পালমোনারি রিহ্যাবিলিটেশনকে টেকসই সেবা হিসেবে গড়ে তোলার উদ্যোগ

BMU-তে পালমোনারি রিহ্যাবিলিটেশন বিষয়ক দিনব্যাপী হ্যান্ডস-অন কর্মশালায় চিকিৎসক ও স্বাস্থ্য-পেশাজীবীদের অংশগ্রহণ।

বাংলাদেশে দীর্ঘমেয়াদি শ্বাসতন্ত্রের রোগীদের চিকিৎসায় শুধু ওষুধের ওপর নির্ভর না করে পুনর্বাসনমূলক সেবাকে গুরুত্ব দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। তাঁদের মতে, সিওপিডি, অ্যাজমা, ব্রঙ্কিয়েকটেসিস ও ইন্টারস্টিশিয়াল লাং ডিজিজের মতো রোগে আক্রান্ত অনেক মানুষ চিকিৎসার পরও শারীরিক সক্ষমতা, কর্মক্ষমতা ও স্বাভাবিক জীবনযাপনের সামর্থ্য হারান। এসব ক্ষেত্রে পালমোনারি রিহ্যাবিলিটেশন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

এ লক্ষ্যেই বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বিএমইউ) ফিজিক্যাল মেডিসিন অ্যান্ড রিহ্যাবিলিটেশন বিভাগ এবং বাংলাদেশ সোসাইটি অফ ফিজিক্যাল মেডিসিন এন্ড রিহ্যাবিলাইটেশন (বিএসপিএমআর)-এর যৌথ উদ্যোগে রবিবার (৩০শে আগস্ট) বিশ্ববিদ্যালয়ের মিলন হল এক্সটেনশনে দিনব্যাপী ‘পালমোনারি রিহ্যাবিলিটেশন’ বিষয়ক হ্যান্ডস-অন কর্মশালা অনুষ্ঠিত হয়েছে।

কর্মশালায় চিকিৎসক, ফিজিওথেরাপিস্ট, নার্সসহ বিভিন্ন স্বাস্থ্য-পেশাজীবীরা অংশ নেন। এতে পালমোনারি রিহ্যাবিলিটেশনের তাত্ত্বিক আলোচনার পাশাপাশি হাতে-কলমে প্রশিক্ষণ ও ক্লিনিক্যাল সিমুলেশনের ব্যবস্থা ছিল।

অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন বিএমইউ-এর ফিজিক্যাল মেডিসিন অ্যান্ড রিহ্যাবিলিটেশন বিভাগের চেয়ারম্যান প্রফেসর ডা. এম. এ. শাকুর। প্রধান অতিথি ছিলেন বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য প্রফেসর ডা. এফ. এম. সিদ্দিকী। অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেন একই বিভাগের অ্যাসোসিয়েট প্রফেসর ডা. মোহাম্মদ আবুল কালাম আজাদ।

স্বাগত বক্তব্যে অ্যাসোসিয়েট প্রফেসর ডা. মোহাম্মদ নাদিম কামাল বাংলাদেশে পালমোনারি রিহ্যাবিলিটেশন কার্যক্রমকে আরও শক্তিশালী করার প্রয়োজনীয়তার কথা তুলে ধরেন।

সভাপতির বক্তব্যে প্রফেসর ডা. এম. এ. শাকুর বলেন, দীর্ঘমেয়াদি শ্বাসতন্ত্রের রোগে আক্রান্ত অনেক রোগীর ক্ষেত্রে শুধু ওষুধ যথেষ্ট নয়। রোগের কারণে ধীরে ধীরে তাঁদের শারীরিক সক্ষমতা কমে যায়, কর্মক্ষমতা হ্রাস পায় এবং দৈনন্দিন ও সামাজিক কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণ কঠিন হয়ে পড়ে।

বিশেষ করে সীমিত সম্পদের স্বাস্থ্যব্যবস্থায় কম খরচে উপযোগী প্রযুক্তি ব্যবহার করে এসব রোগীকে কীভাবে পুনর্বাসনের মাধ্যমে আবার কর্মক্ষম ও স্বনির্ভর করা যায়, সেটি গুরুত্বপূর্ণ বলে উল্লেখ করেন তিনি। তাঁর মতে, পালমোনারি রিহ্যাবিলিটেশনকে কার্যকর ও টেকসই স্বাস্থ্যসেবা হিসেবে প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে এই কর্মশালা একটি সূচনা।

প্রধান অতিথির বক্তব্যে উপাচার্য প্রফেসর ডা. এফ. এম. সিদ্দিকী কর্মশালাটির প্রশংসা করেন। পালমোনারি রিহ্যাবিলিটেশন এগিয়ে নিতে বিশ্ববিদ্যালয়ের পক্ষ থেকে সর্বোচ্চ সহযোগিতার আশ্বাস দিয়ে তিনি বিএমইউ-কে এ ক্ষেত্রে একটি ‘সেন্টার অফ এক্সেলেন্স’ হিসেবে গড়ে তোলার লক্ষ্যে কাজ করার কথা জানান।

তিনি বলেন, এ ধরনের সেবা সফল করতে শুধু ফিজিক্যাল মেডিসিন অ্যান্ড রিহ্যাবিলিটেশন বিভাগের চিকিৎসকদের উদ্যোগ যথেষ্ট নয়। পালমোনোলজি, ফিজিওথেরাপি, নার্সিং, পুষ্টি, মনোবিজ্ঞানসহ সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন বিভাগের বিশেষজ্ঞদের সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে। প্রশিক্ষণ, গবেষণা ও ক্লিনিক্যাল সেবা উন্নয়নেও আন্তঃবিভাগীয় সহযোগিতা বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।

ডক্টরস এসোসিয়েশন অফ বাংলাদেশ (ড্যাব)-এর সেক্রেটারি জেনারেল ও এনআইডিসিএইচ-এর পরিচালক ডা. মো. জহিরুল ইসলাম শাকিলও বিভিন্ন বিশেষজ্ঞের সমন্বিত উদ্যোগের ওপর গুরুত্ব দেন। বিএসপিএমআর-এর সঙ্গে ড্যাব-এর সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) করে প্রতিবছর এক বা একাধিক এ ধরনের কর্মশালা আয়োজনের উদ্যোগ নেওয়ার কথা জানান তিনি।

বিএমইউ-এর প্রো-ভাইস চ্যান্সেলর (অ্যাডমিনিস্ট্রেশন) প্রফেসর ডা. মো. আবুল কালাম আজাদ পালমোনারি রিহ্যাবিলিটেশন কার্যক্রমে বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগিতার আশ্বাস দেন। একই সঙ্গে এ ধরনের কর্মশালায় বিভিন্ন বিশেষায়িত বিভাগের চিকিৎসকদের আরও বেশি অংশগ্রহণের প্রয়োজনীয়তার কথা বলেন।

সুপার স্পেশালাইজড হাসপাতালের পরিচালক প্রফেসর ডা. সাইফুল্লাহ মুনশী বলেন, বিভিন্ন শ্বাসতন্ত্রের রোগ ও সংক্রমণের পর রোগীদের দীর্ঘমেয়াদি শারীরিক সক্ষমতা এবং জীবনযাত্রার মান ফিরিয়ে আনতে পালমোনারি রিহ্যাবিলিটেশন গুরুত্বপূর্ণ। ভাইরোলজি বিভাগের সঙ্গে তাঁর সম্পৃক্ততার কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, শ্বাসতন্ত্রের রোগের দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব মোকাবিলায় এই সেবার পরিধি আরও বাড়ানো দরকার।

এনআইডিসিএইচ-এর পরিচালক এবং চেস্ট এন্ড হার্ট এসোসিয়েশন অফ বাংলাদেশ (সিএইচএবি)-এর সেক্রেটারি জেনারেল ডা. গোলাম সারওয়ার লিয়াকত হোসেন ভূইয়াও বিভিন্ন বিভাগের মধ্যে সমন্বিত উদ্যোগের ওপর জোর দেন। তাঁর মতে, বক্ষব্যাধি, ফিজিক্যাল মেডিসিন ও রিহ্যাবিলিটেশনসহ সংশ্লিষ্ট বিভাগের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় রোগীদের আরও পূর্ণাঙ্গ সেবা দেওয়া সম্ভব।

কর্মশালার প্রধান রিসোর্স পার্সন ছিলেন প্রফেসর ডা. মনসুর হাবিব। বাংলাদেশে পালমোনারি রিহ্যাবিলিটেশনের একটি দক্ষ ও সুসংগঠিত ক্ষেত্র গড়ে তুলতে জ্ঞান, প্রশিক্ষণ ও কারিগরি সহায়তা অব্যাহত রাখার আশ্বাস দেন তিনি।

দিনব্যাপী প্রশিক্ষণে পালমোনারি রিহ্যাবিলিটেশনের মৌলিক অ্যানাটমি ও ফিজিওলজি, বর্তমান ধারণা ও অগ্রগতি, সীমিত সম্পদের পরিবেশে সেবা দেওয়ার পদ্ধতি, রোগী মূল্যায়নের বিভিন্ন টুল, সংশ্লিষ্ট পক্ষের সম্পৃক্ততা ও জনসচেতনতা তৈরির কৌশল নিয়ে আলোচনা হয়। পাশাপাশি অংশগ্রহণকারীদের হাতে-কলমে বিভিন্ন দক্ষতা এবং ক্লিনিক্যাল সিমুলেশনের প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়।

অনুষ্ঠানে বিএমইউ-এর বিভিন্ন অনুষদের শিক্ষক ও চিকিৎসক, ফিজিওথেরাপিস্ট, নার্স, স্বাস্থ্য-পেশাজীবী এবং প্রশিক্ষণার্থীরা উপস্থিত ছিলেন।

আয়োজকদের মতে, পালমোনারি রিহ্যাবিলিটেশনের লক্ষ্য শুধু রোগীর শ্বাসকষ্ট কমানো নয়; বরং দীর্ঘমেয়াদি শ্বাসতন্ত্রের রোগে আক্রান্ত মানুষের শারীরিক সক্ষমতা, ব্যায়াম করার সামর্থ্য, জীবনযাত্রার মান এবং সামাজিক ও কর্মজীবনে পুনরায় অংশগ্রহণের সক্ষমতা বাড়ানো। বাংলাদেশে এই সেবাকে আরও বিস্তৃত করতে ভবিষ্যতে প্রশিক্ষণ, গবেষণা ও ক্লিনিক্যাল কার্যক্রম বাড়ানোর পরিকল্পনাও রয়েছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *