আসন্ন পবিত্র রমজানকে সামনে রেখে ভোজ্যতেল, চিনি, ছোলা, মসুর ডাল ও খেজুরের আমদানি বেড়েছে। এসব পণ্যের ঋণপত্র খোলার পরিমাণও বেড়েছে। এতে রমজানে বাড়তি চাহিদা মেটাতে সরবরাহ স্বাভাবিক রাখার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। তবে আন্তর্জাতিক বাজারে কিছু পণ্যের দাম বৃদ্ধি, আমদানি ব্যয় এবং শুল্ক কাঠামো নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে।
স্থানীয় বাজারে গত এক মাসে ডিম, ব্রয়লার মুরগি ও মসুর ডালের দাম কমেছে। অন্যদিকে ভোজ্যতেল ও চিনির দাম অপরিবর্তিত রয়েছে। রমজানে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের সরবরাহ ও দাম স্থিতিশীল রাখতে আমদানি পরিস্থিতি এবং শুল্কব্যবস্থা পর্যালোচনার ওপর গুরুত্ব দিয়েছে সরকার।
বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের বাজার পরিস্থিতি পর্যালোচনা সভায় এসব তথ্য তুলে ধরে বাংলাদেশ বাণিজ্য ও শুল্ক কমিশন। সভায় সভাপতিত্ব করেন বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির। রমজানে পণ্যের পর্যাপ্ত সরবরাহ নিশ্চিত করা, মূল্য স্থিতিশীল রাখা এবং আমদানি ও শুল্কসংক্রান্ত জটিলতা নিরসনের বিষয়ে আলোচনা হয়।
বাংলাদেশ বাণিজ্য ও শুল্ক কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরের ১লা জুলাই থেকে ২৫শে অক্টোবর পর্যন্ত ভোজ্যতেল, চিনি, ছোলা, মসুর ডাল ও খেজুরের আমদানি গত বছরের একই সময়ের তুলনায় বেড়েছে। এ সময়ে দেশে ভোজ্যতেল আমদানি হয়েছে ৮ লাখ ২৩ হাজার মেট্রিক টন। গত বছরের একই সময়ে আমদানির পরিমাণ ছিল ৭ লাখ ৫ হাজার মেট্রিক টন। অর্থাৎ আমদানি বেড়েছে ১ লাখ ১৮ হাজার মেট্রিক টন।
ভোজ্যতেলের ঋণপত্র খোলার পরিমাণও বেড়েছে। এ বছর ২৫শে অক্টোবর পর্যন্ত ৮ লাখ ৫ হাজার মেট্রিক টনের বিপরীতে ঋণপত্র খোলা হয়েছে। গত বছরের একই সময়ের তুলনায় এ পরিমাণ ১ লাখ ৩১ হাজার মেট্রিক টন বেশি।
এ সময়ে সয়াবিন বীজ আমদানি হয়েছে ৫ লাখ ১ হাজার মেট্রিক টন। গত বছরের তুলনায় তা ১ লাখ ১৩ হাজার মেট্রিক টন বেশি। চিনি আমদানি হয়েছে ৬ লাখ ৮৭ হাজার মেট্রিক টন। গত বছরের একই সময়ের তুলনায় আমদানি বেড়েছে ১ লাখ ৫৩ হাজার মেট্রিক টন। চিনির জন্য ঋণপত্র খোলা হয়েছে ৮ লাখ ১০ হাজার মেট্রিক টনের বিপরীতে।
রমজানে ইফতারের অন্যতম প্রধান উপকরণ ছোলার আমদানি উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। চলতি অর্থবছরের ২৫শে অক্টোবর পর্যন্ত ছোলা আমদানি হয়েছে ৮২ হাজার মেট্রিক টন। গত বছরের একই সময়ে আমদানি হয়েছিল ১২ হাজার মেট্রিক টন। অর্থাৎ এক বছরে আমদানি বেড়েছে ৭০ হাজার মেট্রিক টন। এ সময়ে ছোলার জন্য ঋণপত্র খোলা হয়েছে ১ লাখ ৩৮ হাজার মেট্রিক টনের বিপরীতে। মসুর ডাল আমদানি হয়েছে ১ লাখ ২২ হাজার মেট্রিক টন। গত বছরের একই সময়ের তুলনায় তা ৬৪ হাজার মেট্রিক টন বেশি। এ পণ্যের জন্য ঋণপত্র খোলা হয়েছে ১ লাখ ১৪ হাজার মেট্রিক টনের বিপরীতে। অন্যদিকে খেজুর আমদানি হয়েছে ১১ হাজার মেট্রিক টন। গত বছরের একই সময়ে এর পরিমাণ ছিল ৪ হাজার মেট্রিক টন।
আমদানি ও ঋণপত্র খোলার এ চিত্র রমজানের আগে পণ্য সংগ্রহে অগ্রগতির ইঙ্গিত দিচ্ছে। তবে আমদানির পরিমাণ বাড়লেই বাজারে সরবরাহ ও দাম স্বাভাবিক থাকবে, এমন নিশ্চয়তা নেই। সময়মতো পণ্য খালাস, পরিবহন এবং বাজারজাতকরণও গুরুত্বপূর্ণ।
ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশের তথ্য অনুযায়ী, গত এক মাসে খুচরা বাজারে ডিমের দাম ৭ দশমিক ৬২ শতাংশ কমেছে। বর্তমানে প্রতি হালি ডিম বিক্রি হচ্ছে ৪৭ থেকে ৫০ টাকায়। একই সময়ে ব্রয়লার মুরগির দাম কমেছে ২ দশমিক ৬৩ শতাংশ। বর্তমানে প্রতি কেজি ব্রয়লার মুরগি বিক্রি হচ্ছে ১৮০ থেকে ১৯০ টাকায়।
বড় দানার মসুর ডালের দামও কমেছে। গত এক মাসে এ পণ্যের দাম কমেছে ২ দশমিক ৫৬ শতাংশ। গত বছরের একই সময়ের তুলনায় দাম কমেছে ৭ দশমিক ৩২ শতাংশ। বর্তমানে প্রতি কেজি বড় দানার মসুর ডাল বিক্রি হচ্ছে ৯০ থেকে ১০০ টাকায়। মাঝারি দানার মসুর ডালের দাম গত বছরের তুলনায় কমেছে ৯ দশমিক ৬২ শতাংশ।
তবে বোতলজাত সয়াবিন তেলের দাম অপরিবর্তিত রয়েছে। প্রতি লিটার সয়াবিন তেল বিক্রি হচ্ছে ২০৪ টাকায়। পাঁচ লিটারের বোতলের দাম ১ হাজার টাকা। চিনির দামও স্থিতিশীল রয়েছে। প্রতি কেজি চিনি বিক্রি হচ্ছে ১১০ থেকে ১১৫ টাকায়।
সাধারণ মানের খেজুরের দাম গত এক মাস ধরে অপরিবর্তিত রয়েছে। মানভেদে প্রতি কেজি খেজুরের দাম ৩৫০ থেকে ৫৫০ টাকা।
সভায় পোলট্রি খাতের প্রতিনিধিরা জানান, দেশে বর্তমানে ডিম ও মুরগির উৎপাদন স্বাভাবিক রয়েছে। খামার পর্যায়ে ডিমের দামও কমেছে। কিছুদিন আগে প্রতি ডিমের দাম সাড়ে ১১ টাকা থাকলেও এখন তা ১০ টাকার নিচে নেমেছে। এ দাম উৎপাদন ব্যয়ের কাছাকাছি বলে জানান তাঁরা। খামারে রোগবালাইয়ের উল্লেখযোগ্য প্রকোপ না থাকায় উৎপাদন ও সরবরাহে বড় ধরনের ঘাটতির আশঙ্কা করছেন না খাতসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।
তাঁদের ধারণা, রমজানে সকালের নাশতার ধরনে পরিবর্তন আসায় ডিমের চাহিদা কিছুটা কমতে পারে। তবে ঈদের পর মুরগির চাহিদা বাড়ার সম্ভাবনা রয়েছে। এতে বাজারদরে প্রভাব পড়তে পারে।
প্রচলিত আমদানি নীতি অনুযায়ী, সরকারের বিশেষ অনুমতি ছাড়া ডিম ও মাংস আমদানি করা যায় না বলেও সভায় জানানো হয়।
রমজানের আগে খেজুরের দাম নিয়ন্ত্রণে রাখতে আমদানি শুল্কের কাঠামো সহজ ও যৌক্তিক করার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির। তিনি জানান, মিশর, সৌদি আরব, ইরাক ও আলজেরিয়াসহ প্রায় এক ডজন দেশ থেকে বিভিন্ন জাত ও মানের খেজুর আমদানি হয়। এসব খেজুরের গুণগত মান ও দামে পার্থক্য রয়েছে। তাই সব খেজুরের ক্ষেত্রে একই ধরনের মূল্যায়ন পদ্ধতি প্রয়োগ করলে জটিলতা তৈরি হতে পারে।
মন্ত্রী আমদানিকারকদের জন্য সহজবোধ্য ও বাস্তবসম্মত শুল্কব্যবস্থা গড়ে তোলার প্রয়োজনীয়তার কথা বলেন। শুল্ক নির্ধারণ জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের দায়িত্ব হলেও কার্যকর সমাধানের জন্য সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোর সমন্বয় জরুরি বলে তিনি উল্লেখ করেন।
সভায় খেজুরের প্রচলিত শুল্ক সুবিধা দ্রুত কার্যকর করার বিষয়েও আলোচনা হয়। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, এ সুবিধা বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজনীয় অভ্যন্তরীণ প্রস্তুতি সম্পন্ন হয়েছে। এ ছাড়া খেজুরের নির্দিষ্ট মূল্য ধরে শুল্ক নির্ধারণের পরিবর্তে প্রকৃত গুণগত মান ও আমদানি মূল্যের ভিত্তিতে কর নির্ধারণের প্রস্তাব আলোচনায় আসে।
আমদানিকারকদের অভিযোগ, প্রকৃত আমদানি মূল্যের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে শুল্ক নির্ধারণ না হলে সাধারণ মানের খেজুরের ক্ষেত্রেও ব্যয় বেড়ে যায়। এর সঙ্গে আঞ্চলিক পরিস্থিতি, বিকল্প পরিবহনপথ ব্যবহার, বাড়তি পরিবহন ব্যয় এবং ঋণপত্র খোলার জটিলতা যুক্ত হলে বাজারে পণ্য সরবরাহে চাপ তৈরি হয়।
ফল আমদানিকারকেরাও উচ্চ করহারের কারণে সাধারণ ভোক্তাদের ক্রয়ক্ষমতা বিবেচনায় নিয়ে কর কাঠামো আরও সহনীয় করার দাবি জানিয়েছেন। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ এসব সমস্যা সমাধানে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়ার আশ্বাস দিয়েছে।
বাংলাদেশ বাণিজ্য ও শুল্ক কমিশনের পর্যালোচনায় বলা হয়েছে, আন্তর্জাতিক বাজারে ভোজ্যতেল ও ছোলার দাম কিছুটা বেড়েছে। তবে মসুর ডালের দাম কমেছে।
আন্তর্জাতিক বাজারে পণ্যের দামের পরিবর্তন আমদানি ব্যয়কে প্রভাবিত করতে পারে। এর সঙ্গে পরিবহন ব্যয় ও শুল্ক যুক্ত হয়ে স্থানীয় বাজারেও প্রভাব ফেলতে পারে। তাই আমদানি পরিস্থিতির পাশাপাশি আন্তর্জাতিক বাজারের গতিপ্রকৃতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরা হয়েছে।
সভায় জানানো হয়, ছোলা ও মসুর ডাল আমদানিতে বর্তমানে শুল্ক-কর নেই। তবে চিনি ও ফল আমদানির বিদ্যমান শুল্ক কাঠামো পর্যালোচনা করে যৌক্তিক সমন্বয় করা গেলে বাজারে দাম সহনীয় রাখতে সহায়তা হতে পারে। সাম্প্রতিক সময়ে স্থানীয় বাজারে তাজা ফলের দামও কিছুটা কমেছে বলে পর্যালোচনায় উঠে এসেছে।
সভায় বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সচিব শরফ উদ্দিন আহমদ চৌধুরী, বাংলাদেশ বাণিজ্য ও শুল্ক কমিশনের চেয়ারম্যান নাসির উদ দৌলা, জাতীয় ভোক্তা-অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মো. জহিরুল ইসলামসহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা ও বিভিন্ন খাতের প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন।
নিত্যপণ্যের আমদানি বৃদ্ধি, কয়েকটি পণ্যের দাম কমে আসা এবং ডিম-মুরগির উৎপাদন স্বাভাবিক থাকার তথ্য রমজানের বাজার পরিস্থিতি নিয়ে আশাবাদ তৈরি করেছে। তবে ভোক্তাদের জন্য স্বস্তি নিশ্চিত করতে আমদানি করা পণ্য সময়মতো বাজারে পৌঁছানো, শুল্ক জটিলতা কমানো এবং সরবরাহব্যবস্থার ওপর নজর রাখা জরুরি।
আরো পড়ুন : চিংড়ি রপ্তানিতে ভারতের চেয়ে পিছিয়ে বাংলাদেশ, উৎপাদন ও মান বাড়ানোর তাগিদ