মেধা ফেরাতে দেশে সুযোগ তৈরির তাগিদ

শিক্ষামন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলন উচ্চশিক্ষা শেষে বিদেশে থাকা বাংলাদেশিদের দেশে ফেরার আহ্বান জানাচ্ছেন

উচ্চশিক্ষা শেষে বিদেশে থাকা বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের দেশে ফিরে আসার আহ্বান জানিয়েছেন শিক্ষা এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষামন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলন। একই সঙ্গে তিনি মেধাপাচারের প্রবণতা উল্টো দিকে ঘোরাতে আরও বিনিয়োগের প্রয়োজনীয়তার কথা বলেছেন।

২৪শে সেপ্টেম্বর রাজধানীর ইস্ট ওয়েস্ট বিশ্ববিদ্যালয়ে চীনা দূতাবাস আয়োজিত ‘ঢাকা চায়না ডে ২০২৬’ অনুষ্ঠানে মন্ত্রী বলেন, উচ্চশিক্ষার জন্য বিদেশে যাওয়া অনেক শিক্ষার্থী আর দেশে ফিরে আসেন না। দেশের উন্নয়নে তাঁদের মেধা কাজে লাগাতে সরকার কাজ করছে।

এর আগে মে মাসেও বিদেশে উচ্চশিক্ষা নিতে যাওয়া তরুণদের দেশে ফিরে কাজ করার আহ্বান জানিয়েছিলেন তিনি। তখন তিনি মেধাপাচারের পরিবর্তে মেধার প্রত্যাবর্তনের প্রয়োজনীয়তার কথা বলেন।

তবে বিদেশে থাকা শিক্ষার্থী ও গবেষকদের দেশে ফেরানোর ক্ষেত্রে শুধু আহ্বান কতটা কার্যকর হবে, তা নিয়ে আলোচনার সুযোগ রয়েছে। সংশ্লিষ্টদের মতে, উচ্চশিক্ষা শেষে একজন মানুষ কোথায় কাজ করবেন, কী ধরনের গবেষণার সুযোগ পাবেন, পেশাগতভাবে কতটা এগোতে পারবেন এবং তাঁর কর্মপরিবেশ কতটা নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ হবে—এসব বিষয়ও দেশে ফেরার সিদ্ধান্তে গুরুত্বপূর্ণ।

দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে শিক্ষক নিয়োগের ক্ষেত্রে স্বচ্ছ ও প্রতিযোগিতামূলক ব্যবস্থা গড়ে তোলার বিষয়টি এ আলোচনায় গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।

বিদেশে দীর্ঘ সময় গবেষণা করা একজন তরুণ গবেষক যদি মনে করেন, তাঁর গবেষণা, প্রকাশনা, শিক্ষাদানের অভিজ্ঞতা ও ভবিষ্যৎ গবেষণার পরিকল্পনার চেয়ে রাজনৈতিক পরিচয়, ব্যক্তিগত যোগাযোগ বা তদবির বেশি গুরুত্বপূর্ণ, তাহলে দেশে ফেরার সিদ্ধান্ত কঠিন হতে পারে।

এ কারণে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক নিয়োগে দেশ-বিদেশের যোগ্য প্রার্থীদের জন্য সমান সুযোগ রাখার প্রস্তাব সামনে আসছে। প্রার্থীর গবেষণার মান, প্রকাশনা, শিক্ষাদানের অভিজ্ঞতা এবং ভবিষ্যৎ গবেষণার পরিকল্পনাকে নিয়োগের প্রধান ভিত্তি করার কথাও বলা হচ্ছে।

শিক্ষকদের পারিশ্রমিকও এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ। বিদেশি বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে বেতনের সরাসরি প্রতিযোগিতা সম্ভব না হলেও এমন পারিশ্রমিক প্রয়োজন, যাতে একজন শিক্ষককে জীবিকা নির্বাহের জন্য একাধিক প্রতিষ্ঠানে অতিরিক্ত পাঠদানের ওপর নির্ভর করতে না হয়।

দেশে গবেষণার পরিবেশ তৈরি করাও মেধা ধরে রাখার অন্যতম শর্ত। একজন গবেষককে শুধু পদ দিলেই গবেষণা নিশ্চিত হয় না। প্রয়োজন উন্নত গবেষণাগার, যন্ত্রপাতি, গবেষণা সহকারী, তথ্য-উপাত্ত এবং নিয়মিত অর্থায়ন। গবেষণার জন্য প্রতিযোগিতামূলক প্রস্তাব আহ্বান করে নিরপেক্ষ মূল্যায়নের মাধ্যমে অর্থ দেওয়ার ব্যবস্থা থাকলে গবেষণার মান বাড়ানোর সুযোগ তৈরি হতে পারে।

২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে সরকার বিদেশে থাকা উচ্চশিক্ষিত বাংলাদেশিদের দেশের শিক্ষা ও গবেষণা ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত করার জন্য ‘মেধার পরিসঞ্চালন’ কৌশলের কথা জানিয়েছে। এতে বিদেশি বিশ্ববিদ্যালয় ও দেশের প্রতিষ্ঠানের মধ্যে যৌথ গবেষণা, অতিথি গবেষক কর্মসূচি, শিক্ষার্থী বিনিময় এবং অন্যান্য একাডেমিক সহযোগিতার উদ্যোগের কথা বলা হয়েছে।

একই বাজেটে বৈজ্ঞানিক গবেষণা ও উদ্ভাবন এবং নীল অর্থনীতি উন্নয়নের জন্য মোট ২০০ কোটি টাকা প্রস্তাব করা হয়েছে। এর মধ্যে গবেষণা ও উদ্ভাবনের জন্য ১০০ কোটি এবং নীল অর্থনীতি উন্নয়নের জন্য ১০০ কোটি টাকা রাখার কথা বলা হয়েছে।

বিদেশ থেকে একজন গবেষক দেশে ফিরলে তাঁর জন্য প্রাথমিক সহায়তার ব্যবস্থাও গুরুত্বপূর্ণ। বিদেশের অনেক বিশ্ববিদ্যালয়ে নতুন শিক্ষককে গবেষণাগার তৈরি, গবেষণা সহকারী নিয়োগ এবং প্রাথমিক গবেষণা কার্যক্রম শুরুর জন্য নির্দিষ্ট অর্থ দেওয়া হয়।

বাংলাদেশেও দেশে ফেরা গবেষকদের জন্য এমন প্রাথমিক গবেষণা তহবিল চালু করা যেতে পারে। এতে দেশে ফেরার পর প্রথম কয়েক বছর প্রশাসনিক ও অবকাঠামোগত সমস্যার পেছনে সময় না দিয়ে গবেষণায় মনোযোগ দেওয়ার সুযোগ তৈরি হবে।

একই সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে বৃত্তিসহ পিএইচডি ও উচ্চতর গবেষণার পদ বাড়ানো প্রয়োজন। একজন গবেষক একা বড় গবেষণা কার্যক্রম পরিচালনা করতে পারেন না। তাঁর প্রয়োজন গবেষণা সহকারী, শিক্ষার্থী ও সহকর্মীদের নিয়ে একটি দল। দেশে ফিরেও যদি সেই দল গঠনের সুযোগ না থাকে, তাহলে বিদেশে তৈরি করা গবেষণার সক্ষমতা কাজে লাগানো কঠিন হয়ে পড়তে পারে।

বিশ্ববিদ্যালয়ে পেশাগত অগ্রগতির ক্ষেত্রেও মেধাভিত্তিক মূল্যায়ন গুরুত্বপূর্ণ। কে কত বছর আগে যোগ দিয়েছেন, তার পাশাপাশি কে কী গবেষণা করেছেন, কত ভালো পড়িয়েছেন, কতজন শিক্ষার্থীকে গবেষণায় তৈরি করেছেন এবং প্রতিষ্ঠানের জ্ঞানচর্চায় কী অবদান রেখেছেন—এসব বিষয়কে পদোন্নতির ক্ষেত্রে গুরুত্ব দেওয়ার দাবি রয়েছে।

একই সঙ্গে শিক্ষকদের পাঠদানের চাপ এমন পর্যায়ে রাখা প্রয়োজন, যাতে তাঁরা নিয়মিত গবেষণা করতে পারেন। গবেষণাকে শিক্ষকের প্রধান দায়িত্বের একটি হিসেবে বিবেচনা করা হলে বিশ্ববিদ্যালয়ের মানোন্নয়ন এবং আন্তর্জাতিক গবেষণায় দেশের অংশগ্রহণ—দুই ক্ষেত্রেই সুফল পাওয়ার সুযোগ তৈরি হবে।

দেশে ফেরার সিদ্ধান্তের সঙ্গে গবেষণার স্বাধীনতার প্রশ্নও যুক্ত। গবেষণার ফল সরকারের পছন্দের সঙ্গে না মিললেও গবেষক যেন পেশাগত হয়রানি বা প্রতিশোধের আশঙ্কা না করেন—এমন পরিবেশ প্রয়োজন। বিশ্ববিদ্যালয়ের নিয়োগ, পদোন্নতি ও প্রশাসনিক দায়িত্ব বণ্টনে দলীয় পরিচয় বা রাজনৈতিক আনুগত্যের প্রভাব থাকলে রাজনৈতিকভাবে নিরপেক্ষ গবেষকদের মধ্যে অনিশ্চয়তা তৈরি হতে পারে।

তাই দেশে ফেরার আহ্বানের পাশাপাশি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে স্বাধীন গবেষণা, স্বচ্ছ নিয়োগ এবং মেধাভিত্তিক পদোন্নতির পরিবেশ তৈরির বিষয়টিও সমান গুরুত্ব পাচ্ছে।

দেশে ফেরার অর্থ সব সময় স্থায়ীভাবে বিদেশের জীবন ছেড়ে দেওয়া নয়। বিদেশে থাকা বাংলাদেশি গবেষকদের অতিথি অধ্যাপক, যৌথ গবেষক, সহতত্ত্বাবধায়ক কিংবা স্বল্পমেয়াদি শিক্ষক হিসেবে দেশের প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যুক্ত করা যায়। সরকারের প্রস্তাবিত মেধার পরিসঞ্চালন কৌশলেও বিদেশে থাকা বাংলাদেশিদের দেশের শিক্ষা ও গবেষণা ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত করার এমন উদ্যোগের কথা বলা হয়েছে।

এ ধরনের যোগাযোগ দীর্ঘমেয়াদে পূর্ণকালীন প্রত্যাবর্তনের পথও তৈরি করতে পারে। একই সঙ্গে বিদেশে থাকা গবেষকদের জ্ঞান, অভিজ্ঞতা ও আন্তর্জাতিক যোগাযোগ দেশের গবেষণা ব্যবস্থায় কাজে লাগানো সম্ভব হবে।

বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণা যেন কেবল গবেষণাপত্র প্রকাশের মধ্যে সীমাবদ্ধ না থাকে, সেদিকেও নজর প্রয়োজন। গবেষণার ফল বাস্তব জীবনের সমস্যার সমাধানে ব্যবহার এবং সেখান থেকে নতুন প্রতিষ্ঠান তৈরির সুযোগ থাকলে গবেষকদের জন্য দেশে কাজ করার নতুন ক্ষেত্র তৈরি হতে পারে।

অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণা থেকে তৈরি হওয়া ভ্যাকসিটেক এর একটি উদাহরণ। বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকদের উদ্ভাবিত টিকা প্রযুক্তিকে কেন্দ্র করে প্রতিষ্ঠানটি গড়ে ওঠে এবং পরে অক্সফোর্ডের সঙ্গে মিলে করোনাভাইরাসের টিকা তৈরির কাজে যুক্ত হয়।

বাংলাদেশেও বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণা থেকে নতুন প্রতিষ্ঠান তৈরির আইনি ও আর্থিক পথ সহজ করা গেলে গবেষণা, শিল্প ও কর্মসংস্থানের মধ্যে একটি কার্যকর সংযোগ তৈরি হতে পারে।

বিদেশে উচ্চশিক্ষা নেওয়া বাংলাদেশিদের কাজের ক্ষেত্র বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। পাঠ্যক্রম ও পাঠ্যবই তৈরি, পরীক্ষা ও মূল্যায়ন পদ্ধতির উন্নয়ন, শিক্ষক প্রশিক্ষণ, শিক্ষানীতি প্রণয়ন এবং বিভিন্ন গবেষণাভিত্তিক সরকারি কার্যক্রমেও তাঁদের দক্ষতা কাজে লাগানো যেতে পারে। এর ফলে দেশে ফিরে আসা একজন বিশেষজ্ঞের জন্য শুধু শিক্ষকতা নয়, শিক্ষা ব্যবস্থার বিভিন্ন স্তরে কাজ করার সুযোগ তৈরি হবে।

বাংলাদেশ সরকার এখন মেধাপাচারকে মেধার পরিসঞ্চালনে রূপ দেওয়ার কথা বলছে। বাজেটেও বিদেশে থাকা উচ্চশিক্ষিত বাংলাদেশিদের দেশের গবেষণা ও শিক্ষা ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত করার উদ্যোগের কথা রয়েছে। কিন্তু বিদেশে উচ্চশিক্ষা শেষে একজন বাংলাদেশি দেশে ফিরবেন কি না, সেই সিদ্ধান্তের সঙ্গে তাঁর ব্যক্তিগত ভবিষ্যৎ সরাসরি জড়িত।

কাজের সুযোগ আছে কি না। পেশাগত উন্নতির পথ আছে কি না। গবেষণার অর্থ ও অবকাঠামো আছে কি না। নিয়োগ ও পদোন্নতিতে মেধার মূল্য আছে কি না। কর্মক্ষেত্রে মর্যাদা ও নিরাপত্তা আছে কি না। নিজের যোগ্যতা দিয়ে এগিয়ে যাওয়ার সুযোগ আছে কি না। এসব প্রশ্নের উত্তরই শেষ পর্যন্ত দেশে ফেরার পরিবেশ তৈরি করবে।

শিক্ষামন্ত্রীর আহ্বানের পর আলোচনাটি শুধু ‘কেন ফিরবে’ প্রশ্নে আটকে না থেকে ‘ফিরলে কী পাবে’—সেই প্রশ্নের দিকেও এগোতে পারে। তাই “দেশে ফেরার আহ্বান যথেষ্ট নয়, দেশে ফেরার মতো সুযোগ ও পরিবেশও তৈরি করতে হবে।

 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *