সৌরবিদ্যুৎ ও ২৫ কোটি বৃক্ষরোপণে জোর দিচ্ছে সরকার

পরিবেশ সুরক্ষা, সৌরবিদ্যুৎ ও জলবায়ু মোকাবিলায় ইউরোপীয় প্রতিনিধিদের সঙ্গে ব পরিবেশ প্রতিমন্ত্রী শেখ ফরিদুল ইসলাম

সৌরবিদ্যুতের ব্যবহার বাড়ানো, বায়ুদূষণ নিয়ন্ত্রণ এবং ২৫ কোটি বৃক্ষরোপণের উদ্যোগ বাস্তবায়নে গুরুত্ব দিচ্ছে সরকার। একই সঙ্গে দূষণকারী ইটভাটা বন্ধ, বৈদ্যুতিক যানবাহনের ব্যবহার বৃদ্ধি, খাল খনন ও পুনরুদ্ধার এবং জলবায়ু সহনশীল অবকাঠামো গড়ে তোলার ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে। এসব উদ্যোগের মাধ্যমে পরিবেশ সুরক্ষা ও জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলায় সক্ষমতা বাড়াতে চায় সরকার।

মঙ্গলবার (১৩ই অক্টোবর) বাংলাদেশ সচিবালয়ে পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের সম্মেলনকক্ষে ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও ইউরোপের বিভিন্ন দেশের প্রতিনিধিদের সঙ্গে সভায় এসব কথা বলেন পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন প্রতিমন্ত্রী শেখ ফরিদুল ইসলাম।

পরিচ্ছন্ন জ্বালানি, জলবায়ু অগ্রাধিকার এবং জলবায়ু সম্মেলনকে সামনে রেখে ইউরোপীয় ইউনিয়নের উদ্যোগে এ সভার আয়োজন করা হয়।

প্রতিমন্ত্রী বলেন, সৌরশক্তির ব্যবহার বাড়ানো সরকারের পরিচ্ছন্ন জ্বালানি কার্যক্রমের অন্যতম অগ্রাধিকার। আবাসিক ভবন, শিল্পকারখানা ও সরকারি প্রতিষ্ঠানের ছাদে সৌরবিদ্যুৎ স্থাপনের সুযোগ কাজে লাগাতে হবে। পাশাপাশি উপযুক্ত স্থানে সৌরশক্তিচালিত সেচব্যবস্থা সম্প্রসারণের ওপর গুরুত্ব দিতে হবে।

তাঁর মতে, সৌরবিদ্যুতের প্রসার ঘটলে প্রচলিত জ্বালানির ওপর নির্ভরতা কমবে। জ্বালানি সরবরাহেও বৈচিত্র্য আসবে। এ জন্য মানসম্মত প্রযুক্তি, প্রয়োজনীয় অর্থায়ন, দক্ষ জনবল ও নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ নিশ্চিত করা জরুরি।

বায়ুদূষণ নিয়ন্ত্রণ প্রসঙ্গে শেখ ফরিদুল ইসলাম বলেন, অবৈধ ও পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর ইটভাটা বন্ধ করতে হবে। একই সঙ্গে পরিবেশগত বিধিবিধানের কার্যকর প্রয়োগ নিশ্চিত করা প্রয়োজন।

ইট উৎপাদনে দূষণ কমানোর পাশাপাশি পরিবেশবান্ধব ব্লক ও বিকল্প নির্মাণসামগ্রীর ব্যবহার বাড়াতে কাজ করছে সরকার। তবে বায়ুদূষণের উৎস শুধু ইটভাটা নয়। নির্মাণকাজের ধুলা, যানবাহনের ধোঁয়া এবং অপর্যাপ্ত বর্জ্য ব্যবস্থাপনাও দূষণ বাড়ায়। এসব ক্ষেত্রেও সমন্বিত উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে বলে জানান তিনি।

বৈদ্যুতিক যানবাহনের ব্যবহার বাড়ানোর মাধ্যমে পরিবহন খাতের দূষণ কমানোর বিষয়টিও সরকারের অগ্রাধিকারে রয়েছে।

২৫ কোটি বৃক্ষরোপণের উদ্যোগকে দীর্ঘমেয়াদি পরিবেশগত সুফলে রূপ দিতে উপযুক্ত স্থানে উপযুক্ত প্রজাতির গাছ লাগানোর ওপর গুরুত্ব দেন প্রতিমন্ত্রী। তিনি বলেন, দেশীয় প্রজাতির গাছকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। বনভূমি, উপকূলীয় অঞ্চল, সড়কের পাশ এবং উপযুক্ত প্রাতিষ্ঠানিক ও সামাজিক পরিসরে বৃক্ষরোপণ এগিয়ে নিতে হবে। শুধু চারা রোপণ করলেই দায়িত্ব শেষ হবে না। গাছের পরিচর্যা, সুরক্ষা এবং বেঁচে থাকার হার নিশ্চিত করাও জরুরি। এ কাজে স্থানীয় জনগোষ্ঠী, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, তরুণ সমাজ ও বেসরকারি খাতকে আরও বেশি সম্পৃক্ত করার আহ্বান জানান তিনি।

জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে বাংলাদেশে বন্যা, ঘূর্ণিঝড়, অতিবৃষ্টি, তাপপ্রবাহ ও লবণাক্ততার ঝুঁকি বাড়ছে। এসব প্রভাব মানুষের জীবন-জীবিকা, কৃষি, পানিসম্পদ ও অবকাঠামোর ওপর চাপ সৃষ্টি করছে।

প্রতিমন্ত্রী বলেন, এসব ঝুঁকি মোকাবিলায় দুর্যোগ প্রস্তুতি, আগাম সতর্কবার্তা, উপকূলীয় সুরক্ষা, বনায়ন ও পানি ব্যবস্থাপনাকে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। পাশাপাশি জলবায়ু সহনশীল অবকাঠামো গড়ে তোলার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। তিনি বলেন, অভিযোজন কার্যক্রম বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে স্থানীয় মানুষের চাহিদা এবং ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর প্রয়োজনকে অগ্রাধিকার দিতে হবে।

কার্বন নিঃসরণ কমানো ও বায়ুমণ্ডল থেকে কার্বন অপসারণের উদ্যোগে বিনিয়োগ আকর্ষণে কার্বন ঋণ কাঠামো গুরুত্বপূর্ণ বলে মন্তব্য করেন শেখ ফরিদুল ইসলাম।

তিনি বলেন, এ কাঠামোয় প্রকল্প অনুমোদন, নিঃসরণ হ্রাসের পরিমাপ, প্রতিবেদন তৈরি এবং স্বাধীনভাবে যাচাইয়ের সুস্পষ্ট ব্যবস্থা থাকতে হবে। একই পরিমাণ নিঃসরণ হ্রাসের হিসাব একাধিকবার দেখানোর সুযোগও বন্ধ করতে হবে। এ লক্ষ্যেই সরকার কার্বন ঋণ কাঠামো নিয়ে কাজ করছে।

প্রতিমন্ত্রী বলেন, পরিবেশ সুরক্ষা ও জলবায়ু মোকাবিলার উদ্যোগ সফল করতে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়, স্থানীয় সরকার, বেসরকারি খাত এবং উন্নয়ন সহযোগীদের মধ্যে সমন্বয় প্রয়োজন।

বাংলাদেশের জাতীয় অগ্রাধিকারের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে পরিচ্ছন্ন জ্বালানি, পরিবেশবান্ধব পরিবহন, বায়ুদূষণ নিয়ন্ত্রণ, জলবায়ু সহনশীল পানি ব্যবস্থাপনা এবং কার্বন বাজারে সক্ষমতা বাড়াতে ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও ইউরোপের অংশীদারদের সহযোগিতা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে বলে তিনি উল্লেখ করেন।

আসন্ন জলবায়ু সম্মেলনকে সামনে রেখে বাংলাদেশের অভিযোজন চাহিদা ও জলবায়ু অর্থায়নের অগ্রাধিকারগুলোও তুলে ধরেন প্রতিমন্ত্রী। তিনি বলেন, আন্তর্জাতিক সহযোগিতাকে বাস্তবায়নযোগ্য কার্যক্রমে রূপ দিতে হবে। এর মাধ্যমে মানুষের জীবন-জীবিকা ও পরিবেশের সুরক্ষায় দৃশ্যমান সুফল নিশ্চিত করা জরুরি।

সভায় সভাপতিত্ব করেন পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের ভারপ্রাপ্ত সচিব ড. ফাহমিদা খানম।

এ সময় মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব মোহাম্মদ নাভিদ শফিউল্লাহ, ইউরোপীয় ইউনিয়নের প্রথম পরামর্শক ও সবুজ অর্থনীতি এবং সরকারি বিনিয়োগ বিভাগের প্রধান টোবিয়াস বিয়ারমান, বাংলাদেশে ইউরোপীয় ইউনিয়নের পরিবেশ ও জ্বালানি কর্মসূচির ব্যবস্থাপক তানজিনা দিলশাদ উপস্থিত ছিলেন।

এ ছাড়া ঢাকায় জার্মান দূতাবাসের পরামর্শক ও জার্মান উন্নয়ন সহযোগিতার প্রধান উলরিখ ক্লেপমান, ডেনমার্ক দূতাবাসের উপমিশনপ্রধান অ্যান্ডার্স বি. কার্লসেন, প্রতিনিধি আলবার্টে ফ্যাক্সহোল্ম এবং ফ্রান্স দূতাবাসের দ্বিতীয় পরামর্শক ক্রিশ্চিয়ান বেক সভায় অংশ নেন। মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারাও উপস্থিত ছিলেন।

 

 

আরো পড়ুন : বায়ুদূষণ কমাতে নির্মাণ কাজে পরিবেশবান্ধব ব্লক ব্যবহারের আহ্বান

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *