এক ঘাটে জীবনের কত গল্প, দেখালেন ৫৯ জন আলোকচিত্রী

বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের আলোর ইশকুলের ফটোগ্রাফি কোর্সের শিক্ষার্থীদের আলোকচিত্র প্রদর্শনীর উদ্বোধনী অনুষ্ঠান।

 

একটি ঘাট। অসংখ্য মানুষের যাতায়াত। জীবিকার তাগিদে ছুটে চলা মানুষ, নদীর বুকে ভেসে থাকা নৌকা, ফেরিতে ওঠার অপেক্ষায় যানবাহনের সারি, আর প্রতিদিনের চেনা জীবনের আড়ালে লুকিয়ে থাকা নানা গল্প। এসব দৃশ্যকে ৫৯ জন নবীন আলোকচিত্রীর চোখে তুলে ধরেছে ‘এক ঘাট, অনেক গল্প—ফেরিঘাটের জীবন’ শীর্ষক আলোকচিত্র প্রদর্শনী।

বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের ‘আলোর ইশকুল’ কর্মসূচির অধীনে ফটোগ্রাফি কোর্সের ১১তম ব্যাচের শিক্ষার্থীরা এ প্রদর্শনীর আয়োজন করেছেন। পাটুরিয়া ফেরিঘাটে ধারণ করা ছবিতে উঠে এসেছে নদীকেন্দ্রিক জীবনযাত্রার নানা দিক। প্রকৃতি, পরিবহন, শ্রম, অপেক্ষা, জীবিকা ও মানুষের পারস্পরিক সম্পর্ক প্রদর্শনীর প্রধান বিষয়।

৮ই  অক্টোবর সন্ধ্যা ৭টায় বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের ৪০১ নম্বর কক্ষে প্রদর্শনীর উদ্বোধন হয়। উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন বাংলাদেশ বার্ড ক্লাবের সাবেক সভাপতি ও বাংলাদেশ এনার্জি নিয়ন্ত্রণ কমিশনের চেয়ারম্যান জালাল আহমেদ। বিশেষ অতিথি ছিলেন বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের ট্রাস্টি মো. আবদুস সামাদ ও অধ্যাপক মুহাম্মদ আলী নকী। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন কেন্দ্রের নির্বাহী পরিচালক খোন্দকার মো. আসাদুজ্জামান।

প্রদর্শনীটি ৯ থেকে ১৭ অক্টোবর পর্যন্ত বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের চিত্রশালায় দর্শনার্থীদের জন্য উন্মুক্ত থাকবে।

পাটুরিয়া ফেরিঘাট বাংলাদেশের নদীকেন্দ্রিক যোগাযোগব্যবস্থার পরিচিত একটি স্থান। প্রতিদিন এখানে মানুষের পাশাপাশি চলাচল করে বাস, ট্রাক, ব্যক্তিগত গাড়ি ও পণ্যবাহী যানবাহন। ফেরিতে ওঠা-নামার ব্যস্ততার সঙ্গে জড়িয়ে আছে শ্রমজীবী মানুষের জীবন, ক্ষুদ্র ব্যবসা এবং নদীঘেঁষা জনপদের দৈনন্দিন কর্মকাণ্ড।

প্রদর্শনীর ছবিগুলোতে এই পরিচিত পরিবেশের নানা অনুষঙ্গ ধরা পড়েছে। কোথাও ফেরির ডেকে অপেক্ষমাণ বাস ও যাত্রীদের ভিড়। কোথাও দেখা যায় ফল বিক্রেতা, ঘাটের শ্রমিক, মাঝি কিংবা ফেরির পরিচ্ছন্নতাকর্মীকে। নদী, নৌকা, পাখি, মেঘ ও সূর্যাস্তের দৃশ্যের পাশাপাশি রয়েছে চায়ের দোকান, খেলায় মগ্ন শিশু এবং তীরবর্তী জীবনের নানা অনুষঙ্গ।

প্রদর্শনীতে স্থান পেয়েছে ফেরির যান্ত্রিক জগতের ছবিও। মরিচা ধরা হুক, শিকল, তেলের ড্রাম ও ফেরির চালকের চাকা হয়ে উঠেছে আলোকচিত্রীদের ছবির বিষয়। এসব ছবিতে শুধু পরিবহনের উপকরণ নয়, দীর্ঘদিনের ব্যবহার ও শ্রমের চিহ্নও দৃশ্যমান।

মানুষের যাতায়াতের সঙ্গে পশুপাখির উপস্থিতিও ছবিগুলোতে আলাদা মাত্রা যোগ করেছে। ছাগল, মুরগি, বিড়াল, কুকুর ও ঘোড়ার মতো প্রাণীর ছবি ঘাটের বহুমাত্রিক জীবনকে সামনে এনেছে।

প্রদর্শনীর উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য হলো একই স্থানকে বিভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে দেখার চেষ্টা। কোনো আলোকচিত্রী বিস্তৃত দৃশ্যে ফেরিঘাটের ব্যস্ততা তুলে ধরেছেন। কেউ মনোযোগ দিয়েছেন কোনো নির্দিষ্ট বস্তু, মানুষের অভিব্যক্তি কিংবা ক্ষণিকের ঘটনার প্রতি।

কিছু ছবিতে ফেরির দরজা, জানালা ও যানবাহনের আয়নাকে ব্যবহার করা হয়েছে দৃশ্যের ভেতরে আরেকটি দৃশ্য তৈরির জন্য। নদীর তীর, ফেরির রেলিং ও দড়ির রেখা ছবির বিন্যাসে দিকনির্দেশনা দিয়েছে। উঁচু স্থান থেকে তোলা ছবিতে মানুষের ভিড় ও বিশাল পরিবেশের মধ্যে বৈপরীত্য দেখা যায়।

সূর্যাস্তের সময় মাছ ধরার নৌকার ছায়ামূর্তি এবং আকাশে উড়ন্ত পাখির দৃশ্য প্রদর্শনীতে কাব্যিক আবহ তৈরি করেছে। অন্যদিকে, দড়িতে দোল খাওয়া এক শিশুর ছবি কঠিন বাস্তবতার মধ্যেও শৈশবের আনন্দকে তুলে ধরে।

বেগুনি হিজাব পরা এক নারীর কোলে বিড়ালের ছবি, রঙিন ছাতার নিচে ফল বিক্রেতা এবং ফেরিতে থাকা সাজানো বিয়ের গাড়ির মতো দৃশ্যও দর্শকের মনোযোগ আকর্ষণ করে। এসব ছবিতে দৈনন্দিন জীবনের পাশাপাশি আবেগ, সম্পর্ক ও উৎসবের উপস্থিতি রয়েছে।

প্রদর্শনীর অধিকাংশ ছবিতে ধূসর, বাদামি, নীল ও সবুজ রঙের প্রাধান্য দেখা যায়। মেঘলা আকাশ ও নদীর স্বাভাবিক রং ছবিগুলোতে সংযত আবহ তৈরি করেছে। কোথাও নরম আলো, কোথাও কম আলো-ছায়ার বৈপরীত্য দৃশ্যকে শান্ত ও চিন্তামগ্ন করে তুলেছে।

এর বিপরীতে কিছু ছবিতে উজ্জ্বল রঙের ব্যবহার চোখে পড়ে। বেগুনি পোশাক, রঙিন ছাতা, লাল চেয়ার এবং সূর্যাস্তের কমলা-লাল আকাশ ছবির সামগ্রিক বিন্যাসে বৈচিত্র্য এনেছে।

প্রদর্শনীর সব ছবি হালকা কাঠের ফ্রেম ও সাদা পটভূমিতে সাজানো হয়েছে। এই অভিন্ন উপস্থাপনা বিভিন্ন আলোকচিত্রীর কাজের মধ্যে দৃশ্যগত সামঞ্জস্য তৈরি করেছে। তবে ছবির পরিচিতি ও বিবরণ লেখা কিছু নামফলক ছোট হওয়ায় সেগুলো পড়তে অসুবিধা হতে পারে। ছবিগুলো সাজানোর ক্রমেও আরও পরিকল্পিত বিন্যাসের সুযোগ ছিলো।

প্রদর্শনীটির মূল্যায়নে অংশগ্রহণকারীদের শিক্ষানবিশ পরিচয় বিবেচনা করা জরুরি। এটি কোনো পেশাদার আলোকচিত্রীদের প্রদর্শনী নয়। বরং একটি নির্দিষ্ট বিষয়কে কেন্দ্র করে ৫৯ জন শিক্ষার্থীর সম্মিলিত চর্চার ফল।

এই দিক থেকে প্রদর্শনীটি আলোকচিত্রশিক্ষার একটি গুরুত্বপূর্ণ অভিজ্ঞতা। একই স্থান ও পরিবেশে কাজ করেও শিক্ষার্থীরা ভিন্ন ভিন্ন বিষয়, মুহূর্ত ও দৃষ্টিভঙ্গি বেছে নিয়েছেন। ফলে একটি ঘাটের পরিচিত দৃশ্যগুলো সম্মিলিতভাবে নতুনভাবে দেখার সুযোগ তৈরি করেছে।

তবে কিছু ছবিতে আলো নিয়ন্ত্রণ, স্পষ্টতা ও দৃশ্য বিন্যাসের সীমাবদ্ধতা রয়েছে। একই ধরনের নদী ও ফেরির দৃশ্যের পুনরাবৃত্তিও চোখে পড়ে। ছবিগুলো সকাল থেকে রাতের ক্রমে কিংবা প্রকৃতি, মানুষ, জীবিকা ও যাত্রার বিষয়ভিত্তিক বিন্যাসে সাজানো হলে দর্শকের অভিজ্ঞতা আরও সুসংহত হতে পারত।

ছবির পেছনের গল্প, ধারণের সময় এবং আলোকচিত্রীর নিজস্ব ভাবনা সম্পর্কে সংক্ষিপ্ত বিবরণ থাকলে প্রদর্শনীটির বক্তব্য আরও স্পষ্ট হতো।

পাটুরিয়া ফেরিঘাটের মতো একটি স্থানকে কেন্দ্র করে আলোকচিত্র ধারণের গুরুত্ব কেবল নান্দনিকতার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। নদীকেন্দ্রিক যোগাযোগ, মানুষের জীবিকা ও পরিবহনব্যবস্থায় পরিবর্তন এলে এসব ছবির প্রামাণ্য মূল্যও বাড়তে পারে।

একটি নির্দিষ্ট সময়ে ঘাটের পরিবেশ, মানুষের কাজ, যানবাহনের চলাচল এবং নদীঘেঁষা জীবনের যেসব দৃশ্য আলোকচিত্রে ধরা পড়ে, সেগুলো ভবিষ্যতে এই জনপদের পরিবর্তন বোঝার উপাদান হয়ে উঠতে পারে। তবে এ ধরনের ছবি দীর্ঘমেয়াদি প্রামাণ্য সংগ্রহে পরিণত করতে হলে স্থান, সময় ও বিষয়ের পরিচিতি সংরক্ষণ করা প্রয়োজন।

‘এক ঘাট, অনেক গল্প—ফেরিঘাটের জীবন’ প্রদর্শনীর সবচেয়ে বড় শক্তি হলো একটি পরিচিত স্থানকে বহু মানুষের চোখে দেখার সুযোগ। এখানে ফেরিঘাট শুধু যাতায়াতের পথ নয়। এটি মানুষের জীবিকা, অপেক্ষা, সম্পর্ক ও প্রতিদিনের সংগ্রামেরও একটি পরিসর।

প্রযুক্তিগত দক্ষতা ও ছবি সাজানোর ক্ষেত্রে উন্নতির সুযোগ থাকলেও শিক্ষানবিশ আলোকচিত্রীদের এই সম্মিলিত প্রয়াসে নদীঘেঁষা জীবনের প্রতি সংবেদনশীল দৃষ্টিভঙ্গি স্পষ্ট। একই ঘাটের নানা মুহূর্ত একত্র করে তাঁরা দেখিয়েছেন, পরিচিত কোনো স্থানকেও মনোযোগ দিয়ে দেখলে সেখানে আবিষ্কারের মতো অনেক গল্প থাকে।

 

আরো পড়ুন : নদী ও পাখির গল্পে পরিবেশ রক্ষার বার্তা

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *