রাশিয়ার ভোরোনেজ শহর। সেখানে উচ্চশিক্ষার জন্য অবস্থান করছেন বাংলাদেশসহ বিভিন্ন দেশের শিক্ষার্থীরা। এই আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থী কমিউনিটির মধ্যেই এখন ঘুরছে একটি গুরুতর আর্থিক অভিযোগ।
অভিযোগের কেন্দ্রে রয়েছেন বাংলাদেশি দুই শিক্ষার্থী মো. মিনহাজুল ইসলাম হৃদয় ও তাঁর স্ত্রী মোছা. রাবিয়া খাতুন। তাঁরা ভোরোনেজ স্টেট ইউনিভার্সিটি অব ফরেস্ট্রি অ্যান্ড টেকনোলজিস—VSUFT-এর শিক্ষার্থী বলে বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের বিভিন্ন অনলাইন কমিউনিটিতে উল্লেখ করা হয়েছে।
অভিযোগকারীদের দাবি, রাশিয়ায় ব্যাংকিং সীমাবদ্ধতা ও নিষেধাজ্ঞাজনিত জটিলতার কারণে তাঁরা ওই দুজনের মাধ্যমে অর্থ স্থানান্তর করতেন। এভাবে বিভিন্ন সময়ে একাধিক শিক্ষার্থীর কাছ থেকে অর্থ নেওয়া হয়।
অভিযোগ অনুযায়ী, সেই অর্থের একটি বড় অংশ পরবর্তীতে নির্ধারিত গন্তব্যে পৌঁছায়নি। অনেক শিক্ষার্থী তাঁদের অর্থ ফেরতও পাননি।
সব মিলিয়ে অর্থের পরিমাণ প্রায় ৩৫ মিলিয়ন রুশ রুবল। যা বাংলাদেশী টাকায় পাঁচ কোটি ষাট লাখ প্রায়।
তবে এটি কোনো একক লেনদেনের অর্থ নয়।
বিশ্ববিদ্যালয়ের পক্ষ থেকে প্রকাশিত এক বিবৃতিতে বলা হয়েছে, ৩৫ মিলিয়ন রুবল হলো বিভিন্ন শিক্ষার্থীর কাছ থেকে বিভিন্ন সময়ে করা একাধিক লেনদেনের সম্মিলিত পরিমাণ।
বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রকাশিত বিবৃতিতে বলা হয়েছে, রাশিয়ার ওপর থাকা ব্যাংকিং নিষেধাজ্ঞা ও আর্থিক বিধিনিষেধের কারণে অনেক বাংলাদেশি শিক্ষার্থী অর্থ স্থানান্তরের জন্য এসব ব্যক্তিকে মধ্যস্থতাকারী হিসেবে ব্যবহার করতেন।
বিবৃতিতে ব্যবস্থাটিকে অনানুষ্ঠানিক হুন্ডি/হাওয়ালা ধরনের ব্যবস্থা হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে।
অর্থাৎ শিক্ষার্থীরা সরাসরি প্রচলিত ব্যাংকিং চ্যানেল ব্যবহার করতে না পেরে পরিচিত ব্যক্তির মাধ্যমে অর্থ পাঠানোর ওপর নির্ভর করতেন।
এই ব্যবস্থায় ব্যক্তিগত বিশ্বাসই ছিল মূল ভিত্তি।
আর সেই বিশ্বাসের সুযোগ নেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
প্রাথমিকভাবে ৩৫ মিলিয়ন রুবেলের অভিযোগটি শুনলে মনে হতে পারে, কোনো একটি ঘটনায় এত বিপুল অর্থ নেওয়া হয়েছে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের বিবৃতি সেই ধারণা পরিষ্কার করেছে।
৩৫ মিলিয়ন রুবল কোনো একক ট্রান্সফারের অর্থ নয়। এটি বিভিন্ন শিক্ষার্থীর করা একাধিক লেনদেনের সম্মিলিত অঙ্ক।
অর্থাৎ প্রকৃত ঘটনা জানতে হলে প্রতিটি লেনদেন আলাদাভাবে যাচাই করতে হবে।
কে কত টাকা দিয়েছেন? কবে দিয়েছেন? কোন মাধ্যমে দিয়েছেন? কার অ্যাকাউন্টে দিয়েছেন? কী উদ্দেশ্যে দিয়েছেন? সেই অর্থ কোথায় যাওয়ার কথা ছিল? এবং শেষ পর্যন্ত কোথায় গেছে?
এই প্রশ্নগুলোর উত্তরই এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
ক্ষতিগ্রস্ত শিক্ষার্থীদের অভিযোগ অনুযায়ী, অর্থ গ্রহণের পর নির্ধারিত লেনদেন সম্পন্ন হয়নি।
পরবর্তীতে তাঁরা অর্থ ফেরত চাইলেও টাকা ফেরত পাননি বলে অনেকে অভিযোগ করেছেন।
একপর্যায়ে মিনহাজুল ইসলাম হৃদয় ও রাবিয়া খাতুন তাদের সঙ্গে যোগাযোগও বন্ধ করে দেন বলে অভিযোগকারীরা জানিয়েছেন।
বিশ্ববিদ্যালয়ের বিবৃতিতে-এও বলা হয়েছে, ক্ষতিগ্রস্ত শিক্ষার্থীদের অভিযোগ অনুযায়ী সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা তাঁদের ওপর রাখা আস্থার সুযোগ নিয়েছেন এবং অর্থ নিজেদের কাছে রেখে পরবর্তীতে যোগাযোগের বাইরে চলে গেছেন।
এ ধরনের ঘটনায় অভিযোগের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ হতে পারে আর্থিক লেনদেনের নথি।
প্রতিটি শিক্ষার্থীর ব্যাংক স্টেটমেন্ট। ট্রান্সফারের রসিদ। মোবাইল ব্যাংকিং বা ডিজিটাল পেমেন্টের রেকর্ড। হোয়াটসঅ্যাপ, মেসেঞ্জার বা অন্য কোনো মাধ্যমে করা কথোপকথন। টাকা গ্রহণের স্বীকৃতি। এবং টাকা ফেরত দেওয়ার প্রতিশ্রুতি।
এসব নথি একত্র করা গেলে ৩৫ মিলিয়ন রুবেলের দাবিটি কতটা সঠিক, তা যাচাই করা সম্ভব।
একই সঙ্গে বের করা সম্ভব হবে মোট কতজন শিক্ষার্থী এই লেনদেনের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন।
এই ঘটনার ক্ষেত্রে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রকাশিত বিবৃতিটি বিশেষ গুরুত্ব বহন করছে।
কারণ এটি শুধু সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া অভিযোগ নয়। বিশ্ববিদ্যালয় নিজেই বিষয়টি নিয়ে একটি ব্যাখ্যা প্রকাশ করেছে।
তবে বিশ্ববিদ্যালয়ও অর্থের চূড়ান্ত পরিমাণ নিশ্চিত করেনি।
বরং তাদের বক্তব্যে বলা হয়েছে, উল্লেখিত অর্থের পরিমাণ ও লেনদেনগুলো যাচাই করা প্রয়োজন।
এতে বোঝা যায়, ৩৫ মিলিয়ন রুবলের অঙ্কটি এখনো একটি রিপোর্টেড বা অভিযোগভিত্তিক হিসাব।
চূড়ান্ত আর্থিক হিসাব নির্ধারণের জন্য প্রয়োজন আনুষ্ঠানিক তদন্ত।
এই ঘটনার সবচেয়ে বড় প্রশ্ন এখানেই।
যদি শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে বিভিন্ন সময়ে মোট ৩৫ মিলিয়ন রুবল নেওয়া হয়ে থাকে, তাহলে সেই অর্থের পরবর্তী গতিপথ কী?
অর্থ কি কোনো ব্যাংক অ্যাকাউন্টে জমা হয়েছিল? সেখান থেকে অন্য অ্যাকাউন্টে পাঠানো হয়েছিল? নগদে তোলা হয়েছিল? বাংলাদেশে পাঠানো হয়েছিল? নাকি অন্য কোনো ব্যক্তির মাধ্যমে স্থানান্তর করা হয়েছিল?
আর্থিক লেনদেনের রেকর্ড বিশ্লেষণ ছাড়া এসব প্রশ্নের উত্তর পাওয়া সম্ভব নয়।
আরেকটি বড় প্রশ্ন ক্ষতিগ্রস্ত শিক্ষার্থীর সংখ্যা নিয়ে।
এখন পর্যন্ত প্রকাশ্য তথ্যের ভিত্তিতে নির্দিষ্ট করে বলা যাচ্ছে না, মোট কতজন বাংলাদেশি শিক্ষার্থী এই ঘটনায় অর্থ হারিয়েছেন।
৩৫ মিলিয়ন রুবল যেহেতু বহু শিক্ষার্থীর একাধিক লেনদেনের সম্মিলিত অঙ্ক বলে বিশ্ববিদ্যালয় জানিয়েছে, তাই ক্ষতিগ্রস্তের সংখ্যা এক বা দুজনের মধ্যে সীমাবদ্ধ হওয়ার কথা নয়।
প্রতিটি অভিযোগ আলাদাভাবে যাচাই করা প্রয়োজন।
VSUFT-এ বিপুলসংখ্যক আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থী পড়াশোনা করেন। ফলে বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের মধ্যে বড় ধরনের আর্থিক বিরোধ তৈরি হলে বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্যও বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ।
বিশ্ববিদ্যালয় চাইলে ক্ষতিগ্রস্ত শিক্ষার্থীদের অভিযোগ গ্রহণের জন্য একটি নির্দিষ্ট ব্যবস্থা করতে পারে।
অভিযোগকারীদের নথি সংরক্ষণে সহায়তা করতে পারে।
প্রয়োজনে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগের পথ দেখাতে পারে।
তবে অর্থ আত্মসাৎ বা প্রতারণার মতো কোনো অপরাধ সংঘটিত হয়েছে কি না, সেটি নির্ধারণের এখতিয়ার সংশ্লিষ্ট আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী ও বিচারিক কর্তৃপক্ষের।
এই অনুসন্ধানের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ এখনো বাকি।
মো. মিনহাজুল ইসলাম হৃদয় এবং মোছা. রাবিয়া খাতুনের বক্তব্য।
তাঁরা কেন শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে অর্থ নিয়েছিলেন? কত টাকা তাঁদের কাছে এসেছিল? কোন কোন শিক্ষার্থীর কাছ থেকে টাকা নেওয়া হয়েছিল? কোন ব্যাংক বা আর্থিক চ্যানেলের মাধ্যমে অর্থ স্থানান্তর করা হয়েছিল? লেনদেন সম্পন্ন না হওয়ার কারণ কী? অর্থ ফেরত দেওয়া হয়নি কেন? এবং বর্তমানে সেই অর্থ কোথায়?
এই প্রশ্নগুলোর উত্তর তাঁদের কাছ থেকেই পাওয়া প্রয়োজন।
এই ঘটনার সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ শিক্ষা অন্য বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের জন্য।
রাশিয়ায় ব্যাংকিং নিষেধাজ্ঞা ও সীমাবদ্ধতার কারণে অনানুষ্ঠানিক আর্থিক মধ্যস্থতার ওপর নির্ভরতা তৈরি হয়ে থাকলে সেখানে বড় ধরনের ঝুঁকিও রয়েছে।
ব্যক্তিগত পরিচয় বা বন্ধুত্বের ভিত্তিতে বড় অঙ্কের অর্থ হস্তান্তর করা নিরাপদ নয়। সম্ভব হলে বৈধ ও অনুমোদিত আর্থিক চ্যানেল ব্যবহার করতে হবে।
এই মুহূর্তে ঘটনাটির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—৩৫ মিলিয়ন রুবলের দাবিটি নথিপত্র দিয়ে যাচাই করা।
বিশ্ববিদ্যালয় জানিয়েছে, এই অঙ্ক বহু শিক্ষার্থীর বিভিন্ন সময়ের লেনদেনের সম্মিলিত হিসাব।
ক্ষতিগ্রস্ত শিক্ষার্থীরা বলছেন, অর্থ দেওয়ার পর তাঁরা তাঁদের টাকা ফেরত পাননি।
অভিযোগের কেন্দ্রে থাকা দুই ব্যক্তির বিরুদ্ধে কী ঘটেছে, তার পূর্ণাঙ্গ ব্যাখ্যাও এখনো প্রকাশ্যে পাওয়া যায়নি।
ফলে প্রশ্নগুলো রয়ে গেছে।
কত টাকা নেওয়া হয়েছিল? কার কাছ থেকে নেওয়া হয়েছিল? কোথায় স্থানান্তর করা হয়েছিল? কেন লেনদেন সম্পন্ন হয়নি?৩৫ মিলিয়ন রুবেলের কত অংশ এখনো উদ্ধার করা সম্ভব?
এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন—বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের সেই টাকা এখন কোথায়?
এই প্রশ্নের উত্তর বের করতে প্রয়োজন ব্যাংকিং নথি, ডিজিটাল প্রমাণ, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্য এবং রাশিয়ার আইন অনুযায়ী একটি পূর্ণাঙ্গ তদন্ত।