বাংলাদেশে সরকারি সেবায় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যবহার বাড়ানোর ক্ষেত্রে প্রযুক্তির কার্যকারিতার পাশাপাশি তথ্যের নির্ভুলতা, ব্যক্তিগত তথ্যের সুরক্ষা, পরিচালন ব্যয় ও ভুলের দায় নির্ধারণের ওপর গুরুত্ব দেওয়ার দাবি উঠেছে। আন্তর্জাতিক টেলিযোগাযোগ ইউনিয়নের জিনি.এআই উদ্যোগ সরকারি ও জনস্বার্থসংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানকে নিজেদের প্রয়োজন অনুযায়ী কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক সেবা তৈরির সুযোগ দিতে পারে। তবে শুধু প্রযুক্তি হাতে পেলেই স্থানীয় সক্ষমতা ও নাগরিকের সুরক্ষা নিশ্চিত হবে না।
ভোলা জেলার লালমোহন উপজেলার ফুলবাগিচা গ্রামের একজন কৃষক সহজ বাংলায় আবহাওয়ার তথ্য জানতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক সহকারীর সাহায্য নিলেন। সহকারী তাঁকে উত্তর দিল। কিন্তু সেই তথ্য পুরোনো হলে, কিংবা অন্য এলাকার আবহাওয়ার সঙ্গে সম্পর্কিত হলে, ভুল সিদ্ধান্তে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে তাঁর ফসল ও আয়। এ ধরনের ঝুঁকি মোকাবিলায় তথ্যের উৎস, হালনাগাদের সময়, প্রযোজ্য এলাকা এবং ভুল উত্তরের জন্য দায়ী প্রতিষ্ঠানের পরিচয় স্পষ্ট করা জরুরি।
আন্তর্জাতিক টেলিযোগাযোগ ইউনিয়নের উদ্যোগটির নাম জিনি.এআই। এর পূর্ণরূপের অর্থ, বুদ্ধিমত্তা ও ন্যায্যতার মাধ্যমে বৈশ্বিক ক্ষমতায়ন। উদ্যোগটির লক্ষ্য সরকারি ও জনস্বার্থসংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানকে নিজেদের প্রয়োজন অনুযায়ী কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক সেবা তৈরি, পরিচালনা ও পরিবর্তনের সুযোগ দেওয়া।
উদ্যোগটির পরিচিতি অনুযায়ী, এটি উন্মুক্ত উৎসভিত্তিক কাঠামো। এর বিভিন্ন অংশ আলাদাভাবে ব্যবহার করা যায়। এটি একটি নির্দিষ্ট ভাষাভিত্তিক মডেলের ওপরও নির্ভরশীল নয়। ২০২৬ সালের জুলাইয়ে এর আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরু হয়।
আন্তর্জাতিক টেলিযোগাযোগ ইউনিয়নের টেলিযোগাযোগ উন্নয়ন ব্যুরোর পরিচালক কসমাস লাকিসন জাভাজাভা ২২ অক্টোবর প্রকাশিত এক লেখায় স্থানীয় দক্ষতা ও প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার গুরুত্ব তুলে ধরেছেন। উদ্যোগটির মূল ভাবনা হলো, সরকারি প্রতিষ্ঠান যেন নিজেদের প্রয়োজন বুঝে প্রযুক্তি ব্যবহার করতে পারে এবং পরিবর্তনের জন্য সব সময় বাইরের প্রতিষ্ঠানের ওপর নির্ভর করতে না হয়।
প্রকল্পের পরিচিতিতে লাইসেন্স ফি ছাড়াই ব্যবহার, নিজস্ব সার্ভার বা মেঘভিত্তিক ব্যবস্থায় স্থাপন এবং বিদ্যমান সরকারি ডিজিটাল ব্যবস্থার সঙ্গে সংযুক্ত করার সুযোগের কথা বলা হয়েছে। যাচাই করা উপাদান একাধিক দপ্তরে ব্যবহার করা গেলে সময় ও অর্থ সাশ্রয় হতে পারে। প্রযুক্তি সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান বেছে নেওয়ার ক্ষেত্রেও স্বাধীনতা বাড়তে পারে। তবে এসব সুবিধা বাস্তবে কতটা পাওয়া যাবে, তা নির্ভর করবে বাস্তবায়ন, দক্ষ জনবল, অবকাঠামো ও দীর্ঘমেয়াদি রক্ষণাবেক্ষণের ওপর।
বাংলাদেশের সঙ্গে জিনি.এআইয়ের সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে আন্তর্জাতিক টেলিযোগাযোগ ইউনিয়ন ও আন্তর্জাতিক তড়িৎ ও ইলেকট্রনিক প্রকৌশলীদের সংস্থার যৌথ উদ্যোগে আয়োজিত ‘জেনএআই ফর গুড’ প্রতিযোগিতার মাধ্যমে। ২০২৬ সালের জুলাইয়ে ঘোষিত বিজয়ীদের মধ্যে বাংলাদেশের পলিসেন্স এআইয়ের ‘মেওয়া’ উদ্যোগ রয়েছে। এর লক্ষ্য জটিল আবহাওয়ার তথ্য কৃষকদের জন্য সহজ বাংলায় রূপান্তর করা।
প্রতিযোগিতায় ৭৯টি দেশের তিন শতাধিক প্রস্তাবের মধ্য থেকে নির্বাচিত নয়টি চূড়ান্ত উদ্যোগের মধ্যে তিনটি বিজয়ী হয়। মেওয়া কৃষকদের জন্য স্থানীয় আবহাওয়ার সতর্কবার্তা, খরা মোকাবিলার প্রস্তুতি এবং ফসলের ঝুঁকি সম্পর্কে নির্দেশনা দেওয়ার লক্ষ্য নিয়ে কাজ করছে।
উদ্যোগটির সম্ভাব্য উপকারিতা থাকলেও প্রতিযোগিতায় স্বীকৃতি পাওয়া আর মাঠপর্যায়ে কার্যকর সেবা দেওয়া এক বিষয় নয়। কতজন কৃষক এই সেবা ব্যবহার করছেন, তাঁরা নির্দেশনা বুঝতে পারছেন কি না এবং তথ্য কতটা নির্ভুল—এসবের প্রমাণ প্রয়োজন। ভুল তথ্য পেলে অভিযোগ জানানোর ব্যবস্থা ও প্রতিকার পাওয়ার সুযোগও থাকতে হবে।
জিনি.এআইয়ের অন্যতম আকর্ষণ হলো লাইসেন্স ফি ছাড়াই ব্যবহারের সুযোগ। তবে লাইসেন্স ফি না থাকলেই কোনো সেবা বিনা খরচে চালানো সম্ভব নয়।
সেবা পরিচালনায় যন্ত্রপাতি, বিদ্যুৎ, তথ্যের নিরাপত্তা এবং দক্ষ জনবলের প্রয়োজন হবে। সরকারি নথি সাজানো, বাংলা ভাষায় কার্যকারিতা যাচাই, কর্মীদের প্রশিক্ষণ ও নিয়মিত ত্রুটি সংশোধনেও অর্থ ব্যয় হবে। নাগরিককে একটি নির্ভরযোগ্য উত্তর দিতে মোট কত খরচ হচ্ছে, তার হিসাব প্রকাশ করা প্রয়োজন।
প্রযুক্তির ওপর নিয়ন্ত্রণ বাড়ানোর ক্ষেত্রেও বাস্তব সীমাবদ্ধতা রয়েছে। উন্মুক্ত কাঠামো ব্যবহার করলেও যন্ত্রপাতি, ভাষাভিত্তিক মডেল, মেঘভিত্তিক সেবা কিংবা বিশেষজ্ঞের জন্য বাইরের প্রতিষ্ঠানের ওপর নির্ভরতা থাকতে পারে। তাই কোন কোন ক্ষেত্রে নির্ভরতা রয়েছে, বিকল্প কী এবং বর্তমান সরবরাহকারী সরে গেলে স্থানীয় প্রতিষ্ঠান সেবা চালাতে পারবে কি না, তা যাচাই করা জরুরি।
সরকারি প্রতিষ্ঠানের হাতে প্রযুক্তির নিয়ন্ত্রণ বাড়লেই নাগরিকের তথ্য স্বয়ংক্রিয়ভাবে সুরক্ষিত হয় না। কে ব্যক্তিগত তথ্য দেখতে পারবেন, কত দিন তা সংরক্ষণ করা হবে এবং অন্য কাজে ব্যবহার করা যাবে কি না—এসব বিষয়ে স্পষ্ট নীতিমালা প্রয়োজন।
সেবা দেওয়ার জন্য যতটুকু তথ্য প্রয়োজন, তার বেশি সংগ্রহ না করার নীতিও গুরুত্বপূর্ণ। উন্মুক্ত উৎসের সুবিধা হলো, প্রযুক্তির গঠন পরীক্ষা করার সুযোগ পাওয়া যায়। তবে সেই পরীক্ষা করতে দক্ষ জনবল, অর্থায়ন এবং স্বাধীনভাবে কাজ করার পরিবেশ থাকতে হবে।
বাংলা ভাষায় কার্যকারিতা যাচাইয়ের ক্ষেত্রেও শুধু প্রমিত বাংলায় উত্তর দেওয়ার ক্ষমতা যথেষ্ট নয়। আঞ্চলিক ভাষা, অসম্পূর্ণ বাক্য কিংবা বাংলা ও অন্য ভাষা মিলিয়ে করা প্রশ্নেও সেবাটি কতটা কার্যকর, তা পরীক্ষা করতে হবে। নারী, প্রতিবন্ধী ব্যক্তি এবং প্রযুক্তি ব্যবহারে কম দক্ষ মানুষের অভিজ্ঞতাও মূল্যায়নে অন্তর্ভুক্ত করা প্রয়োজন।
প্রয়োজনে কথা বলে ব্যবহার এবং সাধারণ মুঠোফোনে তথ্য পাওয়ার ব্যবস্থা তৈরি করা যেতে পারে। তবে এসব সুবিধা আগে থেকেই প্রস্তুত রয়েছে, এমন ধারণা করা ঠিক হবে না। কোন মাধ্যমে মানুষ সহজে তথ্য পাচ্ছেন, তা পরীক্ষা করে সিদ্ধান্ত নিতে হবে। এ ক্ষেত্রে স্থানীয় ভাষায় তথ্য ব্যাখ্যা, সতর্কবার্তা যাচাই ও মানুষের মতামত সংগ্রহে কমিউনিটি বেতার এবং কৃষি সম্প্রসারণকর্মীরা ভূমিকা রাখতে পারেন।
আবহাওয়ার তথ্যের ক্ষেত্রে উৎস, প্রকাশের সময় এবং কোন এলাকার জন্য তা প্রযোজ্য, তা স্পষ্টভাবে জানানো দরকার। পুরোনো পূর্বাভাসকে বর্তমান পরিস্থিতির তথ্য হিসেবে উপস্থাপন করা হলে কৃষক ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারেন।
কৃষি, স্বাস্থ্য ও সামাজিক সুরক্ষার মতো গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার উত্তরের পাশাপাশি দায়িত্বশীল মানুষের তদারকি নিশ্চিত করা প্রয়োজন। কোনো সহকারীর দেওয়া উত্তরকে সরাসরি সরকারের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হিসেবে দেখানো উচিত নয়।
আন্তর্জাতিক সহযোগিতার ক্ষেত্রেও বাংলাদেশের জন্য সুযোগ রয়েছে। ২০২৫ সালে অনুষ্ঠিত বিশ্ব টেলিযোগাযোগ উন্নয়ন সম্মেলনের ৯১ নম্বর সিদ্ধান্তে উন্নয়নশীল দেশগুলোর কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহারের জন্য অবকাঠামো, প্রস্তুতি যাচাই, দক্ষতা উন্নয়ন ও অভিজ্ঞতা বিনিময়ের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
বাংলাদেশের লক্ষ্য হওয়া উচিত, আন্তর্জাতিক সহযোগিতায় অর্জিত জ্ঞান ও দক্ষতা যেন স্থানীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে স্থায়ীভাবে গড়ে ওঠে। শুধু প্রযুক্তি আমদানি নয়, সেটি পরিচালনা, উন্নয়ন ও প্রয়োজনমতো পরিবর্তন করার সক্ষমতাও তৈরি করতে হবে।
জিনি.এআইয়ের মতো উদ্যোগ বাস্তবায়নের আগে বিদ্যমান কাজগুলোর মূল্যায়ন করা যেতে পারে। এ জন্য তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি বিভাগ, বাংলাদেশ কম্পিউটার কাউন্সিল, সংশ্লিষ্ট সরকারি সংস্থা, বিশ্ববিদ্যালয় ও নাগরিক সমাজকে নিয়ে একটি সমন্বিত উদ্যোগ নেওয়ার প্রস্তাব রয়েছে।
প্রথম ৯০ দিনে মেওয়াসহ সংশ্লিষ্ট উদ্যোগগুলোর অগ্রগতি, সীমাবদ্ধতা, নিরাপত্তা, বাংলা ভাষায় কার্যকারিতা এবং সম্ভাব্য ব্যয় পর্যালোচনা করা যেতে পারে। মূল্যায়নের ফল প্রকাশ করে কোথায় নতুন অর্থায়ন প্রয়োজন, তা নির্ধারণ করা সম্ভব।
পরবর্তী ছয় মাসে নির্বাচিত এলাকায় সীমিতসংখ্যক ব্যবহারকারীকে নিয়ে পরীক্ষামূলক সেবা চালু করা যেতে পারে। সম্প্রসারণের আগে স্বাধীন মূল্যায়নে দেখতে হবে, তথ্য কতটা নির্ভুল, ব্যবহারকারীরা উত্তর বুঝতে পারছেন কি না, অভিযোগের প্রতিকার মিলছে কি না এবং সেবা পরিচালনায় কত ব্যয় হচ্ছে।
পরীক্ষার ফল সন্তোষজনক না হলে সেবার পরিধি কমানো বা তা বন্ধ করার শর্তও শুরুতেই নির্ধারণ করা প্রয়োজন। পাশাপাশি স্থানীয় প্রকৌশলী, ভাষাবিশেষজ্ঞ, সরকারি সেবাকর্মী ও স্থানীয় জনগোষ্ঠীর দক্ষতা উন্নয়নে অর্থ বরাদ্দ করতে হবে।
দীর্ঘমেয়াদি রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব কার, তা স্পষ্ট করতে হবে। দেশীয় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানকে যুক্ত করার পাশাপাশি চুক্তিতে জ্ঞান হস্তান্তর, তথ্য স্থানান্তর এবং প্রয়োজনে সরবরাহকারী পরিবর্তনের সুযোগ নিশ্চিত করা দরকার।
জিনি.এআই বাংলাদেশের জনসেবায় নতুন সম্ভাবনা তৈরি করতে পারে। তবে এর সাফল্য শুধু প্রযুক্তির আধুনিকতা কিংবা কম খরচে সেবা চালুর মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। স্থানীয় দক্ষতা, তথ্যের নির্ভুলতা, নাগরিকের গোপনীয়তা এবং ভুলের প্রতিকার নিশ্চিত করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
শেষ পর্যন্ত সাফল্যের মাপকাঠি হবে, ফুলবাগিচার কৃষক সময়োপযোগী ও নির্ভরযোগ্য তথ্য পাচ্ছেন কি না, সেই তথ্য বুঝে সিদ্ধান্ত নিতে পারছেন কি না এবং ভুল হলে প্রতিকার পাচ্ছেন কি না। মানুষের অভিজ্ঞতা ও স্বাধীন মূল্যায়নের ফলই জনসেবায় এই প্রযুক্তির কার্যকারিতা নির্ধারণ করবে।
আরো পড়ুন : বাংলাদেশে অফিস ও অবকাঠামো স্থাপনে মেটাকে বিটিআরসির আহ্বান