বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংকটের পেছনে আত্মপরিচয়ের দ্বন্দ্ব এবং রাষ্ট্রের সঙ্গে রাজনীতির দ্বন্দ্ব বড় ভূমিকা রাখছে বলে মত দিয়েছেন বাংলাদেশ গণতান্ত্রিক জনরাষ্ট্র মঞ্চ-বিডিআরপি’র মুখ্য সম্পাদক মাসুদ রানা। এসব সংকট নিরসনে নতুন প্রজন্মকে সামনে রেখে রাজনীতিতে নতুন প্যারাডাইম তৈরির আহ্বান জানিয়েছেন তিনি।
শনিবার (২২শে আগস্ট) জাতীয় প্রেসক্লাবের আবদুস সালাম হলে বিডিআরপি আয়োজিত ‘বাংলাদেশ ১৯৭১-২০২৬: কী হলো ভুল এবং কী করতে হবে?’ শীর্ষক সেমিনারে তিনি এসব কথা বলেন।
সেমিনারে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন মাসুদ রানা। তিনি বলেন, বাংলাদেশের রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতার দুটি প্রধান কারণ রয়েছে। এর একটি আত্মপরিচয়ের দ্বন্দ্ব। অন্যটি রাষ্ট্রের সঙ্গে রাজনীতির দ্বন্দ্ব।
তার মতে, বাঙালি আত্মপরিচয় এবং ধর্মীয় আত্মপরিচয়কে কেন্দ্র করে সমাজে ভিন্ন সাংস্কৃতিক ও বোধ তৈরি হয়েছে। এর প্রভাব রাষ্ট্র ও রাজনীতির ধারণাতেও পড়ছে।
মাসুদ রানা বলেন, গণতান্ত্রিক রিপাবলিক পরিচালনার জন্য গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক দল ও নেতৃত্ব প্রয়োজন। জনগণের সার্বভৌমত্বে বিশ্বাস করে না এমন কোনো দল বা অগণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত নেতৃত্ব গণতান্ত্রিকভাবে রাষ্ট্র পরিচালনা করতে পারে না।
তিনি বলেন, আত্মপরিচয় ও রাষ্ট্র-রাজনীতির এই দুই দ্বন্দ্বের পারস্পরিক প্রভাবে রাষ্ট্রের জন্মকালীন প্রতিশ্রুতি এবং তা বাস্তবায়নের মধ্যে সংঘাত তৈরি হয়েছে। ১৯৭১ সালের পর থেকে বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংকটকে এসব দ্বন্দ্বের উপসর্গ হিসেবে দেখতে হবে।
সংকট নিরসনে তিনি ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ এবং ১৯৭২ সালের সংবিধানের মূলনীতির ভিত্তিতে জাতীয় সংহতি গড়ে তোলার প্রস্তাব দেন। একই সঙ্গে সর্বস্তরে অভিন্ন পাঠ্যক্রম চালুর আহ্বান জানান তিনি।
মাসুদ রানা বলেন, এ জন্য রাজনীতিতে প্যারাডাইম শিফট প্রয়োজন। নতুন প্রজন্মই নতুন রাজনৈতিক প্যারাডাইম তৈরি করতে পারে। বাঙালি জাতির দীর্ঘ সংগ্রাম, মুক্তিযুদ্ধ এবং ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে নতুন রাজনীতি নির্মাণ করতে হবে।
সেমিনারে সাবেক সচিব আবু আলম মো. শহীদ খান বলেন, রাজনৈতিক দলগুলো গণতন্ত্রের কথা বললেও অনেক দলের অভ্যন্তরে গণতন্ত্র নেই। ৫ই আগস্টের পর বিভিন্ন পক্ষ রাজনৈতিক সুযোগ নেওয়ার চেষ্টা করেছে। ইনক্লুসিভনেসের কথা বলেও মানুষকে রাজনীতি ও গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে।
তিনি বলেন, গণতন্ত্রের মূল কথাই হলো সবাইকে অন্তর্ভুক্ত করা।
বাংলাদেশ জাসদের সাধারণ সম্পাদক নাজমুল হক প্রধান বলেন, বাংলাদেশের জাতীয় সংকটের জন্য দেশের রাজনৈতিক শক্তিগুলোর দায় রয়েছে। একই সঙ্গে বিদেশেরও ভূমিকা রয়েছে।
তার অভিযোগ, পতিত আওয়ামী লীগ সরকার একদিকে বিএনপি ও জামায়াতের ধর্মীয় রাজনীতির বিরোধিতা করেছে। অন্যদিকে কট্টর ধর্মভিত্তিক বিজেপির সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা বজায় রেখেছে।
তিনি বলেন, ফেব্রুয়ারির সংসদ নির্বাচনের পর নির্বাচিত সরকারের যে আচরণ প্রত্যাশিত ছিল, তার বদলে মবক্রেসিকে প্রশ্রয় দেওয়া হচ্ছে।
বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির (সিপিবি) সভাপতি সাজ্জাদ জহির চন্দন বলেন, গত ৫৫ বছরে যারা দেশ শাসন করেছে, তারা লুটেরা ধনিক শ্রেণির পাহারাদার হিসেবে কাজ করেছে। বামপন্থীরাও নিজেদের ভুল থেকে মুক্ত নয়।
তিনি বলেন, এসব ভুল থেকে শিক্ষা নিয়ে দ্বিদলীয় রাজনৈতিক বৃত্তের বাইরে নতুন ধারার রাজনীতি ও রাষ্ট্র গঠনের সময় এসেছে। রাষ্ট্রকাঠামোকে চ্যালেঞ্জ করতে হবে। বামপন্থীদের নির্ভরশীলতার রাজনীতি থেকে বের হয়ে ঐক্যবদ্ধভাবে সাম্যভিত্তিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করতে হবে।
বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দল-বাসদের সাধারণ সম্পাদক বজলুর রশীদ ফিরোজ বলেন, বাংলাদেশের মুক্তির সংগ্রাম শুধু নয় মাসের যুদ্ধের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এটি প্রায় ২০০ বছরের সংগ্রামের ধারাবাহিকতা।
তিনি অভিযোগ করেন, আওয়ামী লীগ দীর্ঘ সময় মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে রাজনৈতিকভাবে ব্যবহার করেছে। এর ফলে তরুণ প্রজন্মের একটি অংশ মুক্তিযুদ্ধের প্রতি বিরূপ হয়েছে।
বজলুর রশীদ ফিরোজ বলেন, নির্বাচিত সরকার ক্ষমতায় এলেও ভিন্নমত শোনার জায়গা সংকুচিত হচ্ছে। রাজনৈতিক সহনশীলতা ও আলোচনার পরিসর কমে আসছে।
বিডিআরপির আন্তর্জাতিক সম্পাদক আরিফ রহমান বলেন, সংগঠনটি রাষ্ট্র সংস্কারের জন্য বেশ কিছু প্রস্তাব দিয়েছে। এর মধ্যে দ্বিকক্ষবিশিষ্ট আইনসভার প্রস্তাব রয়েছে। তার দাবি, প্রস্তাবিত কাঠামো আইনসভার ক্ষমতার ভারসাম্য তৈরিতে কার্যকর ভূমিকা রাখবে।
সেমিনারের সভাপতির বক্তব্যে বিডিআরপির সংগঠন সম্পাদক আবুল খায়ের উজির বাবলু বলেন, ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের পর একটি পক্ষ বাংলাদেশকে মৌলবাদী ও পাকিস্তানমুখী রাষ্ট্রে পরিণত করার চেষ্টা করেছে। এই পরিস্থিতিতে গণতন্ত্র ও জনগণের সার্বভৌমত্ব প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যেই বাংলাদেশ গণতান্ত্রিক জনরাষ্ট্র মঞ্চ গঠিত হয়েছে।
তিনি বলেন, রাজনৈতিক সংকট নিরসন করে বাংলাদেশকে একটি প্রকৃত রিপাবলিক হিসেবে গড়ে তুলতে হবে। এ জন্য বিডিআরপির ১০ দফা রূপরেখার ভিত্তিতে রাষ্ট্র সংস্কারে সবাইকে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার আহ্বান জানান তিনি।
সেমিনারের আলোচনায় বক্তারা বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংকটকে শুধু সরকার পরিবর্তন বা নির্বাচনকেন্দ্রিক সমস্যা হিসেবে না দেখে রাষ্ট্রকাঠামো, রাজনৈতিক দলের অভ্যন্তরীণ গণতন্ত্র, জাতীয় সংহতি এবং জনগণের সার্বভৌমত্বের প্রশ্নের সঙ্গে যুক্ত করে দেখার ওপর গুরুত্ব দেন।
রিপোর্টারকে অনেক ধন্যবাদ, দারুণভাবে উক্ত রিপোর্টটি উপস্থাপন করার জন্য।