মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিওর এথেন্সের ভাষণকে কেন্দ্র করে পশ্চিমা সভ্যতার পরিচয়, ইতিহাসের ব্যাখ্যা এবং বিশ্বরাজনীতিতে যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্ব নিয়ে নতুন বিতর্ক তৈরি হয়েছে। সমালোচকদের মতে, ভাষণটিতে পশ্চিমা ঐতিহ্য রক্ষার পাশাপাশি আন্তর্জাতিক ক্ষমতার ভারসাম্য ধরে রাখার রাজনৈতিক বার্তাও রয়েছে।
ভাষণটির সমালোচনামূলক একটি বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, পশ্চিমা সভ্যতার ইতিহাসকে একটি অভিন্ন ঐতিহ্য হিসেবে তুলে ধরার মাধ্যমে বর্তমান ভূরাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতাকে সভ্যতার দ্বন্দ্ব হিসেবে ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করা হয়েছে। তবে এ ধরনের ব্যাখ্যার যথার্থতা নিয়ে ইতিহাসবিদ ও আন্তর্জাতিক রাজনীতি বিশ্লেষকদের আলোচনার অবকাশ রয়েছে।
গ্রিসের রাজধানী এথেন্সে গত ৭ই অক্টোবর প্রাচীন পনিক্স পাহাড়ে দেওয়া ভাষণে রুবিও বলেন, পশ্চিমা বিশ্বকে তার ঐতিহাসিক আত্মবিশ্বাস, জাতীয় শক্তি ও সামরিক সক্ষমতা পুনরুদ্ধার করতে হবে। তাঁর মতে, আগামী দশকে নেওয়া সিদ্ধান্ত নির্ধারণ করবে, বিশ্বে পশ্চিমা বিশ্বের নেতৃত্ব বজায় থাকবে কি না।
রুবিওর বক্তব্যে প্রাচীন গ্রিস, রোমান সাম্রাজ্য, খ্রিস্টীয় ঐতিহ্য এবং যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠার ইতিহাসকে একটি ধারাবাহিক সভ্যতাগত উত্তরাধিকার হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে। তাঁর মতে, এসব ঐতিহ্য পশ্চিমা বিশ্বের রাজনৈতিক চিন্তা, নৈতিকতা ও রাষ্ট্র পরিচালনার ভিত্তি গড়ে দিয়েছে।
সমালোচকদের দৃষ্টিতে, এই ঐতিহাসিক বর্ণনার সঙ্গে বর্তমান ভূরাজনৈতিক প্রতিযোগিতাকে যুক্ত করাই ভাষণটির গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক দিক। অর্থনৈতিক শক্তি, সামরিক সক্ষমতা ও আন্তর্জাতিক প্রভাবের প্রতিযোগিতাকে এখানে কেবল রাষ্ট্রগুলোর স্বার্থের সংঘাত হিসেবে নয়, বরং বৃহত্তর সভ্যতার ভবিষ্যৎ নির্ধারণের প্রশ্ন হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষণে এ ধরনের দৃষ্টিভঙ্গির সঙ্গে মার্কিন রাষ্ট্রবিজ্ঞানী স্যামুয়েল হান্টিংটনের ‘সভ্যতার সংঘাত’ তত্ত্বের তুলনা করা হয়। ওই তত্ত্বে শীতল যুদ্ধ-পরবর্তী বিশ্বে সাংস্কৃতিক ও সভ্যতাগত পরিচয়কে আন্তর্জাতিক সংঘাতের গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছিল। তবে রুবিওর ভাষণকে ওই তত্ত্বের সরাসরি পুনরাবৃত্তি বলার ক্ষেত্রে সতর্কতা প্রয়োজন। তাঁর বক্তব্যে জাতীয় সার্বভৌমত্ব, সামরিক শক্তি, শিল্প উৎপাদন এবং পশ্চিমা মিত্রদের সহযোগিতার বিষয়ও গুরুত্ব পেয়েছে।
রুবিও তাঁর ভাষণে প্রাচীন গ্রিক দর্শন ও জ্ঞানচর্চাকে পশ্চিমা সভ্যতার অন্যতম ভিত্তি হিসেবে তুলে ধরেন। তিনি গ্রিক চিন্তাধারার সঙ্গে পরবর্তী খ্রিস্টীয় ধর্মতত্ত্ব এবং ইউরোপীয় রাজনৈতিক ঐতিহ্যের সম্পর্ক ব্যাখ্যা করেন।
ইতিহাসের বিচারে, প্রাচীন গ্রিক দর্শনের বিকাশ খ্রিস্টধর্মের উত্থানের বহু শতাব্দী আগের ঘটনা। সে সময় গ্রিক সমাজে বহুঈশ্বরবাদী ধর্মীয় বিশ্বাস প্রচলিত ছিল। পরবর্তী সময়ে গ্রিক দর্শন খ্রিস্টীয় চিন্তাধারাকে প্রভাবিত করে। মধ্যযুগে মুসলিম পণ্ডিতদের অনুবাদ, ব্যাখ্যা ও গবেষণাও গ্রিক জ্ঞানচর্চা সংরক্ষণ এবং ইউরোপে তার পুনঃপ্রবেশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। তাই প্রাচীন গ্রিস থেকে আধুনিক পশ্চিমা সভ্যতা পর্যন্ত ইতিহাসকে একটি নিরবচ্ছিন্ন সাংস্কৃতিক ধারায় ব্যাখ্যা করা হলেও, এর মধ্যে বিভিন্ন ধর্ম, ভাষা, সমাজ ও জ্ঞানচর্চার অবদান বিবেচনা করা জরুরি। এই দীর্ঘ ইতিহাসকে একটি অভিন্ন পশ্চিমা পরিচয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ করলে সভ্যতার বিকাশে বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর অবদান আড়ালে পড়তে পারে।
রুবিওর ভাষণে আলেকজান্ডার দ্য গ্রেট, রোমান সাম্রাজ্য এবং ইউরোপীয় অভিযানের ইতিহাস উঠে এসেছে। এসব ঐতিহাসিক ঘটনাকে পশ্চিমা বিশ্বের উচ্চাকাঙ্ক্ষা, সাহসিকতা ও বিস্তারের ধারার অংশ হিসেবে ব্যাখ্যা করা হয়েছে। তবে সাম্রাজ্য বিস্তারের ইতিহাসে বিজয় ও বীরত্বের পাশাপাশি সহিংসতা, ভূমি দখল এবং স্থানীয় জনগোষ্ঠীর ওপর নিপীড়নের ঘটনাও রয়েছে। বিশেষ করে আমেরিকা মহাদেশে ইউরোপীয় উপনিবেশ প্রতিষ্ঠার সময় আদিবাসী জনগোষ্ঠী ব্যাপক ক্ষতির মুখে পড়ে।
পশ্চিমা শক্তির সাম্রাজ্য বিস্তারকে যদি সাহসিকতা ও সভ্যতার অগ্রযাত্রা হিসেবে দেখা হয়, তাহলে অন্য শক্তির সামরিক সম্প্রসারণের মূল্যায়নেও কি একই নৈতিক মানদণ্ড প্রয়োগ করা হবে?
এই প্রশ্নের সঙ্গে রুবিওর প্রাচীন পারস্যের গ্রিস আক্রমণের বর্ণনারও সম্পর্ক রয়েছে। তাঁর ভাষণে ওই সংঘাত পশ্চিমা ঐতিহ্যের ওপর আঘাতের একটি ঐতিহাসিক দৃষ্টান্ত হিসেবে উঠে এসেছে। প্রাচীন ইতিহাসের এমন উপস্থাপন বর্তমান আন্তর্জাতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতাকেও সভ্যতাগত সংঘাতের কাঠামোয় দেখার প্রবণতা জোরদার করতে পারে।
রুবিওর ভাষণের একটি গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্য ছিল ইউরোপীয় মিত্রদের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্ক জোরদার করা। তিনি ইউরোপের সামরিক ব্যয় বৃদ্ধি, শিল্প উৎপাদন সম্প্রসারণ এবং প্রতিরক্ষা সহযোগিতার উদ্যোগকে ইতিবাচক হিসেবে উল্লেখ করেন। গ্রিসকে তিনি যুক্তরাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ মিত্র হিসেবেও প্রশংসা করেন।
ভাষণে অভিবাসন, জাতীয় সার্বভৌমত্ব এবং পশ্চিমা পরিচয় নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়। এসব বিষয়কে যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের ভবিষ্যৎ সম্পর্কের বৃহত্তর আলোচনার অংশ হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে। তবে অভিবাসনকে সভ্যতার সংকট হিসেবে উপস্থাপন করলে নীতিগত বিতর্কের পরিসর সংকুচিত হতে পারে। অভিবাসনের অর্থনৈতিক, সামাজিক ও মানবিক প্রভাব বিশ্লেষণের পরিবর্তে বিষয়টি সাংস্কৃতিক পরিচয়ের সংঘাতে পরিণত হওয়ার ঝুঁকি থাকে।
এখানে পশ্চিমা পরিচয়ের রাজনৈতিক সংজ্ঞাও গুরুত্বপূর্ণ। লাতিন আমেরিকার বহু দেশে খ্রিস্টধর্ম ও ইউরোপীয় ঐতিহ্যের গভীর প্রভাব রয়েছে। তবু আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে ‘পশ্চিমা বিশ্ব’ বলতে প্রায়ই যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপকেন্দ্রিক একটি নির্দিষ্ট কৌশলগত জোটকে বোঝানো হয়। ফলে এই পরিচয় শুধু ধর্ম বা সংস্কৃতির ভিত্তিতে নির্ধারিত হয় না; ক্ষমতা, নিরাপত্তা ও রাজনৈতিক স্বার্থও এতে ভূমিকা রাখে।
এথেন্সে রুবিওর ভাষণ পশ্চিমা সভ্যতার ইতিহাস ও ভবিষ্যৎ নিয়ে একটি রাজনৈতিক বক্তব্য। এতে প্রাচীন গ্রিসের দর্শন, খ্রিস্টীয় ঐতিহ্য, জাতীয়তাবাদ এবং আধুনিক রাষ্ট্রের ক্ষমতাকে একই বর্ণনায় যুক্ত করা হয়েছে। সমর্থকদের দৃষ্টিতে, এই আহ্বান পশ্চিমা দেশগুলোর আত্মবিশ্বাস, প্রতিরক্ষা সক্ষমতা ও পারস্পরিক সহযোগিতা পুনর্গঠনের প্রচেষ্টা। অন্যদিকে সমালোচকদের মতে, ভাষণটিতে পশ্চিমা বিশ্বের নেতৃত্ব বজায় রাখার আকাঙ্ক্ষা সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য রক্ষার বক্তব্যের সঙ্গে মিশে গেছে।
বিতর্কটির কেন্দ্রে তাই একটি মৌলিক প্রশ্ন রয়েছে: সভ্যতার ঐতিহ্য রক্ষার অর্থ কি নিজেদের ইতিহাস ও মূল্যবোধ সংরক্ষণ করা, নাকি বিশ্বব্যবস্থায় অন্যদের তুলনায় শ্রেষ্ঠ অবস্থান ধরে রাখা?
রুবিওর বক্তব্যের রাজনৈতিক তাৎপর্য বুঝতে হলে এই দুই বিষয়কে আলাদা করে দেখা জরুরি। কারণ ইতিহাসের উত্তরাধিকার স্বীকার করা এবং সেই উত্তরাধিকারের ভিত্তিতে বৈশ্বিক আধিপত্য দাবি করা এক বিষয় নয়। আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ভবিষ্যৎ নির্ভর করবে রাষ্ট্রগুলো নিজেদের স্বার্থ রক্ষার পাশাপাশি অন্য জাতির সার্বভৌমত্ব ও সমান মর্যাদাকে কতটা স্বীকৃতি দেয়, তার ওপরও।
আরো পড়ুন : মধ্যপ্রাচ্যে কমছে মার্কিন প্রভাব, বদলাচ্ছে আঞ্চলিক ভূরাজনীতি