সন্তানের বিষণ্নতা কি শুধু ‘মনখারাপ’? যে লক্ষণগুলো এড়িয়ে যান বাবা-মা

রুবাবা জাফরীন

শিশু হঠাৎ খুব রেগে যাচ্ছে, বন্ধুদের এড়িয়ে চলছে, পড়াশোনায় আগ্রহ হারিয়েছে কিংবা আগের প্রিয় খেলাধুলাও আর করতে চাইছে না—এসবকে অনেক সময় বাবা-মা ‘বয়সের স্বাভাবিক পরিবর্তন’ বা সাময়িক মনখারাপ বলে ধরে নেন। কিন্তু আচরণে এমন পরিবর্তন কখনও কখনও বিষণ্নতারও সতর্কসংকেত হতে পারে।

শিশু-কিশোরদের বিষণ্নতা সব সময় প্রাপ্তবয়স্কদের মতো প্রকাশ পায় না। কান্না বা চুপচাপ হয়ে যাওয়ার পরিবর্তে তাদের ক্ষেত্রে বিরক্তি, রাগ, সামাজিকভাবে গুটিয়ে যাওয়া কিংবা দৈনন্দিন অভ্যাসে পরিবর্তন বেশি চোখে পড়তে পারে। আমেরিকার ন্যাশনাল ইন্সটিটিউট অফ মেন্টাল হেলথ (এনআইএমএইচ)-ও শিশু-কিশোরদের ক্ষেত্রে খিটখিটে মেজাজ, আগ্রহ হারানো, কম শক্তি, ঘুমের পরিবর্তন, বন্ধু ও পরিবারের কাছ থেকে দূরে সরে যাওয়া এবং পড়াশোনায় অবনতিকে সম্ভাব্য সতর্কসংকেত হিসেবে উল্লেখ করেছে।

সম্প্রতি নিউজউইক-এ প্রকাশিত প্রতিবেদনে ক্লিনিক্যাল সাইকোলজিস্ট ড. ক্যারোলিন স্পিরোও শিশুদের বিষণ্নতার এমন কিছু সূক্ষ্ম লক্ষণের দিকে অভিভাবকদের নজর দেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন।

সাধারণত শান্ত থাকা কোনো শিশু হঠাৎ অতিরিক্ত রাগী, বিরক্ত বা ঝগড়াটে হয়ে উঠলে বিষয়টি খেয়াল করা দরকার। ছোটখাটো ঘটনায় অস্বাভাবিক প্রতিক্রিয়া, অতিরিক্ত কান্না বা আচরণে বড় ধরনের পরিবর্তনও গুরুত্বের সঙ্গে দেখা উচিত।

তবে একটি লক্ষণ দেখেই বিষণ্নতার সিদ্ধান্তে পৌঁছানো ঠিক নয়। শিশুর স্বাভাবিক আচরণের তুলনায় পরিবর্তনটি কতটা বড় এবং কতদিন ধরে চলছে—সেটিই বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

আগে বন্ধুদের সঙ্গে সময় কাটাতে পছন্দ করত, কিন্তু এখন একা থাকতে চাইছে; পারিবারিক আড্ডা এড়িয়ে চলছে; সামাজিক কার্যক্রমে অংশ নিতে চাইছে না—এমন পরিবর্তনও নজরে রাখা দরকার।

এনআইএমএইচ-এর তথ্য অনুযায়ী, শিশু-কিশোরদের ক্ষেত্রে সামাজিক কার্যক্রম থেকে সরে যাওয়া এবং বন্ধু বা পরিবারের সঙ্গে কম সময় কাটানো মানসিক সমস্যার সম্ভাব্য সতর্কসংকেত হতে পারে।

যে শিশু আগে সাইকেল চালানো, ছবি আঁকা, খেলাধুলা বা অন্য কোনো কাজে আনন্দ পেত, হঠাৎ যদি সেসবের প্রতিই আগ্রহ হারিয়ে ফেলে, সেটি খেয়াল করা জরুরি।

বিষণ্নতার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ লক্ষণ হলো আগে উপভোগ করা কাজের প্রতি আগ্রহ বা আনন্দ কমে যাওয়া।

অতিরিক্ত ঘুমানো, ঘুমাতে সমস্যা হওয়া, দিনের বেলা অস্বাভাবিক ঘুমঘুম ভাব কিংবা খাবারের পরিমাণে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তনও বিষণ্নতার সঙ্গে দেখা যেতে পারে।

এর সঙ্গে যদি শিশু সারাক্ষণ ক্লান্ত থাকে, স্বাভাবিক কাজ করতে শক্তি না পায় বা চলাফেরা ও কথা বলার গতি কমে যায়, তাহলে বিষয়টি আরও গুরুত্ব দিয়ে দেখা উচিত।

মনোযোগ ধরে রাখতে না পারা, স্কুলে যেতে অনীহা, পড়াশোনায় আগ্রহ কমে যাওয়া কিংবা পরীক্ষার ফলাফলে হঠাৎ অবনতি—এসবও মানসিক সমস্যার সঙ্গে সম্পর্কিত হতে পারে।

এনআইএমএইচ শিশুদের মানসিক স্বাস্থ্যসংক্রান্ত সতর্কসংকেতের মধ্যে একাডেমিক সমস্যার পাশাপাশি সাম্প্রতিক গ্রেড কমে যাওয়ার কথাও উল্লেখ করেছে।

বিশেষ করে কিশোর-কিশোরীদের ক্ষেত্রে ধূমপান, অ্যালকোহল বা মাদক ব্যবহার, আত্মবিধ্বংসী কিংবা অন্য ঝুঁকিপূর্ণ আচরণ মানসিক সমস্যার সঙ্গে সম্পর্কিত হতে পারে। এনআইএমএইচ-ও কিশোরদের সম্ভাব্য সতর্কসংকেতের মধ্যে মাদক ব্যবহার, ঝুঁকিপূর্ণ আচরণ ও আত্মহানির কথা উল্লেখ করেছে।

ক্লিনিক্যাল ডিপ্রেশনের নির্ণয়ে সাধারণত উপসর্গগুলো দিনের বেশির ভাগ সময়, প্রায় প্রতিদিন, অন্তত দুই সপ্তাহ ধরে থাকা এবং দৈনন্দিন জীবনে প্রভাব ফেলার বিষয়টি বিবেচনা করা হয়। শিশু ও কিশোরদের ক্ষেত্রে বিষণ্নতার বদলে বিরক্তি বা খিটখিটে মেজাজও প্রধান লক্ষণ হিসেবে প্রকাশ পেতে পারে।

তবে এর অর্থ এই নয় যে বাবা-মাকে দুই সপ্তাহ পূর্ণ হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে। শিশুর আচরণ বা আবেগের পরিবর্তন যদি তাকে বা পরিবারকে উল্লেখযোগ্যভাবে কষ্ট দেয়, স্কুল, বাড়ি বা বন্ধুত্বে সমস্যা তৈরি করে, তাহলে আগেই পেশাদার পরামর্শ নেওয়া যেতে পারে। এনআইএমএইচ-ও এমন পরিস্থিতিতে স্বাস্থ্য পেশাজীবীর সঙ্গে যোগাযোগের পরামর্শ দেয়।

প্রথম কাজ হলো সন্তানের সঙ্গে কথা বলার নিরাপদ পরিবেশ তৈরি করা। সরাসরি দোষারোপ বা জেরা না করে তার অনুভূতি বোঝার চেষ্টা করা জরুরি।

‘তোমাকে এমন লাগছে কেন?’—এর বদলে বলা যেতে পারে, ‘আমি দেখছি তুমি কিছুটা চাপে আছ। চাইলে আমার সঙ্গে কথা বলতে পারো।’

একই সঙ্গে পরিবর্তনগুলো কখন শুরু হয়েছে, কত ঘন ঘন হচ্ছে এবং স্কুল, ঘুম, খাবার বা সামাজিক জীবনে কী প্রভাব পড়ছে—সেগুলো খেয়াল রাখা যেতে পারে। প্রয়োজনে এসব তথ্য চিকিৎসক বা মানসিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞকে পরিস্থিতি বুঝতে সাহায্য করবে। এনআইএমএইচ-ও উপসর্গ কখন শুরু হয়েছে, কতদিন ধরে রয়েছে এবং দৈনন্দিন জীবনে কী প্রভাব ফেলছে, তা নোট করে রাখার পরামর্শ দেয়।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, মানসিক সমস্যাকে ‘দুর্বলতা’ বা ‘বয়সের দোষ’ হিসেবে না দেখা। শিশু ও কিশোরদের মানসিক স্বাস্থ্যের সমস্যায় দ্রুত শনাক্তকরণ ও চিকিৎসা দীর্ঘমেয়াদে উপকারী হতে পারে।

আর সন্তান যদি নিজের ক্ষতি করা, মারা যাওয়া বা আত্মহত্যার মতো কথা বলে, অথবা তার আচরণ অনিরাপদ হয়ে ওঠে, তাহলে অপেক্ষা না করে দ্রুত পেশাদার সহায়তা নিতে হবে।

সন্তানের বিষণ্নতা সব সময় চোখের জলে প্রকাশ পায় না। কখনও তা দেখা দিতে পারে রাগে, কখনও একাকীত্বে, কখনও প্রিয় কাজ থেকে মুখ ফিরিয়ে নেওয়ায়। তাই আচরণে অস্বাভাবিক ও দীর্ঘস্থায়ী পরিবর্তন দেখলে সেটিকে গুরুত্ব দিয়ে দেখা এবং প্রয়োজনে সাহায্য চাওয়াই সবচেয়ে নিরাপদ পথ।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *