মেট্রোরেলের ফার্স্ট ও লাস্ট মাইলের দুর্ভোগ কমাতে জোবাইকের সাইকেল সেবা

ঢাকা মেট্রোরেলের যাত্রীদের স্টেশন থেকে গন্তব্যে পৌঁছানো এবং গন্তব্য থেকে স্টেশনে আসার পথে—অর্থাৎ ফার্স্ট-মাইল ও লাস্ট-মাইল যাতায়াতের দুর্ভোগ কমাতে নতুন উদ্যোগ নিয়েছে অ্যাপভিত্তিক বাইসাইকেল শেয়ারিং প্ল্যাটফর্ম জোবাইক। ঢাকা মাস ট্রানজিট কোম্পানি লিমিটেডের (ডিএমটিসিএল) সঙ্গে চুক্তির আওতায় এমআরটি লাইন-৬-এর স্টেশনগুলোতে পর্যায়ক্রমে চালু হবে এই সেবা।

৬ই  আগস্ট ডিএমটিসিএল ও জোবাইকের মধ্যে আনুষ্ঠানিকভাবে এ সংক্রান্ত চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে। ডিএমটিসিএলের উন্মুক্ত দরপত্রে অংশ নিয়ে কার্যাদেশ পাওয়ার পর জোবাইক এ প্রকল্প বাস্তবায়নের দায়িত্ব পেয়েছে।

প্রথম ধাপে উত্তরা উত্তর, উত্তরা সেন্টার ও উত্তরা দক্ষিণ—মেট্রোরেলের এই তিন স্টেশনে ছয় মাসের পাইলট প্রকল্প চালু করা হবে। এ সময় ১৫০ থেকে ৩০০টি প্যাডেল বাইসাইকেল যাত্রীদের জন্য রাখা হবে। যাত্রীদের ব্যবহার ও চাহিদা পর্যালোচনা করে পরবর্তী সময়ে বাইসাইকেল ও পার্কিং হাবের সংখ্যা বাড়ানোর পরিকল্পনা রয়েছে।

পাইলট প্রকল্প সফল হলে এমআরটি লাইন-৬-এর অন্যান্য স্টেশনেও এই সেবা সম্প্রসারণ করা হবে।

মেট্রোরেল থেকে নেমে যেসব যাত্রী কাছাকাছি এলাকায় যাবেন, তাদের জন্য সেবাটি ব্যবহার করা হবে মূলত স্বল্প দূরত্বের যাতায়াতে। নির্ধারিত পার্কিং এলাকা অথবা কাছাকাছি জোবাইক হাবে থাকা বাইসাইকেল অ্যাপের মাধ্যমে ভাড়া নেওয়া যাবে।

এর জন্য প্রথমে জোবাইক অ্যাপ ব্যবহার করে বাইসাইকেলের কিউআর কোড স্ক্যান করতে হবে। এরপর বাইসাইকেলটি আনলক করে যাত্রা শুরু করা যাবে। গন্তব্যে পৌঁছানোর পর নির্ধারিত যেকোনো জোবাইক পার্কিং স্থানে বাইসাইকেল রেখে রাইড শেষ করা যাবে।

সেবাটির ভাড়াও তুলনামূলকভাবে কম রাখা হয়েছে। প্রতিটি রাইডে আনলকিং ফি দিতে হবে ২ টাকা। এর সঙ্গে প্রতি মিনিটের জন্য ভাড়া দিতে হবে ১ টাকা।

অর্থাৎ, ১০ মিনিটের একটি রাইডে আনলকিং ফিসহ মোট ভাড়া হবে ১২ টাকা।

উত্তরার বিভিন্ন আবাসিক এলাকা, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও কর্মস্থলের সঙ্গে মেট্রোরেল স্টেশনগুলোর সংযোগ তৈরিতে এই সেবা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

বিশেষ করে উত্তরা রাজউক অ্যাপার্টমেন্ট প্রজেক্ট (আরইউএপি) ও উত্তরা রূপায়ণ সিটির বাসিন্দারা মেট্রো স্টেশন থেকে নিজেদের এলাকায় যাতায়াতে এই সেবা ব্যবহার করতে পারবেন। একইভাবে মেট্রোরেল ডিপোর কর্মকর্তা-কর্মচারী এবং শান্ত-মারিয়াম ইউনিভার্সিটি অব ক্রিয়েটিভ টেকনোলজি, ওয়ার্ল্ড ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশ (ডব্লিউইউবি) ও বিজিএমইএ ইউনিভার্সিটি অব ফ্যাশন অ্যান্ড টেকনোলজির (বিইউএফটি) শিক্ষার্থীরাও এর সুবিধা পাবেন।

ঢাকার মতো ঘনবসতিপূর্ণ শহরে মেট্রোরেল দ্রুত ও নির্ভরযোগ্য গণপরিবহনের সুযোগ তৈরি করলেও স্টেশন থেকে যাত্রীর চূড়ান্ত গন্তব্য পর্যন্ত পৌঁছানোর ব্যবস্থা এখনো বড় চ্যালেঞ্জ। অনেক যাত্রীকে এ জন্য রিকশা, অটোরিকশা বা অন্যান্য যানবাহনের ওপর নির্ভর করতে হয়। স্বল্প দূরত্বের এসব যাত্রায় সাইকেল একটি বিকল্প তৈরি করতে পারে।

জোবাইকের প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) মেহেদী রেজা বলেন, প্রতিদিন প্রায় চার লাখ মানুষ মেট্রোরেলে যাতায়াত করেন। এত বিপুল সংখ্যক যাত্রীর জন্য স্টেশন থেকে গন্তব্যে পৌঁছানোর ফার্স্ট-মাইল ও লাস্ট-মাইল পরিবহনব্যবস্থা আরও শক্তিশালী করা প্রয়োজন।

তার ভাষায়, স্টেশন থেকে বের হওয়ার পর গন্তব্যে পৌঁছানোর ক্ষেত্রে রিকশার বাইরে পর্যাপ্ত বিকল্প নেই। সেখানে জোবাইকের সেবা স্বাস্থ্যকর, সুবিধাজনক ও সাশ্রয়ী পরিবহনের একটি বিকল্প হতে পারে।

জোবাইকের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, সাইকেল ব্যবহারের ফলে স্বল্প দূরত্বের যাত্রায় মোটরচালিত যানবাহনের ওপর নির্ভরতা কমানো সম্ভব। এতে যানজট ও কার্বন নিঃসরণ কমানোর পাশাপাশি যাত্রীদের দৈনন্দিন যাতায়াতে শারীরিক কর্মকাণ্ডের সুযোগও বাড়বে।

তবে এই উদ্যোগের সাফল্য নির্ভর করবে শুধু সাইকেলের সংখ্যা বা ভাড়ার ওপর নয়। স্টেশন এলাকায় নিরাপদ পার্কিং, সাইকেল চালানোর উপযোগী রাস্তা, পথচারীদের নিরাপত্তা এবং সাইকেল ব্যবহারের পর সহজে পার্ক করার সুযোগ—এসব বিষয়ও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।

প্রথম ছয় মাসের পাইলট প্রকল্প তাই শুধু একটি নতুন সাইকেল সেবা চালুর পরীক্ষা নয়; মেট্রোরেলকে শহরের অন্যান্য পরিবহনব্যবস্থার সঙ্গে কতটা কার্যকরভাবে যুক্ত করা যায়, সেটিও যাচাই করার একটি সুযোগ।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *