বাংলাদেশের বিভিন্ন কলেজের শিক্ষার্থীদের নিয়ে গঠিত টিম পোলারিস আন্তর্জাতিক বিজ্ঞান প্রতিযোগিতা বীমলাইন ফর স্কুলস (BL4S)-এ সাফল্য পেয়েছে। ইউরোপের পরমাণু গবেষণা সংস্থা সার্ন আয়োজিত প্রতিযোগিতাটির ১৩তম আসরে বিশ্বের ৮৯টি দেশের ৭১২টি দলের সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে পাঁচ বিজয়ী দলের একটি হয়েছে বাংলাদেশি দলটি।
পাঁচ বিজয়ী দলের মধ্যে টিম পোলারিসের পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, তুরস্ক ও ভারতের দলও রয়েছে।
সম্প্রতি জেনেভায় জাতিসংঘ ও অন্যান্য আন্তর্জাতিক সংস্থায় বাংলাদেশের স্থায়ী মিশনে টিম পোলারিসকে স্বাগত জানানো হয়। এ সময় জেনেভায় বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত নাহিদা সোবহান শিক্ষার্থীদের অভিনন্দন জানান।
টিম পোলারিসের সাফল্যের বিশেষ দিক হলো—বাংলাদেশে সীমিত সুযোগ-সুবিধার মধ্যে গবেষণার কাজ শুরু করে দলটি শেষ পর্যন্ত জার্মানির ইউনিভার্সিটি অব বন এবং সার্ন-এ তাদের পরীক্ষামূলক কাজ পরিচালনার সুযোগ পেয়েছে।
টিম পোলারিসের গবেষণার বিষয় ছিল পলিসিলোক্সেনভিত্তিক প্লাস্টিক সিন্টিলেটর। উচ্চশক্তির ইলেকট্রন বিমের প্রোফাইল বা আকৃতি নির্ণয়ে এই উপাদান কীভাবে ব্যবহার করা যায়, তা পরীক্ষা করেছে দলটি।
এ জন্য তারা জার্মানির ইউনিভার্সিটি অব বন-এর ELSA অ্যাক্সিলারেটর-এ পরীক্ষা চালায়। অ্যাক্সিলারেটর হলো এমন একটি বৈজ্ঞানিক যন্ত্র, যার মাধ্যমে চার্জযুক্ত কণাকে অত্যন্ত উচ্চ শক্তিতে ত্বরান্বিত করা হয়। কণা পদার্থবিজ্ঞানের গবেষণায় এ ধরনের যন্ত্র গুরুত্বপূর্ণ।
এই গবেষণার মাধ্যমে শিক্ষার্থীরা শুধু একটি আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় অংশ নেয়নি; বরং বাস্তব গবেষণাগারে গিয়ে উচ্চশক্তির কণা নিয়ে পরীক্ষামূলক কাজ করার সুযোগ পেয়েছে।
টিম পোলারিসে বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলের কলেজের শিক্ষার্থীরা রয়েছে। টিম পোলারিসের সদস্যরা হলেন নোয়াখালীর চৌমুহনী সরকারি সালেহ আহমদ কলেজের শিক্ষার্থী সালমান আলম সোহান, মো. আব্দুল রহিম পরশ ও এসএম তাওসিফ, ঢাকার বীরশ্রেষ্ঠ নূর মোহাম্মদ পাবলিক কলেজের নাজিফা তাসনিম এবং রংপুর কালেক্টরেট স্কুল অ্যান্ড কলেজের নাজিয়া তিতিম। দলটির কোচ ছিলেন নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড টেলিকমিউনিকেশন ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের শিক্ষার্থী মো. নিশাদ আহমেদ জীবন।।
তাদের এই সাফল্য আরও তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে উঠেছে কারণ গবেষণার শুরুটা হয়েছিল দেশের সীমিত সুযোগ-সুবিধার মধ্যেই। সেখান থেকে আন্তর্জাতিক পর্যায়ের প্রতিযোগিতায় ৭১২টি দলের মধ্যে নিজেদের জায়গা করে নেওয়া এবং পরে বন ও সার্ন-এ পরীক্ষার সুযোগ পাওয়া শিক্ষার্থীদের মেধা ও অধ্যবসায়ের পরিচয় দিয়েছে।
BL4S প্রতিযোগিতায় শিক্ষার্থীদের নিজেদের বৈজ্ঞানিক গবেষণার ধারণা উপস্থাপন করতে হয়। নির্বাচিত দলগুলো পরবর্তীতে বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় গবেষণা অবকাঠামোর সঙ্গে যুক্ত হয়ে নিজেদের প্রস্তাবিত পরীক্ষা পরিচালনার সুযোগ পায়।
টিম পোলারিসের সাফল্যের প্রসঙ্গ তুলে রাষ্ট্রদূত নাহিদা সোবহান বাংলাদেশ ও সার্ন-এর দীর্ঘদিনের সহযোগিতার কথাও স্মরণ করেন।
বাংলাদেশ ও সার্ন-এর সহযোগিতার ভিত্তি তৈরি হয় ২০১২ সালে। পরে ২০১৪ সালের ইন্টারন্যাশনাল কোঅপারেশন এগ্রিমেন্ট-এর মাধ্যমে এই সহযোগিতা আরও শক্তিশালী হয়।
এই সহযোগিতার ফলে বাংলাদেশের বিজ্ঞানী ও শিক্ষার্থীদের আন্তর্জাতিক গবেষণা পরিমণ্ডলের সঙ্গে যুক্ত হওয়ার সুযোগ তৈরি হয়েছে।
রাষ্ট্রদূত নাহিদা সোবহান বলেন, টিম পোলারিসের অর্জন বাংলাদেশের তরুণ প্রজন্মের মেধা, সৃজনশীলতা এবং আন্তর্জাতিক পর্যায়ে নিজেদের তুলে ধরার সক্ষমতার একটি শক্তিশালী প্রমাণ।
টিম পোলারিসের গল্প তাই শুধু একটি বিজ্ঞান প্রতিযোগিতায় জয়ের গল্প নয়। এটি দেখায়, গবেষণার সুযোগ ও প্রয়োজনীয় সহায়তা পেলে বাংলাদেশের বিভিন্ন প্রান্তের তরুণরাও বিশ্বের বড় বৈজ্ঞানিক পরিসরে নিজেদের সক্ষমতা তুলে ধরতে পারে।
সীমিত সুযোগ থেকে সার্ন পর্যন্ত টিম পোলারিসের যাত্রা বাংলাদেশের বিজ্ঞান শিক্ষায় একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তাই দেয়—দেশের সবচেয়ে বড় শক্তিগুলোর একটি তার তরুণ প্রজন্ম।