নিরাপদ অভিবাসনে জোর, দক্ষতা বাড়ানো ও শ্রমবাজার বহুমুখীকরণের আহ্বান

নিরাপদ ও নিয়মিত অভিবাসনের পথ সম্প্রসারণ, বিদেশি শ্রমবাজারের চাহিদা অনুযায়ী কর্মীদের দক্ষতা উন্নয়ন এবং মানবপাচার ও প্রতারণা ঠেকাতে দেশের ভেতরেই কার্যকর ব্যবস্থা গড়ে তোলার ওপর গুরুত্ব দিয়েছে বাংলাদেশ।

এ লক্ষ্যে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের আয়োজনে নিরাপদ, নিয়মিত ও নিয়মতান্ত্রিক অভিবাসন নিশ্চিত করা এবং দেশের অভিবাসন ব্যবস্থাপনাকে আরও শক্তিশালী করার বিষয়ে একটি মতবিনিময় সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে। সভায় পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলাম, এমপির সভাপতিত্বে প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান প্রতিমন্ত্রী মো. নুরুল হক, এমপি এবং প্রধানমন্ত্রীর প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় বিষয়ক উপদেষ্টা মাহ্‌দী আমিন বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন।

সভায় পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী বলেন, বিশ্বে অভিবাসন বিষয়ে বাংলাদেশের নেতৃত্ব ও আন্তর্জাতিক অঙ্গীকারের সঙ্গে জাতীয় নীতি এবং মাঠপর্যায়ের বাস্তবতার কার্যকর সমন্বয় প্রয়োজন। তাঁর মতে, কাগজে থাকা নীতি ও পরিকল্পনার পাশাপাশি অভিবাসনপ্রবণ এলাকাগুলোর বাস্তব পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়েই ভবিষ্যৎ নীতি নির্ধারণ করতে হবে।

বিশ্বের শ্রমবাজার দ্রুত পরিবর্তিত হচ্ছে। নতুন নতুন দেশে কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হওয়ার পাশাপাশি বিভিন্ন পেশায় কর্মীদের দক্ষতা ও যোগ্যতার চাহিদাও বদলাচ্ছে। এই পরিবর্তনের সঙ্গে তাল মিলিয়ে বাংলাদেশ থেকে বিদেশে যেতে আগ্রহী কর্মীদের কারিগরি ও ভাষাগত দক্ষতা বাড়ানোর ওপর জোর দেন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী।

তিনি দেশের বিভিন্ন জেলার কারিগরি প্রশিক্ষণ কেন্দ্র বা টিটিসিগুলোর সক্ষমতা বাড়ানো এবং প্রশিক্ষণ কারিকুলাম আধুনিকায়নের প্রয়োজনীয়তার কথা তুলে ধরেন। বিদেশি শ্রমবাজারের চাহিদা অনুযায়ী প্রশিক্ষণ দেওয়া গেলে বাংলাদেশি কর্মীদের জন্য আরও বেশি নিয়মিত কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হতে পারে বলে আলোচনায় গুরুত্ব দেওয়া হয়।

সভায় বাংলাদেশের বৈদেশিক শ্রমবাজারকে কয়েকটি নির্দিষ্ট দেশের ওপর নির্ভরশীল না রেখে আরও বহুমুখী করার বিষয়েও গুরুত্ব দেওয়া হয়। একই সঙ্গে বৈধ ও নিয়মিত অভিবাসনের সুযোগ বাড়ানোর ওপর জোর দেওয়া হয়, যাতে বিদেশে যেতে ইচ্ছুক মানুষ দালাল বা অনিয়মিত পথের ওপর নির্ভর করতে বাধ্য না হন।

পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী তাঁর নির্বাচনী এলাকার অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরে অনিয়মিত অভিবাসন, মানবপাচার, অভিবাসী চোরাচালান এবং ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে প্রতারণার বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, বিদেশে গিয়ে অভিবাসীদের সুরক্ষা নিশ্চিত করার পাশাপাশি দেশ ছাড়ার আগেই তাঁদের সুরক্ষার জন্য কার্যকর ব্যবস্থা তৈরি করতে হবে।

তাঁর ভাষায়, “দেশের অভ্যন্তরে কার্যকর প্রতিরোধ ব্যবস্থা দিয়েই বিদেশে অভিবাসীদের সুরক্ষা নিশ্চিত করা সম্ভব।”

বিশেষ করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও অন্যান্য ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে বিদেশে চাকরির প্রলোভন দেখিয়ে প্রতারণা এবং মানবপাচারের ঝুঁকি বাড়ছে বলে সভায় গুরুত্ব দেওয়া হয়। এসব ঝুঁকি মোকাবিলায় সরকারি প্রতিষ্ঠান, স্থানীয় প্রশাসন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, আন্তর্জাতিক সংস্থা এবং বেসরকারি অংশীজনদের মধ্যে সমন্বয় বাড়ানোর প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরা হয়।

পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী অভিবাসন ব্যবস্থাপনায় ‘হোল অফ গভর্ণমেন্ট’ এবং ‘হোল অফ সোসাইটি’ পদ্ধতি অনুসরণের আহ্বান জানান। অর্থাৎ শুধু একটি মন্ত্রণালয় বা সরকারি সংস্থার মাধ্যমে নয়, সরকারের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান এবং সমাজের সংশ্লিষ্ট সব পক্ষকে একসঙ্গে কাজ করার মাধ্যমে অভিবাসন ব্যবস্থাপনাকে আধুনিক, সমন্বিত ও অভিবাসীদের অধিকারভিত্তিক করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়।

সভায় বিদেশে অবস্থিত বাংলাদেশের মিশনগুলো থেকে পাওয়া বিভিন্ন শ্রমবাজারের তথ্যও তুলে ধরা হয়। কোন দেশে কী ধরনের কর্মীর চাহিদা রয়েছে, কর্মী নিয়োগের ক্ষেত্রে গন্তব্য দেশগুলোর কী শর্ত রয়েছে এবং নিয়মিত অভিবাসনের জন্য কী কী সুযোগ তৈরি হচ্ছে—এসব তথ্য অভিবাসনপ্রবণ জেলার জেলা প্রশাসকদের অবহিত করা হয়।

এ ধরনের তথ্য স্থানীয় পর্যায়ে পৌঁছে দিতে পারলে বিদেশে যেতে ইচ্ছুক কর্মীরা আরও বাস্তবসম্মত সিদ্ধান্ত নিতে পারবেন এবং দালাল বা অননুমোদিত মধ্যস্থতাকারীদের ওপর নির্ভরতা কমতে পারে বলে সভার আলোচনায় উঠে আসে।

সভায় আরও গুরুত্ব দেওয়া হয় মাঠপর্যায়ের তথ্যকে জাতীয় নীতিনির্ধারণের সঙ্গে যুক্ত করার ওপর। অভিবাসনপ্রবণ এলাকাগুলোর বাস্তব অভিজ্ঞতা, বিদেশে কর্মসংস্থানের পরিবর্তিত চাহিদা এবং অভিবাসীদের সমস্যার তথ্য একত্র করে বাংলাদেশের কূটনৈতিক উদ্যোগকে আরও কার্যকর করার প্রয়োজনীয়তার কথা বলা হয়।

সভায় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় এবং স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা অংশ নেন। বাংলাদেশ ওভারসিজ এমপ্লয়মেন্ট অ্যান্ড সার্ভিসেস লিমিটেড—বোয়েসেলের প্রতিনিধি, আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থার (IOM) ঢাকাস্থ মিশন প্রধান এবং অন্যান্য সংশ্লিষ্ট অংশীজনও এতে অংশগ্রহণ করেন।

এ ছাড়া অভিবাসনপ্রবণ ১৪ জেলার জেলা প্রশাসকরা সভায় যুক্ত ছিলেন। জেলাগুলো হলো—কুমিল্লা, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, টাঙ্গাইল, কিশোরগঞ্জ, চাঁদপুর, চট্টগ্রাম, ঢাকা, নোয়াখালী, নরসিংদী, ময়মনসিংহ, ফরিদপুর, মাদারীপুর, শরীয়তপুর ও সুনামগঞ্জ।

আলোচনার মূল বার্তা ছিল—বিদেশে কর্মসংস্থানের সুযোগ বাড়ানোর পাশাপাশি অভিবাসনের পুরো প্রক্রিয়াটিকে নিরাপদ ও নিয়মিত করতে হবে। এ জন্য দক্ষ কর্মী তৈরি, শ্রমবাজারের তথ্য স্থানীয় পর্যায়ে পৌঁছে দেওয়া, নতুন শ্রমবাজার খোঁজা এবং মানবপাচার ও প্রতারণা প্রতিরোধে সমন্বিত ব্যবস্থা গড়ে তোলাকে একই কাঠামোর অংশ হিসেবে দেখতে হবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *