নয় বার তদন্ত, ১৫ মিনিটের আপিল: পরিবেশ আইন যখন ‘অপশনাল’

নারায়ণগঞ্জের নয়াপুরে মশার কয়েল কারখানার বিরুদ্ধে ৯ বার তদন্তে প্রমাণিত হয়েছে—এটা আবাসিক এলাকা। কিন্তু ১৫ মিনিটের আপিল শুনানিতে সেই সিদ্ধান্ত বদলে যাচ্ছে। এটা কি বিচার, নাকি প্রভাবশালীদের জন্য আইনের ‘ব্যাকডোর’?

সোমবার সকাল। জাতীয় প্রেসক্লাবে একটা সংবাদ সম্মেলন।

মঞ্চে বসেছেন শাহনাজ মুন্নী। সাংবাদিক, কথাসাহিত্যিক। ৩০ বছর ধরে অন্যের সংবাদ সম্মেলন কভার করেছেন।

কিন্তু আজ তিনি নিজেই মঞ্চে।

তার কথায়, “৩০ বছর সাংবাদিক হিসেবে অন্যের সংবাদ সম্মেলন কভার করলেও এবার পরিবেশ সন্ত্রাসের শিকার হয়ে নিজেকেই সংবাদ সম্মেলন করতে হচ্ছে।”

তার পাশে বসে আছেন নয়াপুর গ্রামের মসজিদের পক্ষ থেকে মো. মাইনুদ্দিন মোল্লা, মন্দিরের পক্ষ থেকে সাধন সাহা, এবং এলাকাবাসীর পক্ষ থেকে কবি ও পরিবেশসংগ্রামী শাহেদ কায়েস।

তাদের সবাই একটা বিষয়ে একমত—নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁ উপজেলার নয়াপুরে ‘শারমীন কেমিক্যাল ওয়ার্কস’ নামে একটি মশার কয়েল কারখানা স্থাপনের উদ্যোগ বন্ধ করতে হবে।

কিন্তু প্রশ্ন হলো—কেন?

“নয়াপুর গ্রাম। সোনারগাঁ উপজেলার একটা ঘনবসতিপূর্ণ আবাসিক এলাকা। এখানে মসজিদ আছে, মন্দির আছে, পাশাপাশি একটি মহিলা মাদ্রাসাও রয়েছে। হাজার হাজার পরিবারের বসবাস এই এলাকায়। শিশুরা স্কুলে যায়, বৃদ্ধরা মসজিদে নামাজ পড়েন—এক কথায়, এটি একটি পূর্ণাঙ্গ ও প্রাণবন্ত আবাসিক এলাকা।”

এখন এই এলাকায় যদি একটা মশার কয়েল কারখানা চালু হয়, তাহলে কী হবে?

কার্বন মনোক্সাইড, সালফার ডাই-অক্সাইড, ফরমালডিহাইড—এসব বিষাক্ত রাসায়নিক বাতাসে ছড়িয়ে পড়বে। শিশুরা অসুস্থ হবে। বৃদ্ধরা শ্বাসকষ্টে ভুগবেন। গর্ভবতী নারীদের সন্তানের স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়বে।

শাহনাজ মুন্নীর ভাষ্য, “কারখানাটি চালু হলে বিষাক্ত দূষণে এলাকায় বসবাস করা কঠিন হয়ে পড়বে।”

এলাকাবাসী চুপ করে থাকেনি। তারা পরিবেশ অধিদপ্তরে আবেদন করেছিল।

পরিবেশ অধিদপ্তরের প্রধান কার্যালয় ও শাখা কার্যালয় থেকে মোট নয়বার তদন্ত করা হয়।

প্রতিটি তদন্তে একই সিদ্ধান্ত—এলাকাটি আবাসিক। এখানে আইন অনুযায়ী মশার কয়েল কারখানা স্থাপন করা যাবে না।

দীর্ঘ তদন্ত শেষে পরিবেশ অধিদপ্তর কারখানাটির অবস্থানগত ছাড়পত্র বাতিল করে।

কিন্তু গল্প এখানেই শেষ হয়নি।

কারখানা কর্তৃপক্ষ আপিল করেছিল। আপিলের মাধ্যমে তারা ছাড়পত্র পেয়েছিল।

তারপর আবার তদন্ত হয়। আবার সেই ছাড়পত্র বাতিল করা হয়।

এখন আবার আপিলের মাধ্যমে অনুমোদনের চেষ্টা চলছে।  ৬ই  আগস্ট আপিল কর্তৃপক্ষের শুনানি।

শাহনাজ মুন্নীর প্রশ্ন, “পরিবেশ অধিদপ্তরের নয়বার তদন্ত ও বিস্তারিত অনুসন্ধানের ভিত্তিতে নেওয়া সিদ্ধান্ত মাত্র ১৫ মিনিটের শুনানিতে কীভাবে পরিবর্তন করা সম্ভব?”

এটাই কি বিচার?

নয় বার তদন্ত করে যে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়, সেটা ১৫ মিনিটের একটা শুনানিতে বাতিল হয়ে যায়?

শাহনাজ মুন্নী আরও একটা তথ্য তুলে ধরেন।

একই এলাকায় এর আগে ‘ইমাম পোলট্রি ফার্ম’ পরিবেশ আইনের আওতায় বন্ধ করা হয়েছিল। বিষয়টি উচ্চ আদালত পর্যন্ত গড়িয়েছিল।

সেই প্রেক্ষাপটে সেখানে আরও বেশি দূষণকারী কয়েল কারখানা স্থাপনের উদ্যোগ আদালতের সিদ্ধান্তের পরিপন্থী বলে তিনি দাবি করেন।

অর্থাৎ, একটা পোলট্রি ফার্ম বন্ধ করার পর সেই জায়গায় আরও বিষাক্ত কারখানা?

এটা কি যুক্তিসঙ্গত?

শাহনাজ মুন্নীর অভিযোগ, এ ধরনের আপিল ব্যবস্থার সুযোগ নিয়ে প্রভাবশালী মহল পরিবেশগত ছাড়পত্র আদায় করছে।

তার ভাষ্য, “একটা কারখানা যদি পরিবেশ অধিদপ্তরের তদন্তে বাতিল হয়, তাহলে তারা আপিল করে। আপিল বোর্ডে হয়তো ১৫ মিনিটের শুনানি হয়। আর সেই শুনানিতে সব বদলে যায়।”

এটা কি সুশাসন?

নাকি এটা প্রভাবশালীদের জন্য আইনের ‘ব্যাকডোর’ বা পেছনের দরজা?

সংবাদ সম্মেলনে শাহনাজ মুন্নী তিনটি সুনির্দিষ্ট দাবি তুলে ধরেন।

প্রথমত, প্রস্তাবিত কয়েল কারখানাটিকে পুনরায় পরিবেশগত ছাড়পত্র না দেওয়া।

দ্বিতীয়ত, বাংলাদেশ পরিবেশ সংরক্ষণ আইন, ১৯৯৫ সংশোধন করে পরিবেশ অধিদপ্তরকে স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানে রূপান্তর করা। এবং মন্ত্রণালয়ের আপিল বোর্ড বাতিল করে পরিবেশ আদালতে আপিলের ব্যবস্থা চালু করা।

তৃতীয়ত, পরিবেশ অধিদপ্তরের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ‘শারমীন কেমিক্যাল ওয়ার্কস’-এর ছাড়পত্র আবেদন নামঞ্জুর করা।

৬ আগস্ট আপিল কর্তৃপক্ষের শুনানি।

সেই শুনানিতে কী সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে, তা এখনো জানা নেই।

কিন্তু একটা বিষয় নিশ্চিত—নয়াপুরের শিশুরা, বৃদ্ধরা, নারীরা অপেক্ষা করছেন। তারা জানতে চান, তারা কী শ্বাস নেবেন?

পরিবেশ অধিদপ্তর নয় বার তদন্ত করে বলেছে—এখানে কারখানা হবে না।

কিন্তু ১৫ মিনিটের আপিল শুনানি সেই সিদ্ধান্ত বদলে দিতে পারে?

এটা কি বাংলাদেশের পরিবেশ আইনের বাস্তবতা?

নাকি এটা প্রমাণ করে যে, প্রভাবশালী হলে আইন আপনার জন্য ‘অপশনাল’ হয়ে যায়?

শাহনাজ মুন্নী ৩০ বছর ধরে অন্যের সংবাদ সম্মেলন কভার করেছেন। আজ তিনি নিজেই মঞ্চে।

কিন্তু তার এই সংগ্রাম শুধু তার একার নয়। এটা নয়াপুরের হাজার হাজার পরিবারের সংগ্রাম।

আর এই সংগ্রামের ফলাফল নির্ভর করছে ৬ই  আগস্টের ওই ১৫ মিনিটের শুনানির ওপর।

নয়টি তদন্তের সত্য কি মাত্র ১৫ মিনিটের একটা শুনানিতে বাতিল হয়ে যাবে, আর নয়াপুরের শিশুরা বিষাক্ত বাতাসে শ্বাস নিতে বাধ্য হবে?”

নাকি আইন তাদের রক্ষা করবে?

৬ই  আগস্ট এর উত্তর মিলবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *