প্রতিমা থেকে পাটের ভাস্কর্য, ‘মা’কে ঘিরে শিল্পের বহুরূপী ভাষা

‘মা: শক্তির বহুরূপ’ দলগত শিল্পপ্রদর্শনীতে মাতৃত্ব, দেবী দুর্গা, প্রকৃতি ও শক্তির নানা ব্যাখ্যায় তৈরি শিল্পকর্ম।

মাতৃত্ব, শক্তি, স্মৃতি, প্রকৃতি ও বিশ্বাস—বহুমাত্রিক এসব ভাবনা নিয়ে সাজানো হয়েছে ‘মা: শক্তির বহুরূপ’ শীর্ষক দলগত শিল্পপ্রদর্শনী।  এতে দুর্গার প্রচলিত রূপের পাশাপাশি উঠে এসেছে মায়ের সঙ্গে সন্তানের সম্পর্ক, প্রকৃতির সৃজনশীল শক্তি, ব্যক্তিগত স্মৃতি এবং মানুষের অস্তিত্বের নানা প্রশ্ন। চিত্রকর্মের সঙ্গে প্রদর্শনীতে স্থান পেয়েছে ভাস্কর্য, স্থাপনাশিল্প ও পাট-দড়ির মতো দেশজ উপকরণে তৈরি শিল্পকর্ম।

প্রদর্শনীতে ষাটজন শিল্পীর শিল্পকর্ম রয়েছে বলে প্রাপ্ত বিবরণে উল্লেখ করা হয়েছে। এসব কাজে শিল্পীরা একই বিষয়কে ভিন্ন ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি ও শিল্পভাষায় প্রকাশ করেছেন। কোথাও দেবী দুর্গা শক্তির প্রতীক। কোথাও মা ব্যক্তিগত স্মৃতি ও আবেগের আশ্রয়। আবার কোনো কোনো চিত্রে মাতৃত্বের ধারণা বিস্তৃত হয়েছে প্রকৃতি ও মহাবিশ্বের সঙ্গে মানুষের সম্পর্ক পর্যন্ত।

প্রদর্শনীর কেন্দ্রীয় বিষয় ‘মা’। তবে এই ধারণা কেবল দেবী দুর্গার প্রতিমায় সীমাবদ্ধ থাকেনি। এখানে দিব্য শক্তি, জৈবিক মাতৃত্ব, আচার-অনুষ্ঠান, প্রকৃতি, স্মৃতি, ভক্তি ও মা-কন্যার সম্পর্ক আলাদা মাত্রা পেয়েছে।

বহুভুজ দুর্গা, জ্যামিতিক বিন্যাসে আঁকা দুর্গা এবং লোকজ ধারার দেবীচিত্রে শক্তির পৌরাণিক রূপ প্রাধান্য পেয়েছে। চন্দ্রের কয়েকটি গোলাপি রেখায় আঁকা দুর্গার অবয়ব আবার ভিন্ন ধরনের প্রকাশভঙ্গি তুলে ধরে। অল্প রেখার ব্যবহারে দেবীর পরিচিত রূপকে সংক্ষিপ্ত করে আনার চেষ্টা রয়েছে এতে।

অনিক চন্দর মা ও সন্তানের সম্পর্ক তুলে ধরেছেন। প্রদর্শনীর বিষয়বস্তুর সঙ্গে এই কাজের সংযোগ বিশেষভাবে তাৎপর্যপূর্ণ। কারণ, এখানে মাতৃত্ব কেবল ধর্মীয় প্রতীকের বিষয় নয়; এটি মানুষের ব্যক্তিগত ও পারিবারিক অভিজ্ঞতারও অংশ।

অনিন্দিতা দত্তের ‘মা দুর্গা’ শীর্ষক কাজে মা-কন্যার সম্পর্ক গুরুত্ব পেয়েছে। দুর্গার সঙ্গে তাঁর কন্যার উপস্থিতি মাতৃত্বের ধারাবাহিকতা এবং এক প্রজন্ম থেকে অন্য প্রজন্মে শক্তি সঞ্চারের ভাবনা সামনে আনে।

প্রদর্শনীর উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য লাল ও কমলা রঙের ব্যাপক ব্যবহার। বহু শিল্পকর্মে এই রং শক্তি, সিঁদুর, রক্ত, উৎসব ও ত্যাগের প্রতীক হিসেবে ব্যাখ্যা করা যায়। তবে রঙের অর্থ সব কাজে এক নয়। শিল্পকর্মের বিষয়, বিন্যাস ও উপকরণের সঙ্গে মিলেই তা আলাদা তাৎপর্য তৈরি করেছে।

নীল ও সবুজ রঙের ব্যবহার কিছু কাজে প্রকৃতি, জল, আকাশ ও অসীমতার অনুভূতি জাগায়। কালো, ধূসর ও গাঢ় বাদামি রং স্মৃতি, রহস্য ও অস্তিত্বের অনিশ্চয়তাকে সামনে আনে। অন্যদিকে সোনালি ও হলুদের ব্যবহার আলো, শক্তি ও মহাজাগতিক ব্যাপ্তির ধারণা তৈরি করেছে।

বহুহস্তের চিত্রকর্মে হাতের ভঙ্গি, আলো-ছায়া ও একরঙা টেরাকোটা বর্ণের ব্যবহার বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। বহুহস্তের এই বিন্যাসকে প্রার্থনা, সংগ্রাম ও সংহতির প্রতীক হিসেবে পড়ার সুযোগ রয়েছে। মানুষের হাত এখানে কেবল শারীরিক অঙ্গ নয়; তা হয়ে উঠেছে অনুভূতি ও কর্মের ভাষা।

সাবিনার ‘প্রকৃতির শক্তি’ শীর্ষক কাজেও রঙের প্রবাহ ও পৃষ্ঠের গঠন গুরুত্বপূর্ণ। এতে প্রকৃতিকে সৃষ্টিশীল ও প্রবল শক্তির আধার হিসেবে উপস্থাপনের চেষ্টা দেখা যায়।

সৌগত সরকারের ‘মায়ের স্মৃতি’ শীর্ষক শিল্পকর্মে সংবাদপত্রের কোলাজ, গাঢ় রং ও সিঁদুরের মতো লাল রেখা ব্যবহৃত হয়েছে। এসব উপকরণের সমন্বয়ে স্মৃতি, অনুপস্থিতি ও ক্ষতির ধারণা প্রকাশ পেয়েছে। সংবাদপত্রের মতো দৈনন্দিন উপকরণকে শিল্পের অংশ করে তোলার মধ্য দিয়ে কাজটি ব্যক্তিগত অনুভূতির সঙ্গে বৃহত্তর সামাজিক বাস্তবতার সংযোগও তৈরি করতে পারে।

সূর্য দাসের ‘দেবী’ শীর্ষক মিশ্র মাধ্যমের কাজেও স্মৃতি ও অস্তিত্বের প্রসঙ্গ এসেছে। স্তরবিন্যস্ত পৃষ্ঠ, রং, লিপি ও প্রতীকের মধ্যে একটি নারীমুখের উপস্থিতি কাজটিকে বহুমাত্রিক করেছে। মুখটি স্পষ্ট ও সম্পূর্ণভাবে প্রকাশিত না হওয়ায় পরিচয়, স্মৃতি ও সময়ের ক্ষয় নিয়ে ভাবার সুযোগ তৈরি হয়।

সৈয়দ জাহিদ ইকবালের ‘ব্যক্তিত্বের রং’ শীর্ষক বিমূর্ত কাজ এবং এমডি জহির উদ্দিনের লাল-কালো রঙের বিন্যাসও প্রদর্শনীতে ভিন্ন মাত্রা যোগ করেছে। প্রথমটিতে রঙের স্তর ও জৈব আকৃতির মাধ্যমে ব্যক্তিত্বের বহুমাত্রিকতা প্রকাশ পেয়েছে। দ্বিতীয়টিতে লাল, কালো ও ধূসর রঙের সংঘাত অস্তিত্ব ও শূন্যতার দ্বন্দ্ব হিসেবে পাঠ করা যায়।

প্রদর্শনীর আরেকটি উল্লেখযোগ্য দিক হলো দেশজ উপকরণ ও ত্রিমাত্রিক শিল্পের সংযোজন। মুক্তি ভৌমিকের পোড়ামাটির ভাস্কর্যে দুর্গা ও মহিষাসুরের সংঘাতের চিত্রায়ণ রয়েছে বলে প্রদর্শনীর বিবরণে উল্লেখ করা হয়েছে। পোড়ামাটির ব্যবহার বাংলার দীর্ঘ শিল্পঐতিহ্যের সঙ্গে কাজটিকে যুক্ত করেছে। একই সঙ্গে এটি প্রচলিত ক্যানভাসের বাইরে শিল্পের প্রকাশভঙ্গি প্রসারিত করেছে।

পাট ও দড়ির তৈরি একটি ভাস্কর্যও প্রদর্শনীতে রয়েছে। গ্রামীণ জীবনে বহুল ব্যবহৃত এই উপকরণকে শিল্পের মাধ্যমে নতুন রূপ দেওয়ার চেষ্টা রয়েছে এতে। দড়ির গঠন, বাঁক ও ত্রিমাত্রিক উপস্থিতি দর্শককে কাজটি বিভিন্ন দিক থেকে দেখার সুযোগ দেয়। উপকরণটির পরিচিত ব্যবহার থেকে বেরিয়ে এসে শিল্পী কীভাবে নতুন অর্থ তৈরি করতে পারেন, ভাস্কর্যটি সে প্রশ্নও সামনে আনে।

লাল পটভূমিতে পাট বা দড়ি দিয়ে তৈরি সোনালি সূর্য প্রকৃতি ও মহাজাগতিক শক্তির ধারণার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে।

প্রদর্শনীতে একটি ইন্সটলেশন ফুল, ঘট ও আলপনাসহ পূজার উপকরণ সাজিয়ে রাখা রয়েছে। এর ফলে এটি শুধু দেখার বস্তু হিসেবে থাকে না; তা ধর্মীয় আচারের অংশও হয়ে ওঠে। শিল্প ও উপাসনার এই সংযোগ দর্শকের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন তোলে। দর্শক কি কেবল শিল্পকর্ম দেখবেন, নাকি কোনো কোনো ক্ষেত্রে তিনি সেই কাজের সঙ্গে আচারগত সম্পর্কেও যুক্ত হবেন?

প্রদর্শনীতে লোকশিল্প, পটচিত্র, জ্যামিতিক বিন্যাস, বাস্তবধর্মী চিত্র, বিমূর্ত প্রকাশ এবং মিশ্র মাধ্যমের কাজ পাশাপাশি রয়েছে। চন্দ্রমালা-শোভিত দুর্গাচিত্রে বাংলার লোকজ শিল্পরীতির প্রভাব লক্ষ করা যায়। অন্যদিকে সুনীল কুমারের জ্যামিতিক অবয়বের দুর্গাচিত্রে দেবীর পরিচিত রূপকে ভেঙে নতুন বিন্যাসে উপস্থাপনের চেষ্টা রয়েছে।

অন্যদিকে গ্রাফিক প্রতিকৃতিতে মুখোমুখি দুটি মুখ ও সাহসী রঙের ব্যবহার সমসাময়িক প্রকাশভঙ্গির পরিচয় দেয়। প্রদর্শনীর মূল বিষয়ের সঙ্গে কাজটির সম্পর্ক সরাসরি স্পষ্ট না হলেও শৈলীগত বৈচিত্র্যের বিচারে এটি আলাদা।

একটি বিষয়কে কেন্দ্র করে এত ধরনের শিল্পভাষা একত্র করা প্রদর্শনীর বড় শক্তি। একই সঙ্গে এই বৈচিত্র্য প্রদর্শনীর বিন্যাস ও বিষয়গত সামঞ্জস্যের প্রশ্নও সামনে এনেছে।

প্রদর্শনীর একাধিক কাজে দুর্গার পরিচিত রূপ ফিরে এসেছে। কিছু শিল্পকর্মের সঙ্গে প্রদর্শনীর কেন্দ্রীয় ভাবনার সম্পর্কও দর্শকের কাছে তাৎক্ষণিকভাবে স্পষ্ট নাও হতে পারে। এমন ক্ষেত্রে শিল্পীর বক্তব্য ও কাজের ব্যাখ্যা সহায়ক হতে পারত।

শিল্পকর্মের পরিচিতি, শিরোনাম, ব্যবহৃত মাধ্যম ও শিল্পী সম্পর্কে তথ্য স্পষ্টভাবে উপস্থাপন করাও জরুরি। বিশেষ করে সাধারণ দর্শকের জন্য এসব তথ্য শিল্পকর্ম বোঝার পথ সহজ করে। একই সঙ্গে বিষয় ও শৈলীর ভিত্তিতে কাজগুলোর বিন্যাস করলে প্রদর্শনীর ভেতরের সম্পর্কগুলো আরও স্পষ্ট হয়ে উঠতো।

‘মা: শক্তির বহুরূপ’ প্রদর্শনীর প্রধান তাৎপর্য হলো, এখানে মাতৃত্ব ও শক্তির ধারণাকে একটিমাত্র প্রতীকে আটকে রাখা হয়নি। দুর্গার পৌরাণিক অবয়ব থেকে ব্যক্তিগত স্মৃতি, মা-সন্তানের সম্পর্ক থেকে মহাজাগতিক কল্পনা—বিভিন্ন স্তরে বিষয়টি ব্যাখ্যা করা হয়েছে।

পোড়ামাটি, পাট, দড়ি, সংবাদপত্র ও রঙের মতো ভিন্ন উপকরণের ব্যবহারও দেখায়, পরিচিত বিষয়কে নতুনভাবে প্রকাশের জন্য শিল্পীরা নানা পথ অনুসন্ধান করছেন। লোকজ ঐতিহ্য ও সমসাময়িক শিল্পভাষার এই সংযোগ বাংলা শিল্পের সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনার সুযোগ তৈরি করে। বৈচিত্র্য তখনই পূর্ণতা পায়, যখন আলাদা কাজগুলো নিজস্ব পরিচয় বজায় রেখেও একটি সুস্পষ্ট সামগ্রিক ভাবনা তৈরি করতে পারে।

‘মা: শক্তির বহুরূপ’ সেই সংলাপের একটি উল্লেখযোগ্য উদাহরণ। এখানে ‘মা’ কখনো দেবী, কখনো স্মৃতি, কখনো প্রকৃতি, আবার কখনো সৃষ্টির আদিম শক্তির প্রতীক। প্রদর্শনীটি তাই শুধু মাতৃত্বের পরিচিত রূপ দেখায় না; বরং প্রশ্ন তোলে—মা বলতে আমরা কাকে বুঝি, শক্তির উৎস কোথায় এবং ঐতিহ্য কীভাবে নতুন শিল্পভাষায় বেঁচে থাকে।

প্রদর্শনীটির সময়সীমাও সংক্ষিপ্ত। মাত্র চার দিনের এই আয়োজন আরও দীর্ঘ হলে বেশি দর্শকের অংশগ্রহণের সুযোগ তৈরি হতো। শুক্রবার (৯অক্টোবর) এর উদ্বোধন হয়েছে ধানমন্ডির গ্যালারী চিত্রকে। প্রদর্শনীটি চলবে ১২ অক্টোবর সকাল ১১টা থেকে রাত ৮টা পর্যন্ত।

 

 

আরো পড়ুন : অন্তরের ছয় রিপু ও প্রকৃতির সংকট নিয়ে ড. আবু কালাম শামসুদ্দিনের শিল্পভাষ্য

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *