তালেবান নৃশংস, তবু তাদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখতেই হবে: ইকোনমিস্টের যুক্তি

আফগানিস্তান থেকে মার্কিন সেনা প্রত্যাহারের পাঁচ বছর পূর্ণ হয়েছে। ২০২১ সালের আগস্টে তালেবান কাবুলের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার পর যে প্রশ্নটি সামনে এসেছিল—এই সরকার কত দিন টিকবে—তার উত্তর এখন অনেকটাই স্পষ্ট। তালেবান ক্ষমতায় আছে এবং নিকট ভবিষ্যতে তাদের সরে যাওয়ারও কোনো লক্ষণ নেই।

এই বাস্তবতার মধ্যেই তালেবানের সঙ্গে পশ্চিমা বিশ্বের সম্পর্ক কী হওয়া উচিত, তা নিয়ে নতুন করে বিতর্ক তৈরি হয়েছে। ১৩ই  আগস্ট প্রকাশিত এক সম্পাদকীয়তে ব্রিটিশ সাময়িকী দ্য ইকোনমিস্ট যুক্তি দিয়েছে, তালেবানের শাসনব্যবস্থা নৃশংস ও নৈতিকভাবে অগ্রহণযোগ্য হলেও গণতান্ত্রিক দেশগুলোর তাদের সঙ্গে যোগাযোগ বজায় রাখা উচিত।

ইকোনমিস্টের মূল যুক্তি হলো—তালেবানকে পছন্দ করা বা তাদের শাসনকে বৈধতা দেওয়া নয়; বরং আফগানিস্তানের বাস্তবতা বিবেচনায় নিয়ে প্রয়োজনীয় কূটনৈতিক ও প্রাতিষ্ঠানিক যোগাযোগ চালু রাখা।

পাঁচ বছর পরও তালেবানই আফগানিস্তানের বাস্তব ক্ষমতাকেন্দ্র

মার্কিন ও ন্যাটো বাহিনী প্রত্যাহারের পর তালেবান যে দ্রুত কাবুলের নিয়ন্ত্রণ নেয়, তা আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে বড় পরিবর্তন ঘটায়। পাঁচ বছর পরও সেই ক্ষমতার কাঠামো ভেঙে পড়েনি।

বরং তালেবান প্রশাসন রাষ্ট্র পরিচালনা করছে, সীমান্ত ও নিরাপত্তা ব্যবস্থার নিয়ন্ত্রণ ধরে রেখেছে এবং প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে বিভিন্ন পর্যায়ে যোগাযোগ বাড়িয়েছে। ফলে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সামনে এখন প্রশ্নটি আর শুধু ‘তালেবানকে স্বীকৃতি দেওয়া হবে কি না’—এতে সীমাবদ্ধ নেই। প্রশ্ন হলো, তাদের নিয়ন্ত্রণাধীন একটি দেশের সঙ্গে কীভাবে বাস্তবসম্মতভাবে কাজ করা যায়।

আফগানিস্তানে নিরাপত্তা পরিস্থিতির কিছু দিক ২০২১ সালের আগের দীর্ঘ যুদ্ধপর্বের তুলনায় স্থিতিশীল হয়েছে—তবে এর অর্থ এই নয় যে দেশটি সংকটমুক্ত। জাতিসংঘ এখনও আফগানিস্তানকে গভীর মানবিক, অর্থনৈতিক ও মানবাধিকার সংকটে থাকা দেশ হিসেবে বিবেচনা করছে।

নৈতিক আপত্তি থাকলেও সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্নতা কি সমাধান?

তালেবান শাসনের সবচেয়ে বড় সমালোচনার জায়গা নারী ও মেয়েদের অধিকার।

মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা থেকে মেয়েদের বাদ দেওয়া, নারীদের কর্মসংস্থান ও চলাচলের ওপর কঠোর বিধিনিষেধ এবং জনজীবন থেকে নারীদের ক্রমাগত দূরে সরিয়ে দেওয়ার নীতি নিয়ে জাতিসংঘ দীর্ঘদিন ধরে তীব্র আপত্তি জানিয়ে আসছে। ২০২৬ সালের জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী, মেয়েদের শিক্ষা ও নারীদের কর্মসংস্থানের ওপর নিষেধাজ্ঞা অব্যাহত থাকলে আগামী কয়েক বছরে দেশটি বিপুলসংখ্যক নারী শিক্ষক ও স্বাস্থ্যকর্মী হারাতে পারে।

সাম্প্রতিক জাতিসংঘের মূল্যায়নেও বলা হয়েছে, তালেবানের নীতির কারণে নারী ও মেয়েরা শিক্ষা, কর্মসংস্থান, জনজীবন ও মৌলিক স্বাধীনতা থেকে ব্যাপকভাবে বঞ্চিত হচ্ছেন।

অতএব তালেবানের সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রে গণতান্ত্রিক দেশগুলোর নৈতিক আপত্তি থাকার যথেষ্ট কারণ রয়েছে।

কিন্তু ইকোনমিস্টের প্রশ্ন হলো—এই আপত্তির কারণে যদি পশ্চিমা দেশগুলো সম্পূর্ণভাবে আফগানিস্তান থেকে দূরে সরে যায়, তাহলে কি পরিস্থিতির উন্নতি হবে?

চীন-রাশিয়াসহ আঞ্চলিক শক্তির সঙ্গে তালেবানের যোগাযোগ

কূটনৈতিক শূন্যস্থান সাধারণত দীর্ঘদিন খালি থাকে না। পশ্চিমা দেশগুলো যদি তালেবানের সঙ্গে কোনো ধরনের যোগাযোগই না রাখে, তাহলে আফগানিস্তানে প্রভাব বিস্তারের সুযোগ অন্য শক্তিগুলো গ্রহণ করতে পারে।

রাশিয়া ইতোমধ্যে তালেবানের সঙ্গে সম্পর্ককে আরও গভীর করেছে। ২০২৬ সালের মে মাসে মস্কো তালেবান সরকারের সঙ্গে ‘পূর্ণাঙ্গ অংশীদারত্ব’ গড়ে তোলার কথা জানিয়েছিল এবং নিরাপত্তা, বাণিজ্য, সংস্কৃতি ও মানবিক সহায়তাসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে সহযোগিতার কথা বলেছিল।

জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদও আফগানিস্তান নিয়ে কাজ করার ক্ষেত্রে বাস্তবভিত্তিক সম্পৃক্ততার প্রয়োজনীয়তা নিয়ে আলোচনা অব্যাহত রেখেছে। জুন ২০২৬-এ পরিষদ আফগানিস্তানে জাতিসংঘের মিশনের মেয়াদ আরও এক বছর বাড়ায়।

অর্থাৎ তালেবানকে এড়িয়ে যাওয়ার নীতি বাস্তবে আফগানিস্তানের সঙ্গে আন্তর্জাতিক যোগাযোগ বন্ধ করছে না; বরং সেই যোগাযোগের বড় অংশ অন্য শক্তির হাতে চলে যাওয়ার সম্ভাবনা তৈরি করছে।

যোগাযোগ মানেই স্বীকৃতি নয়

এখানেই ইকোনমিস্টের যুক্তির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিকটি রয়েছে।

তালেবানের সঙ্গে কথা বলা এবং তালেবান সরকারকে আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকৃতি দেওয়া—দুটি এক বিষয় নয়।

শর্তসাপেক্ষ যোগাযোগের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় মানবিক সহায়তা পৌঁছানো, বন্দিদের বিষয়ে আলোচনা, সন্ত্রাসবাদ মোকাবিলা, সীমান্ত নিরাপত্তা এবং অর্থনৈতিক সংকটের মতো বিষয়ে কাজ করতে পারে।

জাতিসংঘের ২০২৫ সালের আফগানিস্তান বিষয়ক বার্ষিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আন্তর্জাতিক সহায়তা কমে গেলেও সংস্থাটি দেশটিতে স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা, জীবিকা ও অন্যান্য মৌলিক মানবিক কার্যক্রম চালিয়ে গেছে। ২০২৫ সালে জাতিসংঘ ও অংশীদাররা কোটি কোটি মানুষের কাছে বিভিন্ন সেবা পৌঁছে দেয়।

এই কাজগুলো করতে হলে তালেবানের নিয়ন্ত্রিত বাস্তবতার সঙ্গে কোনো না কোনো পর্যায়ে যোগাযোগ প্রয়োজন।

অন্যদিকে যোগাযোগের অর্থ এই নয় যে নারী অধিকার, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা বা মানবাধিকারের প্রশ্নে আপস করতে হবে। বরং যোগাযোগকে চাপ প্রয়োগের একটি মাধ্যম হিসেবেও ব্যবহার করা যেতে পারে।

আফগান জনগণের স্বার্থই হওয়া উচিত কেন্দ্রবিন্দু

তালেবানের সঙ্গে সম্পর্কের বিতর্কে একটি বিষয় প্রায়ই আড়ালে পড়ে যায়—আফগানিস্তানের সাধারণ মানুষ।

তালেবান সরকারের নীতির সমালোচনা করা এক বিষয়; আর সেই সরকারের কারণে সাধারণ আফগান জনগণের ওপর আরও কঠোর অর্থনৈতিক ও মানবিক চাপ তৈরি করা আরেক বিষয়।

জাতিসংঘের সাম্প্রতিক মূল্যায়নগুলো দেখাচ্ছে, দেশটির মানবিক পরিস্থিতি এখনও অত্যন্ত নাজুক। একই সঙ্গে নারী ও মেয়েদের ওপর নিষেধাজ্ঞা দেশটির সামাজিক ও অর্থনৈতিক সক্ষমতাকেও ক্ষতিগ্রস্ত করছে।

ফলে নীতিগত অবস্থান হতে পারে—তালেবানের দমনমূলক নীতির বিরোধিতা করা, মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিরুদ্ধে চাপ অব্যাহত রাখা এবং একই সঙ্গে প্রয়োজনীয় জায়গায় তাদের সঙ্গে কথা বলা।

এটি সহজ কোনো নীতি নয়। বরং আদর্শবাদ ও বাস্তববাদের মাঝখানে অত্যন্ত কঠিন একটি ভারসাম্য।

তালেবানকে স্বীকৃতি না দিয়েও তাদের সঙ্গে কথা বলা যায়। মানবাধিকার প্রশ্নে আপসহীন থেকেও মানবিক সহায়তা নিশ্চিত করা যায়। নারী ও মেয়েদের অধিকার পুনঃপ্রতিষ্ঠার দাবি জানিয়ে একই সঙ্গে নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক বিষয়ে আলোচনা করা যায়।

ইকোনমিস্টের যুক্তির মূল কথা তাই তালেবানকে সমর্থন করা নয়; বরং আফগানিস্তানের বাস্তব ক্ষমতার কাঠামোকে উপেক্ষা না করা।

কারণ কূটনীতিতে কখনও কখনও প্রশ্নটি ‘কার সঙ্গে কথা বলতে চাই’ নয়—বরং ‘কার সঙ্গে কথা বলা প্রয়োজন’।

আর আফগানিস্তানের ক্ষেত্রে সেই প্রয়োজনীয়তা এখনো শেষ হয়ে যায়নি।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *