে পারে বলে আশা করা হচ্ছে।
দুই পক্ষই দ্বিপক্ষীয় অর্থনৈতিক সম্পৃক্ততা আরও বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেয়। অর্থায়ন, বিনিয়োগ এবং টেকসই অর্থনৈতিক উন্নয়নে পারস্পরিকভাবে লাভজনক উদ্যোগ নেওয়ার বিষয়ে তারা অভিন্ন অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করেন।
মালয়েশিয়ার উপ-অর্থমন্ত্রী লিউ চিন টং বাংলাদেশ–মালয়েশিয়া সম্পর্কের ধারাবাহিক অগ্রগতিকে স্বাগত জানান। আলোচনায় উঠে আসা ক্ষেত্রগুলোতে সহযোগিতা আরও বিস্তৃত করার ব্যাপারে তিনি আগ্রহ প্রকাশ করেন।
বৈঠকে মালয়েশিয়ার অর্থ মন্ত্রণালয়ের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা অংশ নেন। ছিলেন দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও রয়্যাল মালয়েশিয়ান কাস্টমস বিভাগের প্রতিনিধিরাও। বাংলাদেশের পক্ষে উপ-হাইকমিশনার, প্রথম সচিব (বাণিজ্য) এবং তৃতীয় সচিব (রাজনৈতিক) বৈঠকে অংশ নেন।
বাংলাদেশের হাইকমিশনের তথ্য অনুযায়ী, মনজুরুল করিম খান চৌধুরী ২০২৫ সালের অক্টোবরে কুয়ালালামপুরে হাইকমিশনার হিসেবে যোগ দেন। এর আগে তিনি ইরান ও মিয়ানমারে বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূতের দায়িত্ব পালন করেন।
সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশ–মালয়েশিয়া সম্পর্কের অর্থনৈতিক দিকটি আরও বিস্তৃত হচ্ছে। বাণিজ্য ও বিনিয়োগের পাশাপাশি উৎপাদন, সরবরাহ ব্যবস্থা, মানবসম্পদ এবং হালাল অর্থনীতির মতো খাতেও সহযোগিতার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। ফেব্রুয়ারিতে মালয়েশিয়ার পক্ষ থেকেও দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য ও বিনিয়োগ বাড়াতে উৎপাদন, সরবরাহ ব্যবস্থা, প্রাকৃতিক সম্পদ ও মানবসম্পদ উন্নয়নে সহযোগিতার সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা করা হয়েছিল।
এ বৈঠক তাই কেবল প্রচলিত বাণিজ্য সম্পর্কের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। আর্থিক সহযোগিতা, বিনিয়োগ, শ্রমিকদের স্বার্থ এবং নতুন অর্থনৈতিক খাতে অংশীদারত্ব—সব মিলিয়ে বাংলাদেশ–মালয়েশিয়া সম্পর্ককে আরও বিস্তৃত অর্থনৈতিক কাঠামোর দিকে নেওয়ার একটি প্রচেষ্টা হিসেবে এটিকে দেখা যায়।