লালমনিরহাটে অ্যানথ্রাক্স বা তড়কা রোগের আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। পার্শ্ববর্তী ও দেশের কয়েকটি জেলায় গবাদিপশুর মধ্যে এ রোগের প্রাদুর্ভাবের খবরের পর জেলার মানুষের মধ্যে উদ্বেগ বেড়েছে। এর প্রভাব পড়েছে স্থানীয় মাংসের বাজারেও। অনেক ক্রেতা সতর্কতার কারণে গরুর মাংস কেনা কমিয়ে দিয়েছেন। এতে ক্ষতির মুখে পড়েছেন মাংস ব্যবসায়ীরা।
সাম্প্রতিক সময়ে গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জ ও মেহেরপুরের গাংনীসহ কয়েকটি এলাকায় অ্যানথ্রাক্সের সংক্রমণের খবর পাওয়া গেছে। এসব ঘটনায় মানুষের মধ্যে রোগটি নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। বিশেষ করে অসুস্থ গবাদিপশুর সংস্পর্শে আসার বিষয়ে সতর্ক করা হচ্ছে।
অ্যানথ্রাক্স একটি প্রাণিবাহিত সংক্রামক রোগ। সাধারণত গবাদিপশু এ রোগে আক্রান্ত হয়। আক্রান্ত পশুর রক্ত, চামড়া, মাংস বা শরীরের অন্যান্য অংশের সংস্পর্শে এলে মানুষের শরীরেও জীবাণু প্রবেশ করতে পারে। অসুস্থ পশু জবাই করা, মাংস কাটাকাটি করা এবং মৃত পশুর দেহ নাড়াচাড়ার সময় ঝুঁকি বেশি থাকে।
স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, অ্যানথ্রাক্স সাধারণত মানুষ থেকে মানুষে ছড়ায় না। তবে আক্রান্ত পশুর সংস্পর্শে এসে মানুষ আক্রান্ত হতে পারে। মানুষের শরীরে রোগটির বিভিন্ন ধরনের উপসর্গ দেখা দিতে পারে। ত্বকে সংক্রমণ হলে আক্রান্ত স্থানে চুলকানি, ফোসকা ও পরে ক্ষত তৈরি হতে পারে। গুরুতর ক্ষেত্রে সংক্রমণ শরীরের ভেতরেও ছড়িয়ে পড়তে পারে। দ্রুত চিকিৎসা শুরু করা গেলে রোগটি নিরাময় করা সম্ভব।
লালমনিরহাটের বিভিন্ন কাঁচাবাজার ও মাংসের দোকানে সাম্প্রতিক সময়ে ক্রেতাদের উপস্থিতি কমেছে বলে জানিয়েছেন ব্যবসায়ীরা। অনেকে আগের তুলনায় গরুর মাংস কম কিনছেন। কেউ কেউ পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত মাংস খাওয়া এড়িয়ে চলার কথাও জানিয়েছেন।
মাংস ব্যবসায়ীদের কয়েকজন জানান, রোগের প্রাদুর্ভাবের খবর ছড়িয়ে পড়ার পর থেকেই ক্রেতাদের মধ্যে ভয় কাজ করছে। ফলে বিক্রি কমেছে। তাদের ভাষ্য, সুস্থ ও পরীক্ষিত পশুর মাংস বিক্রি করলেও সাধারণ মানুষের উদ্বেগ পুরোপুরি কাটছে না।
অন্যদিকে, অ্যানথ্রাক্সের ঝুঁকি মোকাবিলায় প্রাণিসম্পদ বিভাগ ও স্থানীয় প্রশাসনকে সতর্ক অবস্থানে থাকার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। ঝুঁকিপূর্ণ ও সংলগ্ন এলাকায় গবাদিপশুকে তড়কা রোগের প্রতিরোধী টিকা দেওয়ার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। পশুর অস্বাভাবিক মৃত্যু বা অসুস্থতার খবর পাওয়া গেলে দ্রুত সংশ্লিষ্ট দপ্তরকে জানানোর জন্যও বলা হচ্ছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কোনো গবাদিপশু হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়লে বা অস্বাভাবিকভাবে মারা গেলে সেটি জবাই করে মাংস বিক্রি বা খাওয়া যাবে না। মৃত পশুর দেহ খালি হাতে নাড়াচাড়াও করা উচিত নয়। আক্রান্ত পশুর মাংস, রক্ত বা শরীরের অংশের সংস্পর্শে এলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে।
জনসচেতনতা বাড়াতেও বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। বাজার, মসজিদ ও জনসমাগমস্থলে সচেতনতামূলক প্রচার চালানোর ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। গবাদিপশুর মালিকদের নিয়মিত টিকা দেওয়ার পাশাপাশি পশুর আচরণ ও শারীরিক অবস্থার পরিবর্তনের দিকে নজর রাখার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
লালমনিরহাটে এখন পর্যন্ত আতঙ্কের চেয়ে সতর্কতাই বড় বিষয় বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। পার্শ্ববর্তী জেলাগুলোর পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে অসুস্থ পশু জবাই বন্ধ রাখা, পশুর যথাযথ চিকিৎসা ও টিকাদান নিশ্চিত করা এবং সন্দেহজনক ঘটনা দ্রুত কর্তৃপক্ষকে জানানোই রোগের বিস্তার ঠেকানোর গুরুত্বপূর্ণ উপায়।
সানোয়ার রাকিবুল
কালিগঞ্জ (লালমনিহাট) প্রতিনিধি