কাগজে আগুনের আঁচড়ে স্মৃতি, যন্ত্রণা ও অস্তিত্বের গল্প

গ্যালারি চিত্রকে ‘অনল কাব্য’ প্রদর্শনীতে সাজানো খয়েরি, সেপিয়া ও কয়লা-কালো রঙের শিল্পকর্ম

ইথান হক

গ্যালারি চিত্রকের সাদা দেয়ালে যখন মেহেদী কামালের “অনল কাব্য” প্রদর্শনীটি দৃষ্টিগোচর হয়, তখন প্রথম যে অনুভূতিটি দর্শককে স্পর্শ করে তা হলো — একটি প্রাচীন পান্ডুলিপির গন্ধ। সেপিয়া, খয়েরি, গাঢ় বাদামী ও কয়লা-কালোর এই একরঙা প্যালেট কোনো আধুনিক রঙিন প্রদর্শনীর চেয়ে বরং কোনো হারিয়ে যাওয়া ইতিহাসের দলিলের কথা বেশি মনে করিয়ে দেয়। অধ্যাপক নিসার হোসেন তাঁর ভূমিকায় যে “মুখচোরা স্বভাবের শিল্পী”-র কথা বলেছেন, এই প্রদর্শনীটি যেন সেই নীরবতা ভাঙারই এক উচ্চস্বরে ঘোষণা।

আগুন দিয়ে কাগজের বুকে ছবি আঁকছেন শিল্পী এস কে মেহেদী কামাল। তাঁর রেখায় উঠে এসেছে মানুষের মুখ, পশুপাখি, গ্রামীণ জীবন, নিঃসঙ্গতা ও অস্তিত্বের নানা প্রশ্ন। আগুনের তাপে তৈরি এসব ছবিতে একদিকে রয়েছে পুরোনো পাণ্ডুলিপির আবহ, অন্যদিকে রয়েছে মানুষের যন্ত্রণা ও অস্থিরতার প্রকাশ। এই ভিন্নধর্মী শিল্পচর্চা নিয়ে রাজধানীর গ্যালারি চিত্রকে শুরু হয়েছে তাঁর দ্বিতীয় একক শিল্পকর্ম প্রদর্শনী ‘অনল কাব্য’।

১৪ই  অক্টোবর শুরু হওয়া প্রদর্শনীটি চলবে ২২শে অক্টোবর পর্যন্ত। দর্শনার্থীরা প্রতিদিন সকাল ১১টা থেকে রাত ৮টা পর্যন্ত প্রদর্শনী দেখতে পারবেন।

১৯৭৩ সালে জামালপুরে জন্ম নেওয়া মেহেদী কামাল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদ থেকে ১৯৯৬ সালে স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করেন। দীর্ঘদিন তিনি গ্রাফিক ডিজাইন, বিজ্ঞাপনশিল্প ও ‘দেশ’ টিভির শিল্পনির্দেশক হিসেবে কাজ করেছেন। বর্তমানে তিনি স্বাধীন শিল্পী হিসেবে কাজ করছেন। ২০১০ সালে শিল্পাঙ্গনে তাঁর প্রথম একক প্রদর্শনী অনুষ্ঠিত হয়। প্রায় দেড় দশক পরে ফিরে আসা এক শিল্পীর পরিপক্ব, পরীক্ষামূলক ও দার্শনিক অবস্থানের দলিল এবারের প্রদর্শনীতে তিনি নিজের শিল্পভাবনা ও মাধ্যমের নতুন পরীক্ষা তুলে ধরেছেন।

“অনল কাব্য”-এর সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য দিক হলো এর মাধ্যমগত অভিনবত্ব। মেহেদী কামাল যে কৌশলটি ব্যবহার করেছেন তা পাইরোগ্রাফি — সাধারণত কাঠ বা চামড়ায় ব্যবহৃত এই কৌশলকে তিনি কাগজে নিয়ে এসেছেন। শক্ত কাগজে বিশেষ রাসায়নিক প্রয়োগের পর লোহার চাতাল বা নিজেন দিয়ে লসিয়ে তিনি টোনের যে পরিসর তৈরি করেন — হালকা বেইজ থেকে গাঢ় কয়লা-কালো পর্যন্ত — তা জলরঙের ওয়াশের মতোই প্রবাহমান, অথচ আগুনের তাপ নিয়ন্ত্রণ করে এসব সূক্ষ্ম পার্থক্য তৈরি করতে হয়।

এই মাধ্যমে ভুল সংশোধনের সুযোগ সীমিত। “পরিমার্জনার সুযোগ প্রায় নেই বললেই চলে”। প্রতিটি রেখা ও দাগের ক্ষেত্রে শিল্পীকে সতর্ক সিদ্ধান্ত নিতে হয়। আগুনের এই অপরিবর্তনীয় বৈশিষ্ট্য তাঁর কাজের প্রকাশভঙ্গিতেও বিশেষ মাত্রা যোগ করেছে। ফলে দর্শক যখন কোনো ছবির সামনে দাঁড়ান, তখন তিনি শুধু ছবিটি দেখেন না, তিনি দেখেন সেই মুহূর্তগুলো যেখানে আগুন কাগজকে স্পর্শ করেছে — এবং সেই স্পর্শ আর ফেরানো যায়নি।

প্রদর্শনীর অধিকাংশ কাজেই খয়েরি, বাদামি ও কালচে রঙের বিভিন্ন মাত্রা দেখা যায়। দেখলে মনে হয় — এগুলো বর্তমানের কোনো  ছবি নয়, বরং হারিয়ে যাওয়া কোনো অতীতের স্মৃতিলিপি। রঙের এই সীমিত ব্যবহার ছবিগুলোতে পুরোনো আলোকচিত্র কিংবা প্রাচীন পাণ্ডুলিপির আবহ তৈরি করেছে।

তবে এসব ছবি কেবল অতীতের স্মৃতি ধারণ করে না। মানুষের মুখ, চোখ ও প্রাণীর অবয়বে ফুটে উঠেছে উদ্বেগ, যন্ত্রণা ও অস্থিরতা। কোনো ছবিতে একটি বড় চোখ দর্শকের দিকে তাকিয়ে আছে। কোথাও মানুষের মুখ বিকৃত, কোথাও দাঁত বের করা মুখে চিৎকারের অভিব্যক্তি। এসব অবয়বের মধ্য দিয়ে মানুষের ভেতরের চাপ ও যন্ত্রণার অনুভূতি প্রকাশ পেয়েছে।

শিল্পী রেখা ব্যবহারের ক্ষেত্রেও প্রচলিত মসৃণতার পথে হাঁটেননি। তাঁর অনেক রেখা কাঁপা, ভাঙা ও অস্থির। কোথাও রেখার ওপর রেখা পড়েছে। কোথাও জ্যামিতিক আকৃতি ও ছায়া মিলিয়ে তৈরি হয়েছে জটিল বিন্যাস। এসব উপাদান ছবিগুলোতে এক ধরনের এক্সপ্রেশনিস্ট তীব্রতা তৈরি করেছে।

প্রদর্শনী জুড়ে কয়েকটি মোটিফ বারবার ফিরে আসে — এগুলো মেহেদীর ভিজ্যুয়াল শব্দভাণ্ডারের মূল উপাদান । চোখ ও মুখ  প্রদর্শনীর সবচেয়ে শক্তিশালী উপাদান। কিছু ছবিতে চোখ একক, বিশাল, দর্শকের দিকে তাকিয়ে — যেন কোনো সাক্ষী। আবার কিছু ছবিতে (বিশেষ করে ২০২৬ সালের কাজগুলোতে) মুখ বিকৃত, চিৎকাররত, দাঁত বের করা — গ্রোটেস্ক ও এক্সপ্রেশনিস্ট। এই মুখগুলো যেন “পোড়া মানুষের দেহ-মনের কষ্ট” প্রকাশ করছে।

মেহেদীর কাজে ঘোড়া শুধু প্রাণী নয় — এটি শক্তি, গতি, ও অদম্য প্রাণশক্তির প্রতীক। ঘোড়া প্রায়ই অশান্ত, লাফানো, বা যুদ্ধরত অবস্থায় চিত্রিত। গরু ও গ্রামীণ দৃশ্য বাংলা পল্লীজীবনের চিত্র — গরু, ষাঁড়, পল্লীঘর, মাঠ। এগুলো শিল্পীর মাটির সাথে যোগসূত্র। তবে এই গ্রামীণ দৃশ্যগুলোও আদর্শায়িত নয় — তাতেও আছে বিক্ষোভ, বিশৃঙ্খলা, অস্থিরতা।

আঁকন পাখি ও  কুকুর বাস্তবধর্মী প্রাণীচিত্রণ। এগুলো প্রদর্শনীর সবচেয়ে শান্ত মুহূর্ত — যেন বিমূর্ত ঝড়ের মাঝে কয়েকটি স্থির দ্বীপ।

চেয়ার সবচেয়ে রহস্যময় মোটিফ। চেয়ার প্রায়ই খালি — বা তার চারপাশে বিশৃঙ্খলা। এটি অনুপস্থিতি, স্মৃতি, বা প্রতীক্ষার প্রতীক হতে পারে। কলসি ও স্থিরজীবন ২০২১ সালের কাজগুলোতে প্রাধান্য পেয়েছে। মাটির কলসি, মগ, লতাপাতা — বাংলার ঘরোয়া জীবনের চিত্র। সময়ের সাথে সাথে এই স্থিরজীবনগুলোও বেশি বিমূর্ত ও পরীক্ষামূলক হয়ে উঠেছে।

পদ্মপাতা ও প্রকৃতি জলজ উদ্ভিদ, লতা — প্রকৃতির সাথে শিল্পীর সংযোগ।

প্রদর্শনীতে ২০২১, ২০২৫ ও ২০২৬ সালের কাজ রয়েছে। বিভিন্ন বছরের ছবি পাশাপাশি দেখলে শিল্পীর মাধ্যম ব্যবহারের পরিবর্তন লক্ষ করা যায়। ২০২১ সালের কাজগুলোতে স্থিরজীবন ও পরিচিত বস্তুর উপস্থিতি তুলনামূলক বেশি। ২০২৫ সালের কাজে প্রাণীচিত্রের পাশাপাশি রেখা ও অবয়ব নিয়ে পরীক্ষা দেখা যায়। ২০২৬ সালের কয়েকটি কাজে মানুষের বিকৃত মুখ, জটিল জ্যামিতিক বিন্যাস ও বিমূর্ত প্রকাশভঙ্গি বিশেষভাবে চোখে পড়ে।

এই পরিবর্তনকে শিল্পীর ধারাবাহিক অনুসন্ধানের অংশ হিসেবে দেখা যায়। আগুনের তাপ দিয়ে ছবি তৈরির সীমাবদ্ধতাকে কাজে লাগিয়ে তিনি কীভাবে রেখা, ছায়া ও অবয়বের নতুন সম্পর্ক তৈরি করছেন, বিভিন্ন সময়ের কাজের তুলনায় তা বোঝা যায়।

মেহেদী “পোড়া মানুষের দেহ-মনের কষ্টের অনুভূতি” ধারণের চেষ্টা করেছেন। রবীন্দ্রনাথের “আগুনের পরশমণি ছোঁয়াও প্রাণে” গানের সাথে এই প্রদর্শনীর সংযোগ স্পষ্ট — আগুন এখানে ধ্বংস নয়, শুদ্ধিকরণ। “আগুনপাখি” নামের কাজটি রূপকথার শুকসারির কথা মনে করিয়ে দেয় — যেন কোনো পৌরাণিক পাখি আগুনের মধ্য দিয়ে উড়ে আসছে। এই রূপক-মাত্রা প্রদর্শনীকে কেবল ব্যক্তিগত অভিব্যক্তির সীমা ছাড়িয়ে সার্বজনীন করে তোলে।

গ্যালারি চিত্রকের সাদা দেয়ালে সাদা ফ্রেমে সাজানো হয়েছে শিল্পকর্মগুলো। দেয়ালের সরল বিন্যাস ও আলোকসজ্জা ছবির খয়েরি রঙকে স্পষ্ট করে তুলেছে। প্রতিটি কাজের পাশে শিরোনাম, মাধ্যম ও মাপসংক্রান্ত তথ্যও রয়েছে। আগুনকে প্রধান মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার এবং সেই মাধ্যমে বাস্তব অবয়ব ও বিমূর্ত প্রকাশভঙ্গিকে একত্র করার প্রচেষ্টা প্রদর্শনীটিকে স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য দিয়েছে।

কাগজে পাইরোগ্রাফি — বাংলাদেশের সমকালীন শিল্পচর্চায় এটি সত্যিই অভিনব। মেহেদী কামাল একটি নতুন ভাষা তৈরি করেছেন, যা তাঁকে অনন্য অবস্থানে দাঁড় করায়। আগুনের তাপ নিয়ন্ত্রণ করে টোনের যে সূক্ষ্ম তারতম্য তিনি তৈরি করেন — তা পাকা কারিগরি দক্ষতা ছাড়া সম্ভব নয়। হালকা বেইজ থেকে গাঢ় কয়লা-কালো — এই পূর্ণ পরিসর তাঁর কাজগুলোতে দৃশ্যমান।

কেবল প্রযুক্তি নয়, মেহেদীর কাজে আছে দার্শনিক গভীরতা। চোখ, চেয়ার, পোড়া মুখ — এগুলো কেবল রূপ নয়, এগুলো প্রশ্ন। ২০২১ থেকে ২০২৬ — এই পাঁচ বছরের বিবর্তন দেখলে বোঝা যায়, শিল্পী স্থির নেই। তিনি ক্রমাগত বাড়ছেন। সম্পূর্ণ প্রদর্শনী জুড়ে সেপিয়া টোন বজায় রাখা — এটি সচেতন নান্দনিক শৃঙ্খলা। এটি প্রদর্শনীকে একটি সামগ্রিক আবহ দেয়।

“অনল কাব্য” — নামটি সার্থক। মেহেদী কামাল সত্যিই আগুনে কবিতা লিখেছেন। প্রতিটি কাজে আছে তাপ, জ্বালা, ও আলোর ত্রিমাত্রিক অভিজ্ঞতা। এই প্রদর্শনী আমাদের দেখায় — শিল্প কেবল সুন্দর কিছু তৈরি করা নয়। শিল্প হলো সততার সাথে নিজেকে প্রকাশ করা — এমনকি যদি সেই প্রকাশ পোড়া, বিকৃত, ও অশান্ত হয়। মেহেদী কামাল তাঁর মুখচোরা স্বভাব সত্ত্বেও, আগুনের মাধ্যমে নিজেকে প্রকাশ করার সাহস দেখিয়েছেন।
অধ্যাপক নিসার হোসেনের আশা — “এই কাজগুলো যারা দেখবেন তাদের অভিজ্ঞতা এবং প্রতিক্রিয়াও এর ব্যতিক্রম কিছু হবে না” — এই আশা সার্থক হবে কিনা তা সময়ই বলবে। তবে একথা নিশ্চিত — “অনল কাব্য” দেখার পর দর্শক আর আগুনকে আগের চোখে দেখবেন না।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *