দক্ষিণ এশিয়ায় বন্যপ্রাণী পাচার ঠেকাতে কাঠমান্ডু ঘোষণা গৃহীত

SAWEN-এর প্রথম সাধারণ পরিষদের সমাপনী অনুষ্ঠানে কাঠমান্ডু ঘোষণা গ্রহণের দৃশ্য

দক্ষিণ এশিয়ায় অবৈধ বন্যপ্রাণী বাণিজ্য ও আন্তঃদেশীয় সংগঠিত অপরাধ মোকাবিলায় আঞ্চলিক সহযোগিতা জোরদারে ঐকমত্যে পৌঁছেছে সাউথ এশিয়া ওয়াইল্ডলাইফ এনফোর্সমেন্ট নেটওয়ার্ক (এসএডব্লিউইএন)-এর সদস্য দেশগুলো। এ লক্ষ্যে নেপালের রাজধানী কাঠমান্ডুতে সংগঠনটির প্রথম সাধারণ পরিষদের সমাপনী দিনে ‘কাঠমান্ডু ঘোষণা’ গ্রহণ করা হয়েছে।

বৃহস্পতিবার ও শুক্রবার (১০ ও ১১ সেপ্টেম্বর) কাঠমান্ডুতে প্রথম সাধারণ পরিষদ অনুষ্ঠিত হয়। এতে দক্ষিণ এশিয়ার সদস্য দেশগুলোর সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়, বন ও বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ এবং আইন প্রয়োগকারী সংস্থার প্রতিনিধিরা অংশ নেন। এসএডব্লিউইএন-এর প্রথম সাধারণ পরিষদ আয়োজনের লক্ষ্য ছিল ভবিষ্যৎ কার্যক্রমের দিকনির্দেশনা নির্ধারণ, আঞ্চলিক সহযোগিতা বাড়ানো এবং অবৈধ বন্যপ্রাণী বাণিজ্য মোকাবিলায় সমন্বিত উদ্যোগ জোরদার করা।

কাঠমান্ডু ঘোষণায় বলা হয়েছে, অবৈধ বন্যপ্রাণী বাণিজ্য এখন আর বিচ্ছিন্ন কোনো অপরাধ নয়। এটি ক্রমেই জটিল আন্তঃদেশীয় সংগঠিত অপরাধে পরিণত হচ্ছে। এর সঙ্গে দুর্নীতি, অবৈধ অর্থপ্রবাহ, অর্থপাচার, ডিজিটাল প্রযুক্তির অপব্যবহার এবং সীমান্তের দুর্বলতার মতো বিষয় যুক্ত হচ্ছে।

এ পরিস্থিতিতে সদস্য দেশগুলো গুরুতর বন্যপ্রাণী অপরাধের বিরুদ্ধে গোয়েন্দাভিত্তিক ও আর্থিক তদন্ত জোরদারে গুরুত্ব দিয়েছে। অপরাধীদের গ্রেপ্তার বা বন্যপ্রাণী উদ্ধারের মধ্যেই অভিযান সীমাবদ্ধ না রেখে পাচারের পেছনে থাকা সংগঠক, অর্থদাতা ও অপরাধী নেটওয়ার্ক শনাক্ত করার ওপর জোর দেওয়া হয়েছে।

ঘোষণায় সদস্য দেশগুলোর মধ্যে গোয়েন্দা তথ্য দ্রুত বিনিময়, যৌথ তদন্ত ও সমন্বিত অভিযান পরিচালনার কথা বলা হয়েছে। পাশাপাশি অর্থপাচারবিরোধী ব্যবস্থা, অপরাধলব্ধ সম্পদ পুনরুদ্ধার এবং কার্যকর বিচারিক সহযোগিতা বাড়ানোর অঙ্গীকার করা হয়েছে।

বন্যপ্রাণী পাচারে অনলাইন প্ল্যাটফর্ম, বাণিজ্যিক যোগাযোগব্যবস্থা, পরিবহন নেটওয়ার্ক এবং আর্থিক ব্যবস্থার ব্যবহার বাড়ছে। তাই ডিজিটাল ও আর্থিক তদন্তকে আইন প্রয়োগের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে দেখছে সদস্য দেশগুলো। বাংলাদেশের পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তনমন্ত্রী আবদুল আউয়াল মিন্টুও এ ধরনের তদন্ত ও আন্তঃদেশীয় সহযোগিতার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন।

সমাপনী বক্তব্যে মন্ত্রী আবদুল আউয়াল মিন্টু বলেন, বন্যপ্রাণী ও প্রতিবেশব্যবস্থা রাজনৈতিক সীমান্ত মানে না। একইভাবে বন্যপ্রাণী অপরাধও একটি দেশের সীমানায় আটকে থাকে না। পাচারকারীরা সীমান্ত, পরিবহনব্যবস্থা, বাণিজ্যিক চ্যানেল, অনলাইন প্ল্যাটফর্ম ও আর্থিক ব্যবস্থা ব্যবহার করছে। তাই আইন প্রয়োগকারী সংস্থার কার্যক্রমও সীমান্ত পেরিয়ে সমন্বিত হতে হবে।

তিনি আঞ্চলিক গোয়েন্দা তথ্য বিনিময়, যৌথ অভিযান এবং আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলোর মধ্যে ঘনিষ্ঠ সহযোগিতা বাড়ানোর আহ্বান জানান। একই সঙ্গে অনলাইনভিত্তিক বন্যপ্রাণী পাচার এবং আর্থিক তদন্তে আরও বেশি গুরুত্ব দেওয়ার কথা বলেন।

বাংলাদেশের পক্ষ থেকে এসএডব্লিউইএন-এর ২০২৬–২০৩০ কৌশলগত পরিকল্পনায় গোয়েন্দা তথ্য বিনিময়, আইন প্রয়োগ, ফৌজদারি বিচার, ডিজিটাল ও আর্থিক তদন্ত, বিজ্ঞান ও ফরেনসিক সক্ষমতা, দক্ষতা উন্নয়ন এবং বন্যপ্রাণী পণ্যের চাহিদা কমানোর বিষয়গুলোকে অগ্রাধিকার দেওয়ার সমর্থন জানানো হয়েছে।

কাঠমান্ডু ঘোষণায় বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, উদ্ভাবন ও গবেষণার ব্যবহার বাড়ানোর ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। আঞ্চলিক জ্ঞান বিনিময়ের মাধ্যমে বন্যপ্রাণী অপরাধ, বায়োপাইরেসি, জীবসম্পদে অবৈধ প্রবেশ এবং নতুন ধরনের অপরাধ মোকাবিলায় সক্ষমতা বাড়ানোর কথা বলা হয়েছে।

রেঞ্জার, কাস্টমস কর্মকর্তা, পুলিশ, প্রসিকিউটর এবং অন্যান্য সম্মুখসারির কর্মীদের প্রশিক্ষণ ও নিরাপত্তা জোরদারের বিষয়টিও ঘোষণায় স্থান পেয়েছে। এসএডব্লিউইএন-এর ঘোষিত লক্ষ্যগুলোর মধ্যে সদস্য দেশগুলোর আইন ও নীতিতে সমন্বয়, বন্যপ্রাণী অপরাধের প্রবণতা নথিবদ্ধ করা এবং তথ্য বিনিময় ও প্রশিক্ষণের মাধ্যমে প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা বাড়ানোর বিষয় রয়েছে।

অবৈধ বন্যপ্রাণী পণ্যের চাহিদা কমাতেও আঞ্চলিক উদ্যোগ নেওয়ার কথা বলা হয়েছে। এ ক্ষেত্রে স্থানীয় জনগোষ্ঠী, নাগরিক সমাজ, শিক্ষাবিদ, তরুণ, নারী ও গণমাধ্যমকে সম্পৃক্ত করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। পরিবহন, লজিস্টিকস, আর্থিক সেবা, ই-কমার্স ও পর্যটন খাতের বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোকেও এ উদ্যোগে যুক্ত করার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে।

সীমান্তবর্তী এলাকায় বন্যপ্রাণী অপরাধ মোকাবিলায় দ্বিপক্ষীয় ও আঞ্চলিক সহযোগিতা বাড়ানোর কথাও বলা হয়েছে। পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট আন্তর্জাতিক ও আঞ্চলিক কনভেনশন, সংস্থা এবং উন্নয়ন সহযোগীদের সঙ্গে অংশীদারত্ব আরও শক্তিশালী করার ওপর জোর দেওয়া হয়েছে।

প্রতি বছর ৩০ জানুয়ারি ‘এসএডব্লিউইএন ডে’ পালনের সিদ্ধান্তও নেওয়া হয়েছে। এর মাধ্যমে দক্ষিণ এশিয়ায় বন্যপ্রাণী অপরাধ প্রতিরোধে জনসচেতনতা ও আঞ্চলিক সহযোগিতার গুরুত্ব তুলে ধরার উদ্যোগ নেওয়া হবে।

এসএডব্লিউইএন ২০১১ সালে প্রতিষ্ঠিত একটি আঞ্চলিক নেটওয়ার্ক। এর সদস্য দেশ আফগানিস্তান, বাংলাদেশ, ভুটান, ভারত, মালদ্বীপ, নেপাল, পাকিস্তান ও শ্রীলঙ্কা। সংগঠনটির মূল লক্ষ্য দক্ষিণ এশিয়ায় অবৈধ বন্যপ্রাণী বাণিজ্য মোকাবিলায় যোগাযোগ, সমন্বয়, সহযোগিতা ও সক্ষমতা বাড়ানো।

কাঠমান্ডু ঘোষণার মধ্য দিয়ে সদস্য দেশগুলো মূলত একটি বিষয় স্পষ্ট করেছে—বন্যপ্রাণী পাচার মোকাবিলায় শুধু জাতীয় পর্যায়ের অভিযান যথেষ্ট নয়। সীমান্ত, অর্থের প্রবাহ এবং ডিজিটাল যোগাযোগব্যবস্থা ব্যবহার করে পরিচালিত অপরাধী নেটওয়ার্ক ভাঙতে হলে দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর আইন প্রয়োগকারী ও বিচারিক ব্যবস্থার মধ্যে আরও কার্যকর সমন্বয় প্রয়োজন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *