মৃত্যুভীতি কাটিয়ে জীবন উপভোগ করবেন যেভাবে

মৃত্যুর অনিবার্যতা মেনে নিয়ে জীবনের অর্থ, সম্পর্ক ও বর্তমান মুহূর্তকে গুরুত্ব দেওয়ার প্রতীকী দৃশ্য।

 

মৃত্যু জীবনের অনিবার্য সত্য। তবু মৃত্যু নিয়ে কথা বলতে বা ভাবতে অনেকেই অস্বস্তি বোধ করেন। প্রিয়জনকে হারানোর শোক, নিজের মৃত্যুর ভয় কিংবা ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত হয়ে পড়ার আশঙ্কা—সব মিলিয়ে মৃত্যু যেন আমাদের সামাজিক জীবনে এক নিষিদ্ধ প্রসঙ্গ। অথচ বিশেষজ্ঞদের মতে, মৃত্যুর বাস্তবতা স্বীকার করা মানেই বিষণ্ণ হয়ে থাকা নয়। বরং এই উপলব্ধি আমাদের বুঝতে সাহায্য করতে পারে, জীবনে কোন মানুষগুলো গুরুত্বপূর্ণ, কোন কাজগুলো অর্থবহ এবং কীভাবে বর্তমান সময়কে আরও ভালোভাবে কাজে লাগানো যায়।

যুক্তরাজ্যের সংবাদমাধ্যম দ্য গার্ডিয়ান-এ ২০২৬ সালের ৬ই  অক্টোবর প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে দার্শনিক, শোকবিষয়ক গবেষক, লেখক ও উপশমমূলক চিকিৎসাবিশেষজ্ঞরা মৃত্যুভীতি বোঝা এবং এর সঙ্গে স্বস্তিকর সম্পর্ক গড়ে তোলার নানা উপায় তুলে ধরেছেন।

দার্শনিক টড মে মনে করেন, মানুষ সাধারণত ভবিষ্যৎকে সামনে রেখে জীবন সাজায়। আমরা সম্পর্ক গড়ে তুলি, কাজের পরিকল্পনা করি এবং এমন অনেক উদ্যোগে যুক্ত হই, যেগুলোর ফল ভবিষ্যতে পাওয়ার আশা রাখি। মৃত্যুর চিন্তা সেই ভবিষ্যৎমুখী পরিকল্পনার ধারাবাহিকতাকে প্রশ্নের মুখে ফেলে। ফলে নিজের জীবনের সমাপ্তির কথা ভাবলে উদ্বেগ তৈরি হওয়া অস্বাভাবিক নয়।

মৃত্যুকালীন সহায়তাকারী ও লেখক আলুয়া আর্থারের মতে, মৃত্যুর বাস্তবতা আমাদের নিজেদের সীমাবদ্ধতার মুখোমুখি দাঁড় করায়। জীবনের সবকিছু নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব—এমন ধারণা মৃত্যুচিন্তার সামনে টেকে না। এই অসহায়ত্ব মেনে নেওয়া অনেকের জন্য কঠিন।

উপশমমূলক চিকিৎসাবিশেষজ্ঞ লুয়ি ক্যাথি ঝাংয়ের মতে, মৃত্যু মানুষের জন্য অত্যন্ত অস্বস্তিকর একটি অভিজ্ঞতার ধারণা তৈরি করে। তাই অনেকে এখনই এ নিয়ে ভাবার বদলে ভবিষ্যতের কোনো এক সময়ে পরিস্থিতির মুখোমুখি হওয়ার কথা ভাবেন।

শোক ও মানসিক সহনশীলতা নিয়ে গবেষক লুসি হোন আরেকটি কারণ তুলে ধরেছেন। ইতিহাসের দীর্ঘ সময় মানুষ বাড়িতেই অসুস্থ ও মৃত্যুপথযাত্রী স্বজনদের পরিচর্যা করত। ফলে মৃত্যু ছিল পারিবারিক জীবনের দৃশ্যমান অংশ। কিন্তু বিংশ শতাব্দীতে হাসপাতাল ও পরিচর্যাকেন্দ্রে মৃত্যুর ঘটনা বাড়তে থাকায় অনেকের দৈনন্দিন জীবন থেকে মৃত্যু আরও দূরে সরে যায়।

এতে মৃত্যু নিয়ে খোলামেলা আলোচনা ও প্রস্তুতির সুযোগও কমে যেতে পারে। হোনের মতে, অনেক সমাজে শোক সম্পর্কে জ্ঞান ও অভিজ্ঞতার ঘাটতি রয়েছে; মানুষ শোকের মুখোমুখি হলে কীভাবে কথা বলতে হবে, তা-ও বুঝে উঠতে পারে না।

তবে সব দর্শন মৃত্যুকে একইভাবে দেখে না। অস্ট্রেলীয় জেন বৌদ্ধ সন্ন্যাসিনী সিস্টার চান ত্রি নগিয়েমের ব্যাখ্যায়, বৌদ্ধ দর্শনে শুরু ও শেষের ধারণা পাশ্চাত্যের প্রচলিত ব্যক্তিকেন্দ্রিক ধারণার মতো সরল নয়। এই দৃষ্টিভঙ্গিতে মৃত্যু কেবল একটি চূড়ান্ত সমাপ্তি নয়, বরং অস্তিত্বের ধারাবাহিকতার অংশ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। এটি একটি দার্শনিক অবস্থান; সবার বিশ্বাস বা অভিজ্ঞতা এর সঙ্গে মিলবে, এমন নয়।

মৃত্যু নিয়ে আলোচনা এড়িয়ে গেলেও বাস্তবতা বদলায় না। বরং আগাম প্রস্তুতি না থাকলে মৃত্যুর পর পরিবারের সদস্যদের শোকের পাশাপাশি নানা প্রশাসনিক, আর্থিক ও চিকিৎসা সংক্রান্ত সিদ্ধান্ত সামলাতে হতে পারে।

আলুয়া আর্থারের মতে, নিজের ইচ্ছা ও প্রয়োজনীয় তথ্য আগে থেকে গুছিয়ে রাখা প্রিয়জনদের ওপর চাপ কমাতে পারে। যেমন—উইল তৈরি করা, গুরুত্বপূর্ণ নথি সংরক্ষণ করা এবং নিজের আর্থিক ও চিকিৎসা সংক্রান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার দায়িত্ব কার হাতে থাকবে, তা নিয়ে আগেভাগে আলোচনা করা।

তবে মৃত্যুর জন্য প্রস্তুতি নেওয়ার গুরুত্ব শুধু ব্যবহারিক ব্যবস্থাপনায় সীমাবদ্ধ নয়। মৃত্যুর অনিবার্যতা উপলব্ধি করলে জীবনের অগ্রাধিকারও নতুনভাবে নির্ধারণ করা যায়।

লুসি হোনের নিজের অভিজ্ঞতাও এর একটি উদাহরণ। তাঁর মেয়ের আকস্মিক মৃত্যুর পর শোক নিয়ে গবেষণায় যুক্ত হন তিনি। হোনের মতে, জীবনের সীমাবদ্ধতা উপলব্ধি তাঁকে বুঝতে সাহায্য করেছে—কোন মানুষগুলো তাঁর কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এবং কোথায় তাঁর সময় ও মনোযোগ দেওয়া উচিত।

চিকিৎসা বিশেষজ্ঞ ঝাং ছোটখাটো দুশ্চিন্তাকে বৃহত্তর প্রেক্ষাপটে দেখার পরামর্শ দিয়েছেন। যানজটে আটকে থাকা কিংবা চাকরির সাক্ষাৎকার নিয়ে উদ্বেগের সময় নিজেকে প্রশ্ন করা যেতে পারে—জীবনের শেষ সময়ে এই বিষয়টি কতটা গুরুত্বপূর্ণ মনে হবে?

এই প্রশ্নের উদ্দেশ্য দৈনন্দিন সমস্যাকে তুচ্ছ করা নয়। বরং কোন বিষয় নিয়ে কতটা উদ্বিগ্ন হওয়া প্রয়োজন এবং কোন সিদ্ধান্ত নিতে অযথা ভয় কাজ করছে, তা বুঝতে সাহায্য করা।

মৃত্যুভীতি সামলানোর ছয়টি উপায়

১. নিজের ভয়কে স্বাভাবিক হিসেবে গ্রহণ করুন

মৃত্যুকে ভয় পাওয়া অস্বাভাবিক নয়। এই ভয় বিপদ সম্পর্কে সচেতন থাকতে সাহায্য করতে পারে। তাই ভয় পুরোপুরি দূর করতেই হবে—এমন প্রত্যাশা না রেখে বোঝার চেষ্টা করুন, কখন এই ভয় স্বাভাবিক সতর্কতা থেকে দৈনন্দিন জীবনের বাধা হয়ে উঠছে।

২. বাস্তবসম্মত প্রস্তুতি নিন

উইল তৈরি করা, গুরুত্বপূর্ণ নথি গুছিয়ে রাখা এবং অসুস্থতার কারণে নিজে সিদ্ধান্ত নিতে অক্ষম হলে চিকিৎসা ও আর্থিক বিষয়ে কে সিদ্ধান্ত নেবেন, তা আগেই নির্ধারণ করা যেতে পারে। এ ধরনের প্রস্তুতি মৃত্যুচিন্তার আবেগগত দিক নিয়ে সরাসরি আলোচনা করার চেয়ে অনেকের কাছে সহজ মনে হতে পারে।

চিকিৎসাসংক্রান্ত অগ্রিম নির্দেশনা তৈরির ক্ষেত্রে নিজের দেশের আইন ও চিকিৎসাব্যবস্থা সম্পর্কে জেনে নেওয়া প্রয়োজন।

৩. নিজেকে বড় কিছু প্রশ্ন করুন

আগামী ১০ বা ১৫ বছর পর কোন কাজটি না করার জন্য অনুশোচনা হতে পারে? কোনো সুযোগ কি কেবল ভয়ের কারণে এড়িয়ে যাচ্ছেন? কোনো সম্পর্কের ক্ষেত্রে কি প্রয়োজনীয় কথাটি বলা হচ্ছে না?

এ ধরনের প্রশ্ন ভবিষ্যৎ নিয়ে ভাবতে সাহায্য করে। তবে প্রতিটি সিদ্ধান্ত তাড়াহুড়া করে নেওয়ার প্রয়োজন নেই; বরং নিজের মূল্যবোধ ও বাস্তব পরিস্থিতি বুঝে সিদ্ধান্ত নেওয়াই গুরুত্বপূর্ণ।

৪. প্রয়াত প্রিয়জনের স্মৃতি থেকে শিক্ষা নিন

আপনার জীবনে গুরুত্বপূর্ণ ছিলেন, কিন্তু এখন আর বেঁচে নেই—এমন কারও কথা কয়েক মিনিট ভাবুন। তাঁর কাছ থেকে কী শিখেছেন? তাঁর কোন গুণটি নিজের জীবনে ধারণ করতে চান?

স্মৃতি শুধু দুঃখের উৎস নয়; এটি ভালোবাসা, শিক্ষা ও সম্পর্কের মূল্য উপলব্ধিরও সুযোগ হতে পারে। তবে শোকের অভিজ্ঞতা সবার জন্য এক রকম নয়। কারও জন্য এভাবে স্মরণ করা স্বস্তিদায়ক হতে পারে, আবার কারও ক্ষেত্রে তা সাময়িকভাবে কষ্ট বাড়াতে পারে।

৫. সম্পর্কগুলোকে যত্ন দিন

নিজেকে জিজ্ঞাসা করুন—কার কাছে ক্ষমা চাওয়া প্রয়োজন? কাকে ধন্যবাদ জানানো বাকি? কার সঙ্গে দীর্ঘদিন কথা বলা হয়নি? এমন কোনো অভিমান কি আছে, যা মিটিয়ে ফেলার সুযোগ রয়েছে?

সব সম্পর্ক আগের অবস্থায় ফিরিয়ে আনা সম্ভব নয়, আর সব সম্পর্ক মেরামত করাও নিরাপদ বা প্রয়োজনীয় নয়। তবু যেখানে তা সম্ভব ও উপযুক্ত, সেখানে আন্তরিক কথোপকথন অনেক সময় মানসিক ভার কমাতে পারে।

৬. বর্তমান ও ভবিষ্যতের মধ্যে ভারসাম্য রাখুন

শুধু ভবিষ্যতের জন্য বাঁচতে গিয়ে বর্তমানের আনন্দ হারিয়ে যেতে পারে। আবার ভবিষ্যতের কথা একেবারে উপেক্ষা করলে দীর্ঘমেয়াদি প্রয়োজন অপূর্ণ থেকে যেতে পারে।

দার্শনিক টড মে মনে করেন, ভবিষ্যৎমুখী কাজ ও বর্তমানের অভিজ্ঞতা—দুটিই জীবনের অংশ। তাই কাজের লক্ষ্য পূরণের পাশাপাশি পরিবারকে সময় দেওয়া, প্রিয়জনের সঙ্গে খাওয়া, প্রকৃতির সান্নিধ্যে থাকা কিংবা পছন্দের কাজে যুক্ত থাকার জন্যও সময় রাখা প্রয়োজন।

প্রাচীন রোমান দর্শনের সঙ্গে যুক্ত একটি বহুল পরিচিত বাক্য হলো ‘মেমেন্তো মোরি’, যার অর্থ ‘মৃত্যুকে স্মরণ রাখো’। এর তাৎপর্য সারাক্ষণ মৃত্যু নিয়ে উদ্বিগ্ন থাকা নয়; বরং জীবন সীমিত—এই সত্য মনে রেখে সময় ও সম্পর্কের মূল্য বোঝা।

মৃত্যুভীতি একেবারে দূর না হলেও তার সঙ্গে বসবাস করতে শেখা সম্ভব। এজন্য প্রয়োজন নিজের আবেগকে স্বীকার করা, বাস্তব প্রস্তুতি নেওয়া, সম্পর্কের যত্ন করা এবং ভবিষ্যতের পরিকল্পনার পাশাপাশি বর্তমানের অভিজ্ঞতাকেও গুরুত্ব দেওয়া।

মৃত্যু নিয়ে কথা বলা সবার কাছে সহজ হবে না। শোকের সময় কাউকে জোর করে কথা বলানোও ঠিক নয়। তবে পরিবার ও সমাজে এমন পরিবেশ তৈরি করা যায়, যেখানে মানুষ ভয়, অনিশ্চয়তা ও প্রিয়জন হারানোর অভিজ্ঞতা নিয়ে বিচারিত হওয়ার আশঙ্কা ছাড়াই কথা বলতে পারেন।

মৃত্যুর অনিবার্যতা বদলানো সম্ভব নয়। কিন্তু সেই সত্যকে কীভাবে গ্রহণ করব, কাদের পাশে থাকব এবং আমাদের হাতে থাকা সময় কীভাবে ব্যবহার করব—এসব বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার সুযোগ আমাদের রয়েছে। জীবনকে অর্থবহ করে তোলার শুরু হতে পারে সেই উপলব্ধি থেকেই।

সূত্র: দ্য গার্ডিয়ান

 

আরো পড়ুন : ক্ষমা কি অন্যায়কে বৈধতা দেয়, নাকি মুক্ত করে ক্রোধের বন্দিত্ব থেকে?

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *