মধ্যপ্রাচ্যে কমছে মার্কিন প্রভাব, বদলাচ্ছে আঞ্চলিক ভূরাজনীতি

মধ্যপ্রাচ্যে কমছে মার্কিন প্রভাব, বদলাচ্ছে ভূরাজনৈতিক সমীকরণ

মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘদিনের কৌশলগত ভূমিকা পরিবর্তনের একটি গুরুত্বপূর্ণ পর্যায়ে পৌঁছেছে বলে বিশ্লেষণ করেছে ব্রিটিশ সাময়িকী দ্য ইকোনমিস্ট। ইরানকে ঘিরে চলমান সংকটের পাশাপাশি অঞ্চলটির নিরাপত্তা ও রাজনৈতিক ব্যবস্থায় যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকা কীভাবে বদলাচ্ছে, ২৪শে সেপ্টেম্বর প্রকাশিত এক বিশ্লেষণে তা তুলে ধরা হয়েছে।

‘হোয়েন আমেরিকা ওয়াকস অ্যাওয়ে’ শিরোনামের ওই প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইরান সংকটের পরিণতি যাই হোক না কেন, এর মধ্য দিয়ে মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘদিনের কৌশলগত অবস্থানের পরিবর্তনের একটি বৃহত্তর প্রবণতা স্পষ্ট হতে পারে।

প্রতিবেদনটির বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ওয়াশিংটন এখন মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা ও রাজনৈতিক ভারসাম্যের প্রধান নিয়ন্ত্রক হিসেবে ভূমিকা রাখার পরিবর্তে নিজস্ব স্বার্থ ও অগ্রাধিকারের ভিত্তিতে অঞ্চলটিতে তুলনামূলকভাবে কম প্রত্যক্ষ ভূমিকা রাখার দিকে এগোচ্ছে।

মধ্যপ্রাচ্যে বাইরের শক্তির প্রভাবের ইতিহাস দীর্ঘ। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর উসমানীয় সাম্রাজ্যের পতন ও বিভাজনের মধ্য দিয়ে অঞ্চলটির রাজনৈতিক মানচিত্র ও ক্ষমতার কাঠামোয় ইউরোপীয় শক্তিগুলোর ব্যাপক প্রভাব প্রতিষ্ঠিত হয়।

পরবর্তী সময়ে যুক্তরাষ্ট্র মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা কাঠামো, সামরিক জোট ও কূটনীতিতে অন্যতম প্রধান শক্তি হয়ে ওঠে। বিশেষ করে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর অঞ্চলটির তেল, নিরাপত্তা এবং বৃহত্তর ভূরাজনীতিতে ওয়াশিংটনের ভূমিকা ক্রমেই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।

দ্য ইকোনমিস্ট-এর বিশ্লেষনে বর্তমান পরিবর্তনকে সেই দীর্ঘ ইতিহাসের প্রেক্ষাপটেই দেখা হয়েছে। প্রতিবেদনে প্রশ্ন তোলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাব কমে গেলে মধ্যপ্রাচ্যের রাজনৈতিক ও নিরাপত্তা ব্যবস্থা কতটা নিজেদের আঞ্চলিক শক্তির ওপর নির্ভরশীল হয়ে উঠবে।

যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকা কমলে মধ্যপ্রাচ্যে ক্ষমতার ভারসাম্য নতুনভাবে গড়ে ওঠার সম্ভাবনা তৈরি হতে পারে। ইরান, সৌদি আরব, তুরস্ক ও ইসরায়েল—এই চার শক্তির নিজস্ব নিরাপত্তা, রাজনৈতিক ও কৌশলগত স্বার্থ রয়েছে।

মার্কিন প্রভাব তুলনামূলকভাবে কমে গেলে এসব দেশের মধ্যে প্রতিযোগিতা আরও দৃশ্যমান হতে পারে। একই সঙ্গে অভিন্ন স্বার্থের ভিত্তিতে নতুন আঞ্চলিক সমঝোতা বা সহযোগিতার উদ্যোগও দেখা যেতে পারে।

তবে এই পরিবর্তনের ফল কী হবে, তা নিশ্চিত নয়। দ্য ইকোনমিস্ট যে সম্ভাবনাগুলো তুলে ধরেছে, তার মধ্যে রয়েছে পুরোনো বিরোধ নিষ্পত্তির নামে নতুন সংঘাত ও সহিংসতা বাড়ার আশঙ্কা; পাশাপাশি মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর নিজেদের ভবিষ্যৎ নিজেরাই নির্ধারণ করার সুযোগ তৈরির সম্ভাবনাও রয়েছে।

মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলগত উপস্থিতি কমে গেলে এর প্রভাব শুধু আঞ্চলিক পর্যায়ে সীমাবদ্ধ থাকবে না। বৈশ্বিক শক্তির ভারসাম্যেও এর প্রতিফলন ঘটতে পারে।

যুক্তরাষ্ট্র সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে চীনের সঙ্গে কৌশলগত প্রতিযোগিতাকে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে। ফলে মধ্যপ্রাচ্যে তার দীর্ঘদিনের ভূমিকার পুনর্বিন্যাস বৃহত্তর বৈদেশিক নীতির অংশ হিসেবেও বিবেচিত হচ্ছে।

অন্যদিকে চীন মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশের সঙ্গে বাণিজ্য, অবকাঠামো, জ্বালানি ও কূটনৈতিক সম্পর্ক বাড়িয়েছে। রাশিয়াও অঞ্চলটির বিভিন্ন সংকট ও দ্বন্দ্বে কূটনৈতিক ও সামরিকভাবে সক্রিয় থেকেছে। ফলে যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকা পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে অন্য শক্তিগুলোর জন্যও নতুন প্রভাব বিস্তারের সুযোগ তৈরি হতে পারে।

মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন প্রভাবের পরিবর্তন মানেই যে অঞ্চলটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে কোনো একটি নতুন শক্তির নিয়ন্ত্রণে চলে যাবে, এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর সুযোগ নেই। বরং একাধিক আঞ্চলিক শক্তি ও বৈশ্বিক শক্তির পারস্পরিক প্রতিযোগিতা এবং সহযোগিতাই ভবিষ্যৎ কাঠামো নির্ধারণ করতে পারে।

এ ক্ষেত্রে ইরান, সৌদি আরব, তুরস্ক ও ইসরায়েলের মতো আঞ্চলিক শক্তিগুলোর পারস্পরিক সম্পর্ক গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। একই সঙ্গে চীন ও রাশিয়ার সঙ্গে তাদের সম্পর্কও মধ্যপ্রাচ্যের নতুন ভূরাজনৈতিক সমীকরণে ভূমিকা রাখবে।

One thought on “মধ্যপ্রাচ্যে কমছে মার্কিন প্রভাব, বদলাচ্ছে আঞ্চলিক ভূরাজনীতি”

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *