অযোধ্যার রামমন্দিরে দানবাক্সের অর্থ চুরির অভিযোগ, রাজনৈতিক চাপে বিজেপি

ভারতের রাজনীতিতে অযোধ্যার রামমন্দির শুধু একটি ধর্মীয় স্থাপনা নয়; এটি বিজেপির দীর্ঘ রাজনৈতিক আন্দোলনের অন্যতম প্রতীক। ২০২৪ সালের জানুয়ারিতে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির উপস্থিতিতে মন্দিরে রামলালার প্রাণপ্রতিষ্ঠার পর বিজেপি এই মন্দিরকে নিজেদের রাজনৈতিক সাফল্যের বড় প্রতীক হিসেবে তুলে ধরে।

কিন্তু সেই মন্দিরের দানবাক্সের অর্থ চুরি ও আত্মসাতের অভিযোগ এখন বিজেপি ও মন্দির পরিচালনাকারী ট্রাস্টকে বড় রাজনৈতিক চাপের মুখে ফেলেছে। তদন্তে এখন পর্যন্ত আটজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে এবং তাদের কাছ থেকে প্রায় ৭৯ লাখ ৮০ হাজার রুপি উদ্ধার করা হয়েছে। একই সঙ্গে মন্দিরের দান গণনা ও ব্যবস্থাপনায় গুরুতর প্রশাসনিক দুর্বলতার বিষয়ও সামনে এসেছে।

তবে তদন্তকারীদের বর্তমান বক্তব্য অনুযায়ী, এখন পর্যন্ত চুরির সঙ্গে মন্দির ট্রাস্টের শীর্ষ নেতৃত্ব বা বিজেপির সরাসরি সম্পৃক্ততার প্রমাণ পাওয়া যায়নি। বরং তদন্তে নিম্নপর্যায়ের কর্মীদের মাধ্যমে অর্থ সরানোর অভিযোগ এবং তাদের নিয়োগ ও তদারকিতে অনিয়মের বিষয়টি গুরুত্ব পেয়েছে।

অযোধ্যার রামমন্দিরে ভক্তদের দেওয়া অর্থ সংগ্রহের জন্য মন্দির চত্বরে প্রায় ৩৫টি দানবাক্স রয়েছে। এসব বাক্সের অর্থ মন্দিরের কাছেই একটি গণনা কেন্দ্রে নিয়ে গিয়ে গণনা করা হয়।

জুনে এই গণনা প্রক্রিয়ায় অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ সামনে আসে। পুলিশের তদন্তে পরে আটজনকে গ্রেপ্তার করা হয়। তাদের মধ্যে কয়েকজনের বিরুদ্ধে গণনার সময় নগদ অর্থ সরিয়ে নেওয়ার অভিযোগ ওঠে।

তদন্তের অংশ হিসেবে প্রায় ৪৫ দিনের সিসিটিভি ফুটেজ পরীক্ষা করা হয়। ভারতীয় সংবাদমাধ্যম দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস জানিয়েছে, ফুটেজে অন্তত পাঁচজন কর্মীকে গণনার সময় টাকার বান্ডিল সরিয়ে পোশাক ও মোজার মধ্যে লুকাতে দেখা গেছে বলে তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।

পরবর্তী তদন্তে আরও চাঞ্চল্যকর তথ্য আসে। ইন্ডিয়া টুডে জানিয়েছে, প্রায় ৪০ দিনের মধ্যে অন্তত ৭০টি ঘটনায় দান থেকে অর্থ সরানোর অভিযোগ পাওয়া গেছে। এসব ঘটনার সবকটিই সন্ধ্যার শিফটে ঘটেছে বলে তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি।

পুলিশের হিসাবে, গ্রেপ্তার হওয়া আটজনের মধ্যে সাতজনের কাছ থেকে মোট ৭৯ লাখ ৮০ হাজার রুপি উদ্ধার করা হয়েছে। পরে তদন্ত আরও বিস্তৃত করা হয়। প্রায় ৩০ জন কর্মীকেও তদন্তের আওতায় আনা হয়েছে বলে দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস জানিয়েছে।

তদন্তকারীদের নজরে এসেছে, দান গণনার মতো গুরুত্বপূর্ণ কাজে নিয়োগের ক্ষেত্রেও যথাযথ প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হয়নি। অনেক কর্মীকে ট্রাস্টের কর্মকর্তা বা তাদের পরিচিতদের সুপারিশের ভিত্তিতে নিয়োগ করা হয়েছিল বলে অভিযোগ রয়েছে।

জুলাইয়ে প্রকাশিত এসআইটির চূড়ান্ত প্রতিবেদনের বিষয়ে দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস জানায়, গণনা কক্ষ পরিচালনার নির্ধারিত নিয়ম বা স্ট্যান্ডার্ড অপারেটিং প্রসিডিউর যথাযথভাবে অনুসরণ করা হয়নি। একই সঙ্গে অনভিজ্ঞ বা অযোগ্য লোকদের সংবেদনশীল কাজে নিয়োগ এবং তদারকির ঘাটতির কথাও উঠে এসেছে। তদন্তের প্রাথমিক মূল্যায়ন অনুযায়ী, অর্থ সরানোর ঘটনা মূলত নিচের স্তরের কর্মীদের মধ্যেই সীমিত ছিল।

অর্থাৎ, এখন পর্যন্ত তদন্তের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নটি শুধু ‘কে টাকা নিয়েছে’ নয়; বরং এত বড় একটি ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের দান ব্যবস্থাপনায় এমন দুর্বলতা কীভাবে তৈরি হলো—সেটিও।

অভিযোগ প্রকাশ্যে আসার পর মন্দির পরিচালনাকারী শ্রী রাম জন্মভূমি তীর্থক্ষেত্র ট্রাস্টের সাধারণ সম্পাদক চম্পত রায় এবং ট্রাস্টি অনিল মিশ্র পদত্যাগের চিঠি দেন। ট্রাস্ট পরে তাদের পদত্যাগপত্র পাওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করে।

চম্পত রায় রামমন্দির আন্দোলনের দীর্ঘদিনের অন্যতম পরিচিত মুখ। ফলে তার পদত্যাগের ঘটনা রাজনৈতিকভাবেও বিশেষ গুরুত্ব পায়।

তবে পদত্যাগ মানেই চুরির ঘটনায় তাদের বিরুদ্ধে অপরাধ প্রমাণিত হয়েছে—এমন নয়। ট্রাস্টের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, বিষয়টি নিয়ে তদন্ত হবে এবং দোষী প্রমাণিত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। একই সঙ্গে ট্রাস্ট জানিয়েছে, দান হিসেবে পাওয়া রূপার ইট ও গয়নার হিসাব নিরাপদে রয়েছে।

রামমন্দির আন্দোলনের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘও বিষয়টি নিয়ে প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে।

আরএসএসের সাধারণ সম্পাদক দত্তাত্রেয় হোসাবলে বলেছেন, মন্দিরের দানবাক্সে চুরির ঘটনা রামভক্ত ও বৃহত্তর হিন্দু সমাজের বিশ্বাস ও অনুভূতিতে গভীর আঘাত করেছে। তিনি তদন্তের মাধ্যমে দোষীদের চিহ্নিত করে কঠোর শাস্তির দাবি জানান।

এই বক্তব্য গুরুত্বপূর্ণ। কারণ রামমন্দির প্রকল্পটি বিজেপির পাশাপাশি আরএসএস ও বিশ্ব হিন্দু পরিষদের দীর্ঘদিনের আন্দোলনের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। ফলে মন্দিরের অর্থ ব্যবস্থাপনায় অনিয়মের অভিযোগ তাদের জন্যও অস্বস্তিকর।

বিরোধী দলগুলো অবশ্য ঘটনাটিকে শুধু একটি অপরাধ হিসেবে দেখছে না। তারা এটিকে বিজেপির শাসন ও মন্দির পরিচালনার রাজনৈতিক জবাবদিহির প্রশ্ন হিসেবে সামনে আনছে।

কংগ্রেস নেতা জয়রাম রমেশ আরএসএসের বক্তব্যের সমালোচনা করে অভিযোগ করেছেন, রামমন্দিরের দানের বড় ধরনের চুরি হয়েছে এবং এর সঙ্গে আরএসএসের নেটওয়ার্কের সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিরা জড়িত। তিনি আরও স্বচ্ছ ও কঠোর তদন্তের দাবি জানিয়েছেন।

সমাজবাদী পার্টির নেতা অখিলেশ যাদবও বিজেপিকে আক্রমণ করেছেন। তার ভাষায়, মন্দিরে দেওয়া ভক্তদের অর্থ ও অনুদান আত্মসাতের অভিযোগ সনাতন ধর্মাবলম্বীদের মধ্যেও ক্ষোভ তৈরি করেছে।

আগস্টে বিষয়টি সংসদেও বড় রাজনৈতিক ইস্যুতে পরিণত হয়েছে। বিরোধীরা রামমন্দিরের দান নিয়ে ওঠা অভিযোগ নিয়ে আলোচনার দাবি জানিয়ে সংসদের কার্যক্রমে প্রতিবাদ করেছে। কংগ্রেস সভাপতি মল্লিকার্জুন খাড়গে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিকে সংসদে এসে বিষয়টির জবাব দেওয়ার দাবি জানিয়েছেন।

বিজেপি অবশ্য অভিযোগকে দলীয় দুর্নীতির প্রমাণ হিসেবে দেখার বিরোধিতা করছে। উত্তরপ্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী যোগী আদিত্যনাথ বলেছেন, তদন্তে কোনো সাধু বা ধর্মীয় নেতার সম্পৃক্ততা পাওয়া যায়নি। তিনি বিরোধীদেরও আক্রমণ করেছেন এবং অভিযোগ তোলার রাজনৈতিক উদ্দেশ্য নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন।

এখানেই রাজনৈতিক বিতর্কের মূল জায়গাটি। একদিকে বিরোধীরা বলছে, মন্দিরের মতো একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানে এমন ঘটনা ঘটলে এর প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক দায় এড়ানো যায় না। অন্যদিকে বিজেপি বলছে, তদন্তে যাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ পাওয়া গেছে তারা নিম্নপর্যায়ের কর্মী; তাই ঘটনাটিকে বিজেপি বা সরকারের দুর্নীতি হিসেবে উপস্থাপন করা রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত।

এই বিতর্কের রাজনৈতিক গুরুত্ব সবচেয়ে বেশি উত্তরপ্রদেশে। কারণ ২০২৭ সালে রাজ্যটিতে বিধানসভা নির্বাচন হওয়ার কথা।

২০২৪ সালের লোকসভা নির্বাচনেই অযোধ্যা যে রাজনৈতিকভাবে বিজেপির জন্য আর নিশ্চিত নিরাপদ এলাকা নয়, তার একটি বড় উদাহরণ দেখা যায়। অযোধ্যা যে ফৈজাবাদ লোকসভা আসনের অন্তর্ভুক্ত, সেখানে সমাজবাদী পার্টির প্রার্থী অবধেশ প্রসাদ বিজেপির লল্লু সিংকে প্রায় ৫৪ হাজার ৫০০ ভোটে হারান। মন্দির উদ্বোধনের মাত্র কয়েক মাসের মধ্যেই এই পরাজয় বিজেপির জন্য বড় ধাক্কা হিসেবে দেখা হয়েছিল।

উত্তরপ্রদেশের ৮০টি লোকসভা আসনের মধ্যে ২০২৪ সালে বিজেপি ৩৬টি আসন পায়। সমাজবাদী পার্টি ৩৭টি এবং কংগ্রেস ছয়টি আসন জেতে। ফলে উত্তরপ্রদেশে বিজেপির একচ্ছত্র রাজনৈতিক আধিপত্যে বড় পরিবর্তনের ইঙ্গিত পাওয়া যায়।

তবে মন্দিরের দান চুরির অভিযোগ একাই ২০২৭ সালের নির্বাচনের ফল নির্ধারণ করবে—এমন সিদ্ধান্তে যাওয়ার কারণ নেই। ভোটারদের কাছে কর্মসংস্থান, মূল্যবৃদ্ধি, আইনশৃঙ্খলা, কৃষি, স্থানীয় উন্নয়নসহ আরও অনেক বিষয় গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু বিজেপির রাজনৈতিক পরিচয়ের সঙ্গে অযোধ্যা ও রামমন্দির এতটাই গভীরভাবে যুক্ত যে মন্দিরের অর্থ ব্যবস্থাপনা নিয়ে প্রশ্ন ওঠা দলটির জন্য নিঃসন্দেহে একটি অস্বস্তিকর রাজনৈতিক বিষয়।

রামমন্দিরের বর্তমান বিতর্কের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় সম্ভবত এখানেই।

তদন্তে চুরি ও অর্থ সরানোর অভিযোগের প্রাথমিক প্রমাণ পাওয়া গেছে। কয়েকজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে এবং অর্থ উদ্ধারও হয়েছে। কিন্তু একই সঙ্গে তদন্ত বলছে, মন্দির ট্রাস্টের শীর্ষ নেতৃত্বের বিরুদ্ধে সরাসরি অর্থ আত্মসাতের প্রমাণ এখন পর্যন্ত পাওয়া যায়নি। বরং নিয়োগ, নিরাপত্তা, হিসাব গণনা ও তদারকির ক্ষেত্রে বড় ধরনের প্রশাসনিক দুর্বলতা ছিল।

তাই এই মুহূর্তে ঘটনাটিকে দুটি স্তরে দেখা বেশি যুক্তিসঙ্গত—প্রথমত, ব্যক্তিগত পর্যায়ে অর্থ চুরির অভিযোগ; দ্বিতীয়ত, এমন চুরি সম্ভব করে দেওয়া ব্যবস্থাপনাগত ব্যর্থতা।

রাজনৈতিক বিতর্কের জায়গাটি দ্বিতীয় স্তরেই।

রামমন্দির শুধু একটি মন্দির নয়। এটি কোটি কোটি মানুষের ধর্মীয় আবেগের সঙ্গে যুক্ত এবং বিজেপির রাজনৈতিক ইতিহাসের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রতীক। ফলে মন্দিরের দান নিয়ে প্রশ্ন উঠলে তা শুধু হিসাবের খাতায় সীমাবদ্ধ থাকে না; তা আঘাত করে বিশ্বাস, আস্থা এবং রাজনৈতিক বিশ্বাসযোগ্যতার জায়গায়।

এ কারণেই তদন্ত শেষ হলেও রাজনৈতিক প্রশ্নটি থেকে যেতে পারে—যে প্রতিষ্ঠানকে এত বড় ধর্মীয় ও রাজনৈতিক প্রতীকে পরিণত করা হয়েছে, সেখানে ভক্তদের দেওয়া অর্থের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এত বড় ব্যবস্থাগত ব্যর্থতা হলো কীভাবে?

২০২৭ সালের উত্তরপ্রদেশের নির্বাচনে এই প্রশ্ন কতটা প্রভাব ফেলবে, তার উত্তর এখনই জানা সম্ভব নয়। তবে একটি বিষয় স্পষ্ট: অযোধ্যার রামমন্দির নিয়ে বিজেপির যে রাজনৈতিক গল্প এতদিন মূলত নির্মাণ ও সাফল্যের গল্প ছিল, দান চুরির অভিযোগ সেই গল্পে এখন জবাবদিহির একটি নতুন অধ্যায় যোগ করেছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *