চলচ্চিত্র সমালোচকরা কি সত্যিই অহংকারী ও বাস্তবতা থেকে বিচ্ছিন্ন? 

চলচ্চিত্রের সমালোচক

আমজাদ সুমন

সম্প্রতি ‘ডিগার’ নামের একটি ব্যঙ্গাত্মক কমেডি চলচ্চিত্র মুক্তি পেয়েছে। সাধারণ দর্শকরা এই ছবিটি বেশ উপভোগ করেছেন; রটেন টম্যাটোস-এর অডিয়েন্স স্কোর দাঁড়িয়েছে ৭৬%-এ। কিন্তু পেশাদার সমালোচকরা? তারা মাত্র ৫৩% ইতিবাচক রিভিউ দিয়েছেন, অভিযোগ ছবিটি নাকি অতিরিক্ত ভারী ও উপদেশমূলক। ফলে অনলাইনে ‘ডিগার নেশন’ নামে ভক্তরা ইতিমধ্যেই ছবিটির পক্ষে সোচ্চার হয়ে সমালোচকদের সমালোচনা শুরু করেছেন।

মাইকেল জ্যাকসনের বায়োপিক ‘মাইকেল’ বা ডকুমেন্টারি ‘মেলানিয়া’-র ক্ষেত্রেও দেখা গেছে একই চিত্র—দর্শকরা যেখানে মুগ্ধ, সমালোচকরা সেখানে ভ্রু কুঁচকেছেন। এই ধরনের ঘটনা থেকে সাধারণ একটি ধারণা তৈরি হয়েছে: চলচ্চিত্র সমালোচকরা অহংকারী এবং সাধারণ দর্শকের রুচি ও বাস্তবতা থেকে তারা সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন।

সমালোচক ও দর্শকদের মধ্যে মতপার্থক্যের ইতিহাস নতুন নয়। চলচ্চিত্র ইতিহাসে এমন অনেক উদাহরণ আছে যেখানে সমালোচকদের বিচার ভুল প্রমাণিত হয়েছে। একসময় যে ‘সিটিজেন কেন’-কেও ‘অপেশাদার ও এলোমেলো’ বলে উড়িয়ে দেওয়া হয়েছিল, তা আজ ইতিহাসের সেরা চলচ্চিত্রগুলোর একটি। তবে বর্তমান সময়ে কি এই ব্যবধান আগের চেয়েও বেড়েছে?

এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে ‘দ্য ইকোনমিস্ট’ বিগত দুই দশকের (২০০৫-২০২৫) ১০,০০০-এরও বেশি চলচ্চিত্রের রিভিউ ও বক্স-অফিস ডেটা বিশ্লেষণ করেছে। মেটাক্রিটিক ও দ্য নাম্বার্স ডেটাবেসের তথ্যের ভিত্তিতে এই বিশ্লেষণে যে চিত্রটি উঠে এসেছে, তা অনেকের ধারণার সম্পূর্ণ বিপরীত।

বিশ্লেষণে দেখা গেছে, বিগত ২০ বছরের অধিকাংশ সময় জুড়েই সমালোচক ও সাধারণ দর্শকদের মতামতের মধ্যে ব্যাপক মিল ছিল। ২০০৫ থেকে ২০১৬ সালের মধ্যে তাদের রেটিংয়ের কোরিলেশন (সম্পর্ক) গড়ে ০.৬ ছিল। অর্থাৎ, দর্শকরা যে ছবিটি পছন্দ করতেন, সমালোচকরাও মূলত সেটিই পছন্দ করতেন। ২০১৭-এর পর কিছুটা ব্যবধান তৈরি হলেও ২০২৫ সাল নাগাদ সমালোচক ও দর্শকদের রেটিং ২০০৫ সালের পর যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি মিলে গেছে।

সমালোচক ও দর্শকদের মূল পার্থক্য তারা কীভাবে রেটিং দেয় তাতে নয়, বরং তারা কোন চলচ্চিত্রগুলো রেট করতে বেছে নেয় তাতে। প্রতি ১০টি ডকুমেন্টারির দর্শক রিভিউয়ের বিপরীতে সমালোচকদের রিভিউ থাকে ৬টি। নাটক ও কমেডির ক্ষেত্রে এই অনুপাত ৩টি, আর অ্যাকশন চলচ্চিত্রের ক্ষেত্রে ১টিরও কম। বিদেশী ভাষার এবং কম বাজেটের চলচ্চিত্রগুলো দর্শকদের তুলনায় সমালোচকদের কাছে বেশি মনোযোগ পায়। অর্থাৎ, সমালোচকরা ভিন্ন ধরনের সিনেমা দেখেন, তাই তাদের রেটিংয়ের ধরনও ভিন্ন হতে পারে।

২০১৭ থেকে ২০২২ সালের মধ্যে যে মতপার্থক্যটি তৈরি হয়েছিল, তার প্রায় ৪৩%ই কেন্দ্রীভূত ছিল বড় বাজেটের অ্যাকশন এবং পারিবারিক চলচ্চিত্রের ওপর। শিল্প বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, এর পেছনে মূল কারণ ‘ফ্র্যাঞ্চাইজি ফ্যাটিগ’। দ্য নাম্বার্স-এর ব্রুস ন্যাশের ভাষ্য, “সাধারণ দর্শকদের আগেই সমালোচকরা সুপারহিরো মুভি দেখে ক্লান্ত হয়ে পড়েছিলেন।” লন্ডন ইউনিভার্সিটির ম্যাটিয়াস ফ্রে যোগ করেন, “‘ফাস্ট অ্যান্ড ফিউরিয়াস ২৩’ বা ‘অ্যাভেঞ্জার্স পার্ট ২৭’ দেখতে দেখতে একঘেয়ে লাগাই স্বাভাবিক, যা তাদের রেটিংয়ে প্রভাব ফেলে।”

২০২২ সালের পর থেকে অবশ্য সমালোচক ও দর্শকরা আবারও সাধারণ মতামতে ফিরে এসেছেন। বর্তমানে সব প্রধান ধারার চলচ্চিত্রেই তাদের রেটিংয়ের কোরিলেশন বেড়ে প্রায় ০.৭-এ দাঁড়িয়েছে।

সুতরাং, চলচ্চিত্র সমালোচকরা যে ইচ্ছাকৃতভাবে অহংকারী বা দর্শকবিমুখ, তথ্য তা সমর্থন করে না। তারা কেবল ভিন্ন ধরনের চলচ্চিত্রের প্রতি বেশি ঝোঁক দেখান এবং বাণিজ্যিক ফ্র্যাঞ্চাইজিগুলোর পুনরাবৃত্তিতে দ্রুত বিরক্ত হন। দর্শক ও সমালোচকের রুচির এই সেতুবন্ধন আবারও মজবুত হচ্ছে, যা প্রমাণ করে যে ভালো সিনেমা শেষ পর্যন্ত সবাইকেই এক সুতোয় গাঁথতে পারে। সমালোচকরা বাস্তবতা থেকে বিচ্ছিন্ন নন, তারা কেবল সিনেমার ভিন্ন একটি জানালা দিয়ে তাকাতে পছন্দ করেন।

 

 

আরো পড়ুন : রেইউনিয়নের জীবনসংগ্রাম নিয়ে ‘মারমাঈ’, আলিয়ঁস ফ্রঁসেজে বিশেষ প্রদর্শনী

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *