বাংলাদেশে চক্ষুসেবা আরও বিস্তৃত করতে এবং অপটোমেট্রিস্টসহ বিভিন্ন পর্যায়ের চক্ষুসেবা কর্মীদের একটি নিয়ন্ত্রিত কাঠামোর আওতায় আনতে স্বতন্ত্র অপটোমেট্রি কাউন্সিল গঠনের প্রয়োজনীয়তার বিষয়ে একমত হয়েছেন চক্ষুস্বাস্থ্য খাতের অংশীজনেরা।
মঙ্গলবার (২৫শে আগস্ট) রাজধানীর জাতীয় চক্ষুবিজ্ঞান ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালে আয়োজিত এক জাতীয় সংলাপে চিকিৎসক, অপটোমেট্রিস্ট, স্বাস্থ্যশিক্ষা ও বিভিন্ন চক্ষুসেবা প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিরা এ মত দেন।
‘চক্ষুস্বাস্থ্য বিষয়ক জাতীয় নীতি সংলাপ: বাংলাদেশে অপটোমেট্রিস্ট এবং সহযোগী চক্ষুসেবা কর্মীদের জন্য কাউন্সিল প্রতিষ্ঠা বিষয়ে পরামর্শসভা’ শীর্ষক সংলাপটির আয়োজন করে অরবিস ইন্টারন্যাশনাল।
সংলাপে বক্তারা বলেন, দেশে চক্ষুসেবার চাহিদা বাড়লেও সেই চাহিদা পূরণের মতো পর্যাপ্ত প্রশিক্ষিত জনবল ও স্বাস্থ্যসেবা অবকাঠামো নেই। ফলে চক্ষুস্বাস্থ্যসেবার পরিধি বাড়াতে চিকিৎসকদের পাশাপাশি প্রশিক্ষিত অপটোমেট্রিস্ট ও অন্যান্য সহযোগী চক্ষুসেবা কর্মীদের কার্যকরভাবে কাজে লাগানো প্রয়োজন।
অরবিস বাংলাদেশের কান্ট্রি ডিরেক্টর এবং ইন্টারন্যাশনাল এজেন্সি ফর দ্য প্রিভেনশন অব ব্লাইন্ডনেসের বাংলাদেশের অনারারি কান্ট্রি চেয়ার ডা. মুনির আহমেদ বলেন, বাংলাদেশ চক্ষুসেবা প্রদানের ক্ষেত্রে এখনও অনেক পিছিয়ে আছে এবং এর অন্যতম কারণ জনবলের ঘাটতি।
তিনি বলেন, বাংলাদেশে সম্প্রতি শুরু হওয়া বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ‘স্পেকস ২০৩০’ লক্ষ্য অর্জন করতে হলে প্রয়োজনীয় জনবল তৈরি করা জরুরি।
বিএনএসবি চক্ষু হাসপাতালের নির্বাহী পরিচালক শরীফুজ্জামান পরাগ বলেন, দেশের প্রায় ২০ শতাংশ মানুষ বর্তমানে কোনো না কোনোভাবে চক্ষুসেবা চায়। কিন্তু সেই চাহিদা পূরণের জন্য প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্যপ্রতিষ্ঠান ও জনবল পর্যাপ্ত নয়।
সংলাপে অপটোমেট্রিস্টদের মূলধারার চক্ষুসেবায় যুক্ত করার পাশাপাশি তাদের পেশাগত দায়িত্ব ও ক্ষমতার সুনির্দিষ্ট সীমা নির্ধারণের ওপর গুরুত্ব দেন চিকিৎসকেরা।
জাতীয় চক্ষুবিজ্ঞান ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালের পরিচালক (ভারপ্রাপ্ত) অধ্যাপক ডা. এএসএমএম কাদির বলেন, অপটোমেট্রি শিক্ষায় ভর্তির যোগ্যতা কী হবে, অপটোমেট্রিস্টরা ওষুধের ব্যবস্থাপত্র দিতে পারবেন কি না এবং তারা স্বাধীনভাবে কাজ করবেন নাকি চক্ষু বিশেষজ্ঞের অধীনে কাজ করবেন—এসব বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার জন্য একটি নিয়ন্ত্রক সংস্থা প্রয়োজন।
বাংলাদেশ চক্ষু চিকিৎসক সমিতির মহাসচিব অধ্যাপক মো. জিন্নু রাইনও অপটোমেট্রিস্টদের কাজের একটি স্পষ্ট সীমারেখার পক্ষে মত দেন।
তিনি বলেন, প্রাথমিক চক্ষুসেবায় অপটোমেট্রিস্টদের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। তবে অ্যান্টিবায়োটিক বা স্টেরয়েডের মতো ওষুধ ব্যবস্থাপত্র দেওয়ার অনুমতি তাদের দেওয়া উচিত নয়।
তার মতে, রোগীর দৃষ্টিশক্তি পরীক্ষা, চশমার প্রয়োজন নির্ধারণসহ অপটোমেট্রির নিজস্ব কাজের পরিধিই যথেষ্ট বিস্তৃত। এসব কাজের মাধ্যমে অপটোমেট্রিস্টরা চক্ষুস্বাস্থ্য খাতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখতে পারেন।
বাংলাদেশ চক্ষু চিকিৎসক সমিতির সভাপতি ডা. মো. তৌহিদুর রহমান চক্ষুসেবার বিভিন্ন স্তরের প্রশিক্ষণ ও কোর্সে অভিন্নতা আনার পাশাপাশি পেশাজীবীদের দায়িত্বের সীমা নির্ধারণের ওপর গুরুত্ব দেন।
তিনি বলেন, চক্ষুসেবার সব উপাদানকে সমন্বিত করে এগিয়ে যেতে হবে এবং এ ক্ষেত্রে সরকারের বড় ভূমিকা রয়েছে।
চক্ষু চিকিৎসক সমিতির কোষাধ্যক্ষ ডা. সৈয়দ মেহবুব উল কাদির বলেন, অপটোমেট্রিস্টদের মূলধারার স্বাস্থ্যব্যবস্থায় যুক্ত করার উদ্যোগ সরকারের নেওয়া উচিত। তার ভাষ্য, ভারতে অপটোমেট্রিস্টরা চক্ষুসেবায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করলেও বাংলাদেশে সরকারি স্বাস্থ্যপ্রতিষ্ঠানগুলোতে তাদের জন্য এখনো নির্দিষ্ট জায়গা তৈরি হয়নি।
তবে অপটোমেট্রিস্টরা যাতে তাদের নির্ধারিত কর্মপরিধির মধ্যেই কাজ করেন, তা নিশ্চিত করার জন্য কার্যকর নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা তৈরিরও পরামর্শ দেন তিনি।
চিটাগাং আই ইনফার্মারি অ্যান্ড ট্রেনিং কমপ্লেক্সের মেডিকেল পরিচালক ডা. রাজীব হোসেন বলেন, প্রাথমিক চক্ষুসেবার জন্য বাংলাদেশে একটি সুস্পষ্ট নীতিমালা ও আইন প্রয়োজন।
তার দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, দেশে বর্তমানে গ্র্যাজুয়েট পর্যায়ের প্রায় ২৫০ জন অপটোমেট্রিস্ট রয়েছেন। তাদের জন্য স্বতন্ত্র কাউন্সিল ও সরকারি স্বীকৃতি প্রয়োজন।
তিনি বলেন, বিশ্বের বিভিন্ন দেশে অপটোমেট্রি পেশার জন্য সরকারি কাউন্সিল রয়েছে এবং আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত কার্যপরিধির মধ্যে থেকে অপটোমেট্রিস্টরা কাজ করছেন। বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও আন্তর্জাতিক নির্দেশনা অনুসরণ করে তাদের দায়িত্ব নির্ধারণ করা উচিত।
সংলাপে শুধু কাউন্সিল গঠন নয়, বিভিন্ন মেয়াদের চক্ষুস্বাস্থ্য প্রশিক্ষণ ও ডিগ্রিধারীদের পেশাগত পরিচয় নিয়েও আলোচনা হয়।
আইসিও-অপটোমেট্রি অ্যালামনাই অ্যাসোসিয়েশনের প্রতিনিধি ড. গাজী রিয়াজ রহমান বলেন, চক্ষুসেবা খাতে বিভিন্ন পেশাজীবীর শিক্ষাগত যোগ্যতা ও প্রশিক্ষণের ভিত্তিতে পেশাগত শ্রেণিবিন্যাসের বিষয়টি স্পষ্ট করা প্রয়োজন।
তিনি জানান, সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের অধীনে বাংলাদেশ রিহ্যাবিলিটেশন কাউন্সিলে (বিআরসি) বি.অপ্টম ডিগ্রিধারীদের ‘প্র্যাকটিশনার’ ক্যাটাগরিতে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। ৬ মাস ও ১ বছর মেয়াদি কোর্স সম্পন্নকারীদের টেকনিশিয়ান এবং দেড় থেকে দুই বছর মেয়াদি কোর্স সম্পন্নকারীদের টেকনোলজিস্ট ক্যাটাগরিতে রাখার ব্যবস্থাও রয়েছে।
তার মতে, চার বছর মেয়াদি বি.অপ্টম ডিগ্রিতে একাডেমিক ও ক্লিনিক্যাল প্রশিক্ষণ থাকায় এ ডিগ্রিধারীদের পেশাগত পরিচয় এবং ‘অপটোমেট্রিস্ট’ পদবি আলাদাভাবে বিবেচনা করা প্রয়োজন।
ডিওএলভি ডিগ্রিধারীদের পেশাগত পরিচয় নিয়েও আলোচনা হয়। ড. গাজী রিয়াজ রহমান বলেন, স্বল্পমেয়াদি ডিপ্লোমাকে আন্তর্জাতিকভাবে অপটোমেট্রিস্ট হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার নজির নেই। বিআরসির কাঠামো অনুযায়ী ডিওএলভি ডিগ্রিধারীদের টেকনোলজিস্ট ক্যাটাগরিতে অন্তর্ভুক্ত করার সুযোগ রয়েছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
অপটোমেট্রি কনফেডারেশন অব বাংলাদেশের (ওসিবি) সভাপতি শাহাদাত হোসেন দেলোয়ার বলেন, বিশ্ব অপটোমেট্রি কাউন্সিলের তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বের ১২৫টি দেশে অপটোমেট্রি পেশা চালু রয়েছে এবং ৩৪টি দেশে এ পেশার জন্য প্রতিষ্ঠিত কাউন্সিল রয়েছে।
তার মতে, বাংলাদেশে নতুন করে সম্পূর্ণ আলাদা কার্যপরিধি তৈরির প্রয়োজন নেই। আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা (আইএলও), বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও), বিশ্ব অপটোমেট্রি কাউন্সিল এবং আন্তর্জাতিক মানদণ্ড—বিশেষ করে ISCO-2267—অনুসরণ করেই বাংলাদেশের জন্য কাঠামো তৈরি করা যেতে পারে।
তিনি বলেন, স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের অধীনে অপটোমেট্রি কাউন্সিল গঠিত হলে অপটোমেট্রি শিক্ষার মান, পেশাগত নিবন্ধন, লাইসেন্স প্রদান এবং সেবার মান নিয়ন্ত্রণের জন্য একটি সুসংগঠিত ব্যবস্থা তৈরি হবে। একই সঙ্গে অনুমোদিত পেশাগত পদবি ব্যবহারের ক্ষেত্রে শৃঙ্খলা আসবে এবং অননুমোদিত বা বিভ্রান্তিকর পেশাগত পরিচয় ব্যবহারের প্রবণতা কমবে।
বাংলাদেশ অপটোমেট্রি সোসাইটির সভাপতি দিদারুল ইসলাম বলেন, অপটোমেট্রি পেশাজীবীদের দীর্ঘদিনের দাবি ও প্রচেষ্টার ধারাবাহিকতায় একটি স্বতন্ত্র অপটোমেট্রি কাউন্সিল প্রতিষ্ঠার চেষ্টা চলছে।
ইতোমধ্যে সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের অধীনে বাংলাদেশ রিহ্যাবিলিটেশন কাউন্সিলে অপটোমেট্রি পেশাজীবীদের অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, রিহ্যাব কাউন্সিলের অধীনে অপটোমেট্রির জন্য আরও কার্যকর ও শক্তিশালী নির্দেশিকা কীভাবে তৈরি করা যায়, সে বিষয়ে সংশ্লিষ্ট সবাইকে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করতে হবে।
অন্যদিকে সিএসএফ গ্লোবালের সিনিয়র প্রোগ্রাম ম্যানেজার জহুরুল ইসলাম জুয়েল বলেন, চক্ষুসেবা সম্প্রসারণে অপটোমেট্রিস্টদের স্বীকৃতি দেওয়া জরুরি। এ জন্য স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের অধীনে একটি অপটোমেট্রি কাউন্সিল গঠনের পরামর্শ দেন তিনি।
তিনি বলেন, ইউনিভার্সিটি অব সাউথ এশিয়ার ডিওএলভি কোর্সটি ইউজিসি অনুমোদিত হলেও স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের অধীনে এখনো অপটোমেট্রি কাউন্সিল প্রতিষ্ঠিত হয়নি। ফলে ভবিষ্যতে কোন শিক্ষাগত যোগ্যতার ভিত্তিতে কোন পেশাগত পদবি দেওয়া হবে, তা এখনো চূড়ান্তভাবে নির্ধারিত হয়নি।
সংলাপের আলোচনায় একটি বিষয় স্পষ্ট হয়ে উঠেছে—বাংলাদেশে চক্ষুসেবার পরিধি বাড়াতে শুধু আরও চিকিৎসক তৈরি করাই যথেষ্ট নয়। প্রাথমিক পর্যায়ের চক্ষুসেবা মানুষের কাছে পৌঁছে দিতে অপটোমেট্রিস্ট ও অন্যান্য সহযোগী চক্ষুসেবা কর্মীদেরও পরিকল্পিতভাবে স্বাস্থ্যব্যবস্থায় যুক্ত করা প্রয়োজন।
তবে একই সঙ্গে কে কোন কাজ করতে পারবেন, কার কী শিক্ষাগত যোগ্যতা থাকতে হবে, কোন ওষুধ ব্যবস্থাপত্র দেওয়ার ক্ষমতা কার থাকবে এবং কোন পর্যায়ে রোগীকে চক্ষু বিশেষজ্ঞের কাছে পাঠাতে হবে—এসব প্রশ্নের স্পষ্ট উত্তরও প্রয়োজন।
অংশীজনদের মতে, একটি স্বতন্ত্র কাউন্সিল সেই নিয়ন্ত্রণ ও সমন্বয়ের কাঠামো তৈরি করতে পারে। এতে একদিকে প্রশিক্ষিত অপটোমেট্রিস্টদের পেশাগত স্বীকৃতি ও কর্মসংস্থানের সুযোগ বাড়বে, অন্যদিকে রোগীর নিরাপত্তা এবং চক্ষুসেবার মানও নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হবে।
সংলাপে বাংলাদেশ চক্ষু চিকিৎসক সমিতির সহ-সভাপতি অধ্যাপক মো. সায়েদুল হক, রাজশাহী মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রার অধ্যাপক ডা. মো. শাহ আলম, চট্টগ্রাম ইনস্টিটিউট অব কমিউনিটি অপথালমোলজির পরিচালক প্রফেসর ডা. মনিরুজ্জামান ওসমানীসহ চক্ষুস্বাস্থ্য খাতের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিরা বক্তব্য দেন।
সংশ্লিষ্টদের প্রত্যাশা, জাতীয় পর্যায়ের এই আলোচনা নীতিনির্ধারণের পর্যায়ে গড়াবে এবং বাংলাদেশে চক্ষুসেবার প্রয়োজন, রোগীর নিরাপত্তা ও আন্তর্জাতিক মানদণ্ড—তিনটি বিষয়কে সমন্বয় করে অপটোমেট্রি পেশার জন্য একটি কার্যকর নিয়ন্ত্রক কাঠামো গড়ে উঠবে।