সৌদি যুবরাজের তিন বাজি কি ব্যর্থতার মুখে?

সৌদি আরবের যুবরাজ মুহাম্মদ বিন সালমান; তাঁর নেতৃত্বে ভিশন ২০৩০ অর্থনৈতিক রূপান্তর পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হচ্ছে

সৌদি আরবকে বৈশ্বিক অর্থনীতি ও রাজনীতির প্রভাবশালী শক্তিতে পরিণত করার উচ্চাভিলাষী পরিকল্পনা নিয়েছিলেন যুবরাজ মুহাম্মদ বিন সালমান। ইয়েমেনে হুথি আন্দোলনকে মোকাবিলা, তেলনির্ভর অর্থনীতির রূপান্তর এবং যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে কৌশলগত সম্পর্ক জোরদার করা ছিল তাঁর পরিকল্পনার গুরুত্বপূর্ণ অংশ। কিন্তু ২০২৬ সালে আঞ্চলিক সংঘাত, অর্থনৈতিক চাপ এবং ওয়াশিংটনের সঙ্গে সম্পর্কের সীমাবদ্ধতা তাঁর কৌশল নিয়ে নতুন প্রশ্ন তৈরি করেছে।

ব্রিটিশ সাময়িকী দ্য ইকোনমিস্ট ১৯শে অক্টোবর প্রকাশিত এক বিশ্লেষণে সৌদি যুবরাজের বর্তমান পরিস্থিতিকে তাঁর জন্য একটি ‘অ্যানাস হরিবিলিস’ বা বিপর্যয়কর বছর হিসেবে বর্ণনা করেছে। বিশ্লেষণটিতে তাঁর দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার তিনটি বড় ঝুঁকি তুলে ধরা হয়েছে। তবে এসব পরিকল্পনা পুরোপুরি ব্যর্থ হয়েছে—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর আগে প্রতিটি ক্ষেত্রের অগ্রগতি ও সীমাবদ্ধতা আলাদাভাবে বিবেচনা করা প্রয়োজন।

ইয়েমেনের হুথি আন্দোলনকে পরাজিত করে সৌদি আরবের দক্ষিণ সীমান্তে স্থায়ী নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠা করা মুহাম্মদ বিন সালমানের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্য ছিল। ২০১৫ সালে সৌদি নেতৃত্বাধীন সামরিক জোট ইয়েমেনের যুদ্ধে হস্তক্ষেপ করে। কিন্তু দীর্ঘ সামরিক অভিযানেও হুথিদের সম্পূর্ণ পরাজিত করা সম্ভব হয়নি।

২০২৬ সালে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়েছে। হুথিদের হামলা, লোহিত সাগরের নৌপথের নিরাপত্তা এবং সৌদি আরবের জ্বালানি অবকাঠামোর ওপর হুমকি রিয়াদের জন্য নতুন উদ্বেগ তৈরি করেছে। ১১ই  সেপ্টেম্বর প্রকাশিত রয়টার্সের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, হুথিদের বিরুদ্ধে সরাসরি মার্কিন সামরিক হামলার সহায়তা চেয়েছিলেন সৌদি যুবরাজ। তবে ওয়াশিংটন সে সময় সরাসরি হামলায় অংশ নিতে রাজি হয়নি; গোয়েন্দা তথ্য ও লক্ষ্য নির্ধারণে সহায়তার কথা জানিয়েছিল।

এ ঘটনা সৌদি আরবের নিরাপত্তা কৌশলের একটি সীমাবদ্ধতা সামনে আনে: ঘনিষ্ঠ মিত্রের সঙ্গে সম্পর্ক থাকলেও সব পরিস্থিতিতে তার প্রত্যাশিত সামরিক সহায়তা পাওয়া নিশ্চিত নয়।

সৌদি আরবের অর্থনৈতিক রূপান্তরের কেন্দ্রীয় পরিকল্পনা ‘ভিশন ২০৩০’। এর লক্ষ্য তেল আয়ের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে পর্যটন, প্রযুক্তি, শিল্প, বিনোদন ও অন্যান্য খাতে অর্থনীতির ভিত্তি সম্প্রসারণ করা। বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণ এবং বেসরকারি খাতের বিকাশও এই পরিকল্পনার গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

তবে উচ্চাভিলাষী পরিকল্পনা বাস্তবায়নে অর্থায়ন, প্রকল্পের ব্যয়, বিনিয়োগের গতি এবং প্রত্যাশিত মুনাফা নিয়ে চ্যালেঞ্জ রয়েছে। সৌদি আরবের সার্বভৌম সম্পদ তহবিল ২০২৬ সালে নতুন পাঁচ বছরের কৌশল গ্রহণের প্রস্তুতি নেয়। রয়টার্সের ফেব্রুয়ারির প্রতিবেদনে বলা হয়, নতুন পরিকল্পনায় শিল্প, খনিজ, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও পর্যটনের ওপর গুরুত্ব দেওয়ার পাশাপাশি ব্যয়বহুল কিছু বৃহৎ প্রকল্পের পরিসর কমানো বা পুনর্বিন্যাসের বিষয় বিবেচনা করা হচ্ছে।

এ ধরনের পরিবর্তনকে অর্থনৈতিক পরিকল্পনার ব্যর্থতার চূড়ান্ত প্রমাণ বলা যায় না। বরং এটি ব্যয় ও অগ্রাধিকার পুনর্মূল্যায়নের ইঙ্গিতও হতে পারে। তবে প্রকল্পের ব্যয়, বিনিয়োগের বাস্তব প্রবাহ এবং অর্থনৈতিক সুফল কতটা অর্জিত হচ্ছে, তার ওপর ভিশন ২০৩০-এর সাফল্য নির্ভর করবে।

সৌদি আরবের নিরাপত্তা ও আঞ্চলিক কৌশলে যুক্তরাষ্ট্র দীর্ঘদিন ধরে গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার। মুহাম্মদ বিন সালমানের আমলেও দুই দেশের প্রতিরক্ষা, জ্বালানি ও বিনিয়োগ সম্পর্কের গুরুত্ব বজায় রয়েছে। ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে তাঁর সম্পর্কও এই কৌশলের অংশ।

তবে ব্যক্তিকেন্দ্রিক রাজনৈতিক সম্পর্কের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। যুক্তরাষ্ট্রের নিজস্ব সামরিক অগ্রাধিকার, অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক হিসাব এবং আঞ্চলিক সংঘাতের ব্যয় নিয়ে উদ্বেগ সৌদি আরবের প্রত্যাশার সঙ্গে সব সময় সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।

হুথিদের বিরুদ্ধে সরাসরি মার্কিন হামলায় অংশ না নেওয়ার সিদ্ধান্ত এই বাস্তবতার একটি উদাহরণ। ওয়াশিংটন গোয়েন্দা সহায়তা দিতে রাজি হলেও সৌদি আরবের প্রত্যাশিত সামরিক পদক্ষেপ নেয়নি। ফলে রিয়াদের সামনে নিজস্ব প্রতিরক্ষা সক্ষমতা বাড়ানো এবং অন্যান্য আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক অংশীদারের সঙ্গে সম্পর্ক বিস্তারের প্রয়োজনীয়তা আরও স্পষ্ট হয়েছে।

সৌদি আরবের বার্ষিক ‘ফিউচার ইনভেস্টমেন্ট ইনিশিয়েটিভ’ সম্মেলন বিশ্ব বিনিয়োগকারী, আর্থিক প্রতিষ্ঠানের শীর্ষ কর্মকর্তা এবং নীতিনির্ধারকদের একত্র করার গুরুত্বপূর্ণ আয়োজন। ‘মরুভূমির ডাভোস’ নামে পরিচিত এই সম্মেলন সৌদি আরবের অর্থনৈতিক রূপান্তরের পরিকল্পনা আন্তর্জাতিক পরিসরে তুলে ধরারও একটি মাধ্যম।

কিন্তু ২০২৬ সালের সম্মেলনটি ২৬ থেকে ২৯ অক্টোবর রিয়াদে হওয়ার কথা থাকলেও আঞ্চলিক সংঘাত ও নিরাপত্তা পরিস্থিতির কারণে ২০২৭ সাল পর্যন্ত স্থগিত করা হয়েছে। ১৯শে অক্টোবর রয়টার্স এ তথ্য জানায়।

সম্মেলন স্থগিত হওয়া সৌদি আরবের জন্য একটি কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক ধাক্কা। এতে আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারীদের সঙ্গে যোগাযোগের গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ পিছিয়ে গেছে। তবে শুধু এই সিদ্ধান্তের ভিত্তিতে বিনিয়োগকারীদের আস্থা ভেঙে পড়েছে বা সৌদি অর্থনৈতিক রূপান্তর ব্যর্থ হয়েছে—এমন দাবি করা যায় না। নিরাপত্তা পরিস্থিতি, বিনিয়োগ প্রবাহ এবং বৃহৎ প্রকল্পের অগ্রগতি মিলিয়ে বিষয়টি মূল্যায়ন করতে হবে।

মুহাম্মদ বিন সালমানের পরিকল্পনার তিনটি ক্ষেত্র—ইয়েমেনের নিরাপত্তা, অর্থনৈতিক রূপান্তর এবং যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক—এখন পরস্পরের সঙ্গে যুক্ত চ্যালেঞ্জের মুখে। আঞ্চলিক সংঘাত নিরাপত্তা ব্যয় বাড়াতে পারে, বিনিয়োগকারীদের সিদ্ধান্তে প্রভাব ফেলতে পারে এবং অর্থনৈতিক প্রকল্পের অগ্রাধিকার বদলে দিতে পারে। একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক সহায়তার সীমাবদ্ধতা সৌদি আরবকে নিজস্ব কৌশল পুনর্বিবেচনায় উৎসাহিত করতে পারে।

তবে সৌদি আরবের আর্থিক সম্পদ, জ্বালানি খাতে অবস্থান এবং অর্থনীতি বহুমুখী করার প্রচেষ্টা দেশটির হাতে বিকল্পও রেখেছে। এখন গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো, রিয়াদ কত দ্রুত নিরাপত্তা পরিস্থিতি সামাল দিতে পারে, ব্যয়বহুল প্রকল্পগুলোকে বাস্তবসম্মত করতে পারে এবং আন্তর্জাতিক অংশীদারদের সঙ্গে সম্পর্কের ভারসাম্য বজায় রাখতে পারে।

দ্য ইকোনমিস্ট-এর বিশ্লেষণ সৌদি যুবরাজের কৌশলগত ঝুঁকিগুলো সামনে এনেছে। কিন্তু ২০২৬ সাল তাঁর পরিকল্পনার চূড়ান্ত ব্যর্থতার বছর হয়ে উঠবে কি না, তা নির্ভর করবে পরবর্তী সিদ্ধান্ত, আঞ্চলিক সংঘাতের গতিপ্রকৃতি এবং অর্থনৈতিক সংস্কারের বাস্তব ফলাফলের ওপর।

 

 

আরো পড়ুন : লোহিত সাগর থেকে হরমুজ: বিশ্বরাজনীতির কেন্দ্রে অর্থনৈতিক স্বার্থ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *