বিশ্বকাপের জন্য প্রস্তাবিত গোপন বিনিয়োগ পরিকল্পনা নিয়ে স্বচ্ছতার অভাব এবং আর্থিক ব্যবস্থাপনা সম্পর্কে প্রশ্নের মুখে পড়েছেন আন্তর্জাতিক ফুটবল সংস্থার সভাপতি জিয়ানি ইনফান্তিনো। এ নিয়ে ইউরোপীয় ফুটবল কর্মকর্তাদের সঙ্গে জুরিখে অনুষ্ঠিত বৈঠকে অসন্তোষ প্রকাশ পেয়েছে। সংস্থাটির নেতৃত্বে পরিবর্তনের দাবিও নতুন করে আলোচনায় এসেছে।
বিতর্কের কেন্দ্রে রয়েছে ৪২০ কোটি মার্কিন ডলারের একটি বিনিয়োগ পরিকল্পনা। এতে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের জামাতা জ্যারেড কুশনারের সংশ্লিষ্টতা থাকার কথা বলা হয়েছে। পরিকল্পনাটির প্রকৃতি, সম্ভাব্য বিনিয়োগকারীদের ভূমিকা এবং অর্থ ব্যবস্থাপনার বিবরণ প্রকাশের দাবি জানিয়েছেন ইউরোপীয় কর্মকর্তারা।
তবে আন্তর্জাতিক ফুটবল সংস্থা যুক্তরাষ্ট্রে চলমান আইনি কার্যক্রমের কথা উল্লেখ করে বিস্তারিত তথ্য দিতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে। ফলে পরিকল্পনাটি নিয়ে প্রশ্নের নিষ্পত্তি হয়নি।
গত ১৫ অক্টোবর জুরিখে অনুষ্ঠিত আন্তর্জাতিক ফুটবল সংস্থার ৩৭ সদস্যের পরিষদের বৈঠকে পরিকল্পনাটি নিয়ে আলোচনা হয়। সভাপতি ইনফান্তিনো প্রস্তাবটি প্রত্যাহার করার পর যোগাযোগ ও প্রক্রিয়াগত ভুলের জন্য ক্ষমা চান। তবে ইউরোপীয় প্রতিনিধিদের অসন্তোষ দূর হয়নি।
প্রস্তাবিত পরিকল্পনায় আন্তর্জাতিক ফুটবল সংস্থার বাণিজ্যিক কার্যক্রম ও প্রতিযোগিতা পরিচালনার জন্য একটি নতুন সহযোগী প্রতিষ্ঠান গঠনের কথা ছিল। বিশ্বকাপসহ বিভিন্ন প্রতিযোগিতার বাণিজ্যিক স্বত্ব থেকে আয় বাড়ানো ছিল এর অন্যতম লক্ষ্য। পরিকল্পনা অনুযায়ী, নতুন প্রতিষ্ঠানের ২০ শতাংশ অংশ ব্যক্তিমালিকানাধীন বিনিয়োগকারীদের কাছে বিক্রির মাধ্যমে ৪২০ কোটি ডলার সংগ্রহের কথা ছিল। সম্ভাব্য বিনিয়োগকারীদের মধ্যে ছিল যুক্তরাষ্ট্রের বিনিয়োগকারী জোশুয়া কুশনারের প্রতিষ্ঠান। তিনি ডোনাল্ড ট্রাম্পের জামাতা জ্যারেড কুশনারের ভাই।
আন্তর্জাতিক ফুটবল সংস্থার দাবি ছিল, নতুন উদ্যোগ থেকে পাওয়া অর্থ সদস্য দেশগুলোর ফুটবল উন্নয়নে ব্যয় করা হবে। তবে সমালোচকদের প্রশ্ন, বিপুল আর্থিক সঞ্চয় থাকা সত্ত্বেও সংস্থাটির বাণিজ্যিক স্বত্বে ব্যক্তিগত বিনিয়োগকারীদের অংশীদারত্ব দেওয়ার প্রয়োজন কেন দেখা দিল। ইউরোপীয় কর্মকর্তারা পরিকল্পনাটির আর্থিক কাঠামো, সম্ভাব্য বিনিয়োগকারীদের ভূমিকা এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়া সম্পর্কে বিস্তারিত নথি চেয়েছেন। যুক্তরাষ্ট্রে চলমান আইনি কার্যক্রমের কারণে এসব তথ্য প্রকাশ করা সম্ভব নয় বলে জানিয়েছে আন্তর্জাতিক ফুটবল সংস্থা।
এ ছাড়া ট্রাম্পকে আন্তর্জাতিক ফুটবল সংস্থার শান্তি পুরস্কার দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েও সমালোচনা হয়েছে। ইউরোপীয় কর্মকর্তারা এসব সিদ্ধান্তের ব্যাখ্যা এবং সংস্থার সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়া সম্পর্কে স্বচ্ছতা দাবি করছেন। তবে এসব অভিযোগের সবকিছুই প্রমাণিত অনিয়ম নয়। সংশ্লিষ্ট সিদ্ধান্তগুলোর যৌক্তিকতা, প্রক্রিয়া ও জবাবদিহি নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
ইউরোপীয় ফুটবল সংস্থা ফিফার কাছে ৪২টি প্রশ্নের লিখিত উত্তর চেয়েছে। সংস্থাটির মহাসচিব থিওডোরোস থিওডোরিদিস গত ২০শে অক্টোবর পাঠানো চিঠিতে ১২টি বিষয় নিয়ে ব্যাখ্যা দাবি করেন। ২রা নভেম্বরের মধ্যে উত্তর ও সংশ্লিষ্ট নথি দেওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে।
এসব প্রশ্নের মধ্যে রয়েছে বিনিয়োগ পরিকল্পনা, আর্থিক ব্যবস্থাপনা, ট্রাম্পের সঙ্গে সম্পর্ক, শাস্তিমূলক সিদ্ধান্ত এবং সভাপতির আসন্ন নির্বাচনসংক্রান্ত বিষয়। ইউরোপীয় সংস্থাটির মতে, জবাবদিহির প্রশ্ন এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই। এদিকে আন্তর্জাতিক ফুটবল সংস্থার পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, সংস্থার পরিচালনাবিধি ও চলমান আইনি কার্যক্রমের সীমাবদ্ধতা বিবেচনায় রেখে তথ্য প্রকাশের বিষয়টি পরিচালনা করা হবে। ফলে দুই পক্ষের মধ্যে মতপার্থক্য এখনো রয়ে গেছে।
সংস্থাটির হিসাব অনুযায়ী, ২০২৭ থেকে ২০৩০ সাল পর্যন্ত ফুটবল উন্নয়নে মোট ৬৩৫ কোটি ডলার ব্যয়ের পরিকল্পনা রয়েছে। তবে এ অর্থায়নের চূড়ান্ত কাঠামো ও বণ্টনসংক্রান্ত সিদ্ধান্তের জন্য আগামী ডিসেম্বরের পরিষদ বৈঠক এবং পরবর্তী অনুমোদন প্রক্রিয়া বাকি রয়েছে।
আফ্রিকা, এশিয়া ও অন্যান্য অঞ্চলের সদস্য ফেডারেশনগুলোর সমর্থন সভাপতি নির্বাচনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। ইনফান্তিনোর সমর্থকেরা মনে করেন, উন্নয়ন তহবিল বাড়ানোর উদ্যোগ বিশ্বজুড়ে ফুটবলের প্রসারে সহায়তা করবে। সমালোচকদের প্রশ্ন, এই আর্থিক প্রতিশ্রুতি সংস্থার পরিচালনায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির ঘাটতি নিয়ে ওঠা প্রশ্নের বিকল্প হতে পারে না।
আন্তর্জাতিক ফুটবল সংস্থার পরবর্তী সভাপতি নির্বাচন ২০২৭ সালের মার্চে মরক্কোর রাজধানী রাবাতে অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা। নির্বাচনের আগে মনোনয়ন জমা দেওয়ার শেষ তারিখ ১৮ই নভেম্বর। ইনফান্তিনো পুনর্নির্বাচিত হতে চাইলে তাঁকে সমালোচনার পাশাপাশি বিভিন্ন অঞ্চলের সদস্য ফেডারেশনগুলোর সমর্থনও ধরে রাখতে হবে।
ইউরোপীয় সংস্থা বিকল্প প্রার্থী নিয়ে আলোচনা করছে। তবে ইনফান্তিনোর বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ প্রার্থী দেওয়া এবং বিভিন্ন মহাদেশের সমর্থন নিশ্চিত করা সহজ হবে কি না, তা এখনো স্পষ্ট নয়। আফ্রিকা ও দক্ষিণ আমেরিকার কয়েকটি ফুটবল নেতৃত্বের সমর্থন তাঁর পক্ষে রয়েছে বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
আগামী ১৬ই ডিসেম্বর দোহায় ফিফার পরবর্তী পরিষদ বৈঠক অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা। সেখানে পরিচালন ব্যবস্থার সংস্কার, শাস্তিমূলক প্রক্রিয়া এবং শান্তি পুরস্কার নিয়ে পর্যালোচনার অগ্রগতি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
ইনফান্তিনোর সামনে এখন দুটি বড় চ্যালেঞ্জ—আর্থিক পরিকল্পনা নিয়ে ওঠা প্রশ্নের গ্রহণযোগ্য জবাব দেওয়া এবং সদস্য দেশগুলোর আস্থা ধরে রাখা। শেষ পর্যন্ত এই বিতর্ক তাঁর নেতৃত্বে কতটা প্রভাব ফেলবে, তা নির্ভর করবে তদন্ত, নথি প্রকাশ, সংস্কার উদ্যোগ এবং আসন্ন নির্বাচনের রাজনৈতিক সমীকরণের ওপর।
আরো পড়ুন : ম্যানচেস্টার সিটির আর্থিক অনিয়ম: কী শাস্তি হতে পারে?